ভ্রমণগদ্য
Published : 05 Dec 2025, 05:32 PM
ইদানিং রুমে মাঝেমধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ কাজ করছিল, হয়তো সেই সুযোগেই রাইসুলের কলটি ঢুকে পড়েছে। ঘুমের ঘোরে কানে আসছিল এক ক্ষীণ ভোঁ-ভোঁ চাপা শব্দ। মনে হচ্ছিল যেন দূর তিয়ানশান পর্বতের পাদদেশে ভূমিকম্প হচ্ছে, আর সেই কম্পনে ত্রস্ত পুরো উরুমচি শহর।
দরজায় টোকা পড়ল। অসংখ্য পাথরের গড়ান আর ভোঁ-ভোঁ শব্দের একটানা রেশ ঘুমের পুকুরে যেন ঢিল ছুঁড়ল। বিরক্তি নিয়েই ঘুমের সুতো ছিঁড়ে বাস্তবে ফিরলাম। পাশ টেবিল থেকে মোবাইলটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল পরিচিত স্বর, “হ্যালো, ভাইয়া কেমন আছেন?”
রাইসুলের গলা চিনতে ভুল হলো না। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জানতে চাইলাম, “তুমি ভালো?”
“ভালো। শুনলাম আপনি নাকি চীনে গেছেন? কাল বাংলাদেশ থেকে শুভ ভাইয়া ফোন করেছিল।”
“হুম। তুমি এখন কোথায়?”
“বাসায়। একটু আগেই কাজ থেকে ফিরেছি। ভাইয়া, চীনের একেকটা সিটি কিন্তু ওরা পৃথিবীর বিখ্যাত একেকটা সিটির আদলে বানিয়েছে। তাই চীন ভ্রমণ করলে আপনার পুরো পৃথিবীই ভ্রমণ হয়ে যাবে।”
রাইসুলের সঙ্গে আরও কিছু কথা শেষে ফোন রেখে খাটের মাথায় হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসলাম। ওর একটা কথা বারবার কানে বাজতে লাগল- চীন ভ্রমণ করলেই নাকি পুরো পৃথিবী ভ্রমণ হয়ে যায়! নিজের মনেই হেসে উঠলাম। তাহলে কি আমরা বিশ্ব দর্শনেই বেরিয়েছি? হয়তো তাই।

বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেই চোখে পড়ল সকালের ঝলমলে উরুমচি। কুসুম পেলব নরম রোদ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশ। দূরে সেই তিয়ানশান পর্বতমালা। কত কাল ধরে সাদা তুষারের কম্বলে নিজেকে জড়িয়ে সে শুয়ে আছে বিস্তীর্ণ বালুময় মরুভূমির বুকে! তার আড়ালে যেন সারারাত সূর্য লুকিয়ে ছিল, আর এখন প্রভাতে তিয়ানশানের মাথা টপকে উঁকি দিচ্ছে। এভাবেই শুরু হলো নতুন দিনের, বাংলাদেশ থেকে বহু দূরে এক অচেনা জনপদে।
জানলা থেকে ঘুরে বিছানায় ফিরতেই মনে পড়ল স্যাটেলাইট স্কয়ারের কথা। গত সন্ধ্যায় হাংশিয়াং পার্ক থেকে সবাই হোটেলে ফিরলেও আমি পা বাড়িয়েছিলাম সেদিকে। যেখানে চীনা নারী-পুরুষেরা কাজ শেষে সন্ধ্যায় জড়ো হয়, গানের তালে নাচে। এর আগের পর্বে এ নিয়ে লিখেছিলাম, কিন্তু আজ আবারও লিখছি বিশেষ এক কারণে। স্যাটেলাইট স্কয়ারের দিকে ফুটপাত ধরে এগুচ্ছিলাম। পথে দেখা সহকর্মী কামরুল হাসানের সঙ্গে। দুজনে রাস্তা পার হয়ে পৌঁছলাম সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
অদূরেই চোখে পড়ল একদল নারী-পুরুষ গানের তালে হাত-পা দুলিয়ে শরীরচর্চা ও নাচে মগ্ন। আমরা সামনের সিঁড়ি বেয়ে কনক্রিটের ছাউনি পেরিয়ে খোলা চত্বরে পা রাখলাম। পরিবেশ দেখে কামরুল হাসানও নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, শরীর দুলিয়ে বললেন, “ভাই, চলেন নাচি। কালচারাল ব্যারিয়ারটা ভাঙা দরকার।”
আমরা আরেকটু এগোতেই কামরুলের মোবাইল বেজে উঠল, ও কিছুটা পিছিয়ে পড়ল। আমি একা সেই নৃত্যরত দলটার কাছাকাছি হতেই মনে হলো কারা যেন হাত তুলে আমাকে ডাকছে। বিদেশ-বিভুঁইয়ে কারা আমাকে ডাকবে? নাকি চোখের ভুল? হ্যালুসিনেশন? নাকি আমার অবয়ব পালটে চীনাদের মতো হয়ে গেছে, যার ফলে ওরা আমাকে নিজেদের স্বজন ভেবে ডাকছে? গালে হাত দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলাম।

