১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সুফি ভাবুক বুল্লে শাহ ও তার পদাবলি

সুফিতত্ত্বের চার ধাপ- শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারফত পেরিয়ে কী করে একজন পথিক সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মিলিত হতে পারবে, সে-ই যাত্রারও ইঙ্গিত রয়েছে বুল্লের কবিতায়।

সুফি ভাবুক বুল্লে শাহ ও তার পদাবলি
১৬৮০ থেকে ১৭৫৮ সাল পর্যন্ত বর্তমান পাকিস্তান অঞ্চলে এই কবি বসবাস করতেন।

রাব্বী আহমেদ রাব্বী আহমেদ

Published : 15 Dec 2025, 08:10 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:19 PM

পাঞ্জাবি ভাষার চিরায়ত এক কবি বুল্লে শাহ। ১৬৮০ থেকে ১৭৫৮ সাল পর্যন্ত বর্তমান পাকিস্তান অঞ্চলে এই কবি বসবাস করতেন। তার লেখালেখির বিষয়বস্তুকে বিশ্লেষণ করে সমালোচকেরা তাকে উপাধি দিয়েছেন মানবতাবাদী কবি

অত্যন্ত সাদামাটা ছিল বুল্লের জীবন। আর সেই সাধারণ জীবনযাপনের মধ্যেই তিনি খোঁজ করে গেছেন যাপিত জীবন আর চারপাশের নানা সামাজিক সমস্যার কার্যকর সমাধান। বিবিধ কারণে টালমাটাল হয়ে উঠেছিল ওই সময়ের পাঞ্জাব। তার কবিতায় এর পরিষ্কার প্রভাব অনুধাবন করা যায়। সমসাময়িক বিষয় ছাড়াও কবিতায় তিনি আল্লাহকে সন্ধান করে গেছেন। সুফিতত্ত্বের চার ধাপ- শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারফত পেরিয়ে কী করে একজন পথিক মহান সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মিলিত হতে পারবে, আধ্যাত্মিক ও অতীন্দ্রিয় সে-ই যাত্রারও ইঙ্গিত রয়েছে বুল্লের কবিতায়।

কিন্তু এই জ্ঞান কোনো রেফারেনসিয়াল বা ধার করা পুথিগত বিদ্যা নয়, বরং জীবন নিংড়ে নিজের আত্মার সঙ্গে তার যে বোঝাপড়া, সেটার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কবিতার কাঠামোর নির্মাণ। জীবন আর মানবতার যেসব জটিল বিষয় একজন চিন্তাশীল ও কৌতূহলী মানুষকে ভাবাতে বাধ্য করে, সেসবের এক সহজ অথচ গভীর উপস্থাপন তার লেখায় তিনি করেছেন। আর লিখতেনও অতি সাধারণ ভাষায়, যে লেখার ক্ষমতা ছিল সব ধরনের পাঠককে টেনে নেওয়ার।

সমালোচকেরা মনে করেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী তার যে জনপ্রিয়তার ধারাটি বয়ে চলছে, সেটার পেছনেও তার রচনার প্রাঞ্জলতা ও সহজ সুর এক মোক্ষম কারণ। এ জন্যই সময়ে সময়ে বহু শিল্পী তার লেখা কাফি গেয়ে চলছেন। অখ্যাত গায়ক থেকে শুরু করে এই তালিকায় আছেন প্রখ্যাত সব শিল্পী- নুসরাত ফতেহ আলি খান, পাঠানে খান, আবিদা পারভীন, ওয়াদালি ব্রাদার্স ও সাঁই জহুর প্রমুখ। এছাড়া আছেন যুক্তরাজ্যের শিয়া টেকনো-কাওয়ালি শিল্পীগোষ্ঠী ও পাকিস্তানের রক ব্যান্ড জুনুন

বুল্লের পদাবলির আধুনিক পরিবেশনাও হয়েছে, হয়ে চলছে। এরকম উল্লেখযোগ্য দুই কাজ বুল্লা কি জানা আর আলেফ (ইলমন বাস করিন ও ইয়ার)। ১৯৯০-এর দশকে জুনুন ব্যান্ডটি নতুন সুরের মাধ্যমে যে পদাবলিকে শ্রোতাপ্রিয় করে তোলে। পরে, ২০০৪ সালে ভারতের সঙ্গীতশিল্পী রাব্বি শেরগিল বুল্লা কি জানা শিরোনামের সেই আধ্যাত্মিক কবিতাটিকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেন, রক-ফিউশন ঘরানায়। গানটি ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয় ভারত ও পাকিস্তান, দুই দেশেই।