ভুল ভাঙল যখন ‘হাই’ বলে দলছুট হয়ে দুটি মেয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো। দেখি লি ও জি- সালামের সেই দুই বান্ধবী, যাদের সঙ্গে কদিন আগেই এক ক্যাফেতে পরিচয় হয়েছিল। আজ আবার দেখা! হাসিমুখে ওরা আহ্বান জানাল, “এসো, নাচো আমাদের সঙ্গে।”
মুহূর্তেই গত দিনের সব সংকোচ ঝরে পড়ল। ‘আই অ্যাম অ্যা ডিস্কো ড্যান্সার’-পরিচিত সেই গানের তালে যেন দূর সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ল আমার সত্তায়। আমি সেই উচ্ছ্বসিত উর্মিমালায় নিজেকে ভাসিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলাম আরও একটি পরিচিত মুখ, সহকর্মী মো. ইউনুস আলী। জোয়ারে তৃণখণ্ডের মতো ভেসে এলেন কামরুল হাসানও। গানের তালে তালে তরঙ্গমুখর হয়ে উঠল সন্ধ্যা।
কতক্ষণ নেচেছি তার হিসাব নেই। শুধু মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে তিয়ানশানের পাদদেশে এক ঝাঁক বিদেশির সঙ্গে আমরা যেন আনন্দের ঢেউয়ে ভাসছি। নাচ শেষে হোটেলে ফেরার পথে আমাদের সবার মনে একটাই আক্ষেপ- ইশ! ঢাকাতেও যদি এমন উন্মুক্ত চত্বর থাকত! মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবন এলাকা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা কিংবা ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে, যেখানে সবাই দিনশেষে মিলিত হতে পারত, একসঙ্গে নাচতে বা গাইতে পারত, নিজেদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে পারত!
গতরাতের সেই রেশ কাটিয়ে আজ ক্লাসে বসেও বারবার স্যাটেলাইট স্কয়ারের কথা মনে পড়ছিল। হঠাৎ পাশ থেকে কারো প্রশ্নে সংবিৎ ফিরল। সহকর্মী এ কে এম রাকিবুল হাসান দাঁড়িয়ে অধ্যাপক বাউজিয়ান আবুলাকে জিজ্ঞেস করছেন, “চীনের কোথায় কোথায় কৃষি পর্যটনের প্রচলন রয়েছে?”

ইন্টারপ্রেটার ওয়েন জিন প্রশ্নটি চীনা ভাষায় অনুবাদ করে দিলে অধ্যাপক উত্তর দিলেন, “কৃষি পর্যটন হলো কৃষি কেন্দ্রিক এক ধরনের পর্যটন ব্যবস্থা। এটি মূলত একটি সামাজিক উদ্যোগ, যার মূলে রয়েছে কৃষি, কৃষক ও প্রকৃতি। এর প্রধান লক্ষ্য হলো চীনা কৃষি ও সংস্কৃতির প্রতি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা। এখানে পর্যটকরা পাবে প্রকৃতির খাঁটি সান্নিধ্য আর খাবারের উৎস সম্পর্কে ধারণা। এতে হোটেল-রেস্তোরাঁয় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, কৃষকের বিকল্প আয় বাড়ে এবং কৃষিতে বৈচিত্র্য আসে।”
তিনি আরও জানালেন, চীন সরকার গ্রামীণ সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও কৃষি শক্তিশালীকরণের অংশ হিসেবে এই খাতে নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে সাংহাই, হ্যাংঝো, সিচুয়ান, বেইজিং, ইউনান ও জেজিয়াং প্রদেশে কৃষি পর্যটন ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে।
অধ্যাপকের কথা শুনে আমরা বিস্মিত হলাম। চীন কোথায় পৌঁছে গেছে আর আমরা কোথায় পড়ে আছি! বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ, কৃষি পর্যটন তো আমাদের হাতের মুঠোতেই থাকার কথা। অথচ সেই বোধোদয় আমাদের নেই। আজ চীন সেটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। আগামীকাল নাকি আমাদেরও দেখাতে নিয়ে যাবে। অথচ আমাদের কবি শেখ ফজলুল করিম তো কত আগেই লিখেছিলেন- “ধানের ক্ষেতে বাতাস নেচে যায়/ দামাল ছেলের মতো/ ডাক দে বলে, আয়রে তোরা আয়/ ডাকবো তোদের কতো!” (গাঁয়ের ডাক)
চীনের একটি বিখ্যাত প্রবাদ হলো, “এক হাজার মাইল যাত্রা শুরু হয় একটি মাত্র পদক্ষেপে।” ষষ্ঠ শতকের চীনা দার্শনিক লাওৎসুর কথা এটি। এই প্রবাদের সত্যতা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। সাত দিন আগে বাংলাদেশের বাড়ি থেকে প্রথম পদক্ষেপটি ফেলে আজ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কার করে চলেছি। তেমনি আজ বিকেলে আমাদের গন্তব্য ছিল ‘জেং কুভিয়ান ওয়েস্ট সিটি’ এবং ‘হংগুয়াংশান বৌদ্ধ মূর্তি’।