ভারতের পাঞ্জাবি সুফিগোষ্ঠী ওয়াদালি ব্রাদার্সও বুল্লা কি জানা-এর একটি পরিবেশনা অন্তর্ভুক্ত করেন, তাদের আ মিল ইয়ার- কল অব দ্য বিলাভেড নামের অ্যালবামে। এছাড়া পাঞ্জাবের সুফি শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞ লখবিন্দর ওয়াদালি এই গানটির-ই আরেকটা সংস্করণ প্রকাশ করেন বুল্লা শিরোনামে।

বুল্লে শাহের পদাবলি বলিউডসহ দক্ষিণ এশিয়ার জনপ্রিয় সংগীতে বারবার ব্যবহৃত এবং অভিযোজিত হয়েছে। বলিউডে তার লেখা থেকে তৈরি হয়েছে দিল সে (১৯৯৮)-এর বিখ্যাত গান ছাইয়া ছাইয়া এবং রাবণ (২০১০)-এর রাঞ্ঝা রাঞ্ঝা। পাকিস্তানি চলচ্চিত্র খুদা কে লিয়ে (২০০৭)-এর বন্দিয়া হো গানটিতেও ব্যবহার করা হয়েছে তার পদাবলি।

এছাড়া, বলিউডের অ্যা ওয়েডনেসডে (২০০৮) চলচ্চিত্রেও একটি গান ছিল বুল্লে শাহ, ও ইয়ার মেরে নামে। কোক স্টুডিয়ো পাকিস্তানের সিজন ২-এ (২০০৯) সাঁই জহুর ও নূরি পরিবেশন করেছেন এক আলিফ এবং সিজন ৩-এ (২০১০) আরিয়েব আজহার গেয়েছেন না রেইন্দি হ্যাঁমক্কে গ্যাঁয়া গাল মুকদি নই, এই গান দুটি।

এখানে বুল্লের কয়েকটি পদাবলি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হলো, অলপোয়েট্রি ডটকম থেকে।

আমি আমার প্রাণের-প্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা করি 

আমি আমার প্রাণের-প্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা করি। 

কেউ একজন কথা বলে, হেসে ওঠে উল্লাসে,

কেউ একজন কান্না করে, ফোঁপায়, মরে যায়।

জানিয়ে দিও তো সুন্দর, পুষ্পিত ওই বসন্তকে,

আমি আমার প্রাণের-প্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা করি। 

পবিত্রতার চেষ্টা আমার ব্যর্থ হলো, পাষাণ হৃদয় তার।

পুড়িয়ে দিই না হয়, আমার গয়না, আর অলংকার!

আমি আমার প্রাণের-প্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা করি।

দূতদের আমি খেপিয়ে তুলেছি,

নিজেকে ঢুকিয়ে রেখেছি দুঃখে। 

ঘরে আসো, সোনা,

আমাকে তোমাকে দেখতে দাও।

আমি আমার প্রাণের-প্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা করি।

বুল্লে বলে- যখন আমার প্রিয়তমো ঘরে আসবেন।

আমি জড়িয়ে ধরব তাকে, আমার প্রাণের-প্রিয়েকে,

প্রগাঢ় আলিঙ্গনে। 

সমুদ্র ছাপিয়ে ভেসে চলে যাবে সমগ্র দুঃখ।

আমি আমার প্রাণের-প্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা করি।

ও বুল্লাআমি তো জানি নাআমি কে!

ও বুল্লাআমি তো জানি নাআমি কে!

ও বুল্লাআমি তো জানি নাআমি কে!

না আমি মসজিদে যাওয়া ধার্মিকদের মতো।

না আমি নাস্তিকরা যে আচার করেন পালন।

না আমি অপবিত্রতার মধ্যে থাকা পবিত্রতা

না আমি বেদের দুর্জ্ঞেয় এক অংশবিশেষ।

না আমি আছি কোনো মাদক বস্তুর সঙ্গে,

না আমি কলুষিত, না আমি হারিয়ে গেছি।

না আমি মিলন, না আমি বিচ্ছেদের যন্ত্রণা

আমি শুদ্ধ-অশুদ্ধের সে-ই নিগূঢ় জ্ঞানও না।

না আমি পানি, না আমি মাটি,

না আমি আগুন, না আমি বাতাস।

ও বুল্লাআমি তো জানি নাআমি কে!

না আমি আরবের, না আমি লাহোরের

না আমি ভারতের সেই নাগৌর শহরের

না আমি হিন্দু, না পেশোয়ারের তুর্কি (মুসলিম)। 

না আমি জন্ম দিয়েছি ধর্মের ভেদাভেদ,

না আমি সৃষ্টি করেছি আদম আর হাওয়াকে

না আমি দিয়েছি নিজেকে কোনো নাম।

আদি বা অন্ত, আমি শুধু আমাকেই জানি 

দ্বৈতবাদের ধারণাকে আমি স্বীকার করি না।

আর কেউই নাই আমার চেয়ে বেশি জানে। 

কে এই বুল্লে শাহ?

ও বুল্লাআমি তো জানি নাআমি কে!