জেং কুভিয়ান সিটি মূলত চীনের প্রাচীন শহরের এক প্রতিকৃতি। আর হংগুয়াংশান হলো জিনজিয়াংয়ের সবচেয়ে বৃহৎ হান বৌদ্ধ মূর্তি। তবে তার আগে ফিল্ড ট্রিপের অংশ হিসেবে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল উরুমচির উত্তর-পূর্বে একটি ফুড প্রসেসিং প্ল্যান্টে। শহরের একপাশে সুপরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল। সেখানে অসংখ্য প্রক্রিয়াজাত পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত কৃষি পণ্যের উৎপাদন দেখে মুগ্ধ হলাম। কারখানা কর্তৃপক্ষ আমাদের আপ্যায়ন করল সেসব পণ্য দিয়ে, আমরাও কিছু কিনে নিলাম লাগেজে ভরার জন্য।
হোটেলে ফিরে দ্রুত দুটি দলে ভাগ হয়ে আমরা ট্যাক্সিতে চড়ে বসলাম। হাতে সময় বড্ড কম। সন্ধ্যা নামতেই চীনের অধিকাংশ পার্ক ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। তাই দিনের আলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ট্যাক্সি ছুটছিল শহরের বুক চিরে। আমার সঙ্গী ছিলেন সহকর্মী মুকুল স্যার আর ইমরুল হাসান রাসেল। পেছনের ট্যাক্সিতে নাজিম উদ্দীন শেখ, জাহিরা ইসলাম আর মো. আশরাফুজ্জামান। একসময় ট্যাক্সি আমাদের নামিয়ে দিল শহরের এক প্রান্তে, অপরিচিত এক স্থানে। সেখান থেকে আরও ১০ মিনিট কালো পিচঢালা পথ হেঁটে আমরা পৌঁছলাম প্রাচীন এক চৈনিক আবহে গড়া শহরে।
কালো সিমেন্টের দেয়ালে খোদাই করা চীনের ঐতিহাসিক সব স্থাপত্যের প্রতিকৃতি- জেং কুইং এর এনভয়, জায়ান্ট ওয়াইল্ড গুজ প্যাগোডা ও মোগাও কেভস। আছে লালরঙা তেজস্বী ঘোড়া, উট ইত্যাদি। সামনে চীনা মানুষদের আবক্ষ মূর্তি- নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ। কারোর মাথায় টিকি, কারোর মাথায় হ্যাট। কারোর থুতনিতে অল্প দাড়ি, আবার কেউ বা টাকমাথা। কেউ ভার বইছে, কেউ ঘানি টানছে। নারীরা বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে। ডানে তাকালে শহরটি আরও বিস্তৃত- ঐতিহ্যবাহী চীনা প্রাসাদ, বিভিন্ন জাতের ভেড়া, উট আর টানা গাড়ি থরে থরে সাজানো। মনে হচ্ছিল যেন শত বছর ধরে সময় থমকে আছে নাম না জানা কোনো এক চীনা গ্রামে।

কিন্তু ‘বানর রাজা’ তো নেই! চীনের সেই সবচেয়ে বিখ্যাত ও মজার চরিত্র, যার কথা গতকালই নাদিরা আবদুকেরেম বলছিল। চীনা ভাষায় যাকে বলে ‘সুন উকং’। আশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী এই চরিত্রটি নাকি ৭২ রূপে বহুরূপী হতে পারে, সে অমর। তার আছে অপরিসীম সাহস, বুদ্ধি আর জাদুকরী ক্ষমতা। সে কানের ভেতর জাদুকরী রড লুকিয়ে রাখতে পারে, মেঘকে পায়ের তলায় চেপে আকাশে উড়তে পারে। তাকে খুঁজতে চোখ ভাসালাম, কিন্তু দেখা মিলল না। একটু দূরেই দেখা গেল আমাদের অপর দলটিকে, তারা ছবি তোলায় ব্যস্ত। আমরাও কিছু ক্লিক করে নিলাম।
ওদিকে সূর্য অস্ত গেছে। চারদিকে গোধূলির ম্লান আলো। দেরি না করে আমরা হংগুয়াংশানের দিকে পা বাড়ালাম। মিনিট পাঁচেক ঢাল বেয়ে সামনে হাঁটতেই হংগুয়াংশান। কিন্তু কপাল খারাপ, সেখানে পৌঁছে দেখি ফটক বন্ধ। তবে ফটকের ফাঁক দিয়ে দেখা গেল বিচ্ছিন্ন ছোট পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝলমলে বিশাল এক সোনালি বৌদ্ধ মূর্তি। ভেতরে ঢুকতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে ফিরতে হলো। শুধু সান্ত্বনা এটুকুই যে, কাল অবশেষে আমরা যাচ্ছি চীনের নগরজীবন ছেড়ে দূর কোনো গ্রামে...।
চলবে...