না আমি মূসা, না আমি ফেরাউন,

না আমি আগুন, না আমি বাতাস।

নাদাউনে (নিষ্পাপদের শহরে) থাকি না আমি

বুল্লাশাহ, দাঁড়িয়ে আছে যে লোকটা, কে সে?

ও বুল্লাআমি তো জানি নাআমি কে!

ও বুল্লাআমি তো জানি নাআমি কে!

এই প্রেমও বুল্লে! তীব্র জ্বালার, তবুও অনন্য 

এই প্রেমও বুল্লে! তীব্র জ্বালার, তবুও অনন্য

আমার প্রিয়তমোর মুখ যেন বেহেশতের প্রতিমা।

আমার প্রাণের-প্রিয়েকে ছাড়া কীসের আরাধ্যতা? 

যদি প্রয়োজন হয়, তো তর্ক করবো

                            ওই ধর্মগ্রন্থের সঙ্গেও। 

এই প্রেম ভয় পেতে জানে না,

                             কুচকাওয়াজ করে

                                           এগিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে।

রাস্তার বেশ্যার মতো নাচে আর ঘোরে পাগল হয়ে,

প্রাণের-প্রিয়ের শুধু একটি হাসির

                        ঝিলিক জয় করবার আকাঙ্ক্ষায়।

যে আঘাত পেয়েছে প্রেমের কাছ থেকে 

যে আঘাত পেয়েছে প্রেমের কাছ থেকে 

সে গান গায় আর নাচে সুর-তাল ছাড়া।   

যে পরেছে প্রেমের পোশাক

বিশেষ অনুগ্রহ আসে তার ঊর্ধ্বলোক থেকে।

যেইমাত্র সে পান করবে এই পেয়ালা থেকে

আর কোনো প্রশ্ন বা উত্তর থাকবে না বাকি।

যে আঘাত পেয়েছে প্রেমের কাছ থেকে

সে গান গায় আর নাচে সুর-তাল ছাড়া।  

যার অন্তরে রয়েছে প্রাণের-প্রিয়ের বাস, 

পরিতৃপ্ত সে কেবল তার-ই ভালোবাসায়

আনুষ্ঠানিকতার তার আর প্রয়োজন নেই,

সে শুধু উপভোগ করে নিজের প্রেমোল্লাস।

যে আঘাত পেয়েছে প্রেমের কাছ থেকে 

সে গান গায় আর নাচে সুর-তাল ছাড়া। 

কী এক নির্ভার খেলা যে তিনি খেলেন!

তিনি বললেন, হোক, আর তা-ই হয়ে গেল!

যা ছিল লুক্কায়িত তাই তিনি করলেন প্রকাশ।

নিরাকার থেকে তিনি সৃষ্টি করলেন আকার,

কী এক বিস্ময়ের খেলাই না তিনি খেললেন! 

কী এক নির্ভার খেলা যে তিনি খেলেন!

যখন তিনি মেলে ধরলেন সকল গোপন রহস্য

তার মুখের উপর থেকে সরিয়ে ফেললেন পর্দা।

এখন তিনি কেন আমার থেকে আড়াল হতে চান?

সত্য তো ছেয়ে আছে প্রত্যেক মানুষের-ই অন্তরে।

কী এক নির্ভার খেলা যে তিনি খেলেন!

তিনি বললেন, আমরা মানবজাতিকে সম্মানিত করেছি

আর কাউকেই সৃষ্টি করা হয়নি, ঠিক তোমার মতো করে;

তুমি, সমগ্র সৃষ্টিজগতের মুকুট।

ঢাকের বাজনার সঙ্গে এ কী ঘোষণা তিনি করলেন!

কী এক নির্ভার খেলা যে তিনি খেলেন!

তিনি নিজেই মেতে থাকেন এই নির্ভার খেলায়

নিজেই নিজেকে দেখে তিনি হয়ে ওঠেন ভীত।

প্রত্যেক ঘরে তিনি প্রতিষ্ঠা করে আছেন এক ঘর,

অথচ মানুষ খামোখা ঘুরে বেড়ায় বিভ্রান্ত হয়ে।

কী এক নির্ভার খেলা যে তিনি খেলেন!

প্রেমে পাগল হবার তীব্র তৃষ্ণা তিনি নিজেই জাগালেন

নিজেই হয়ে উঠলেন লায়লা,

                              মজনুর হৃদয়টা ছিনিয়ে নিতে। 

তিনি নিজেই কেঁদে উঠলেন

                               নিজেই নিজেকে দিলেন সান্ত্বনা।

আহ! কী এক প্রেমের খেলাই না তিনি খেললেন! 

কী এক নির্ভার খেলা যে তিনি খেলেন!

তিনি নিজেই প্রেমিক, নিজেই তিনি প্রিয়তমো,  

যুক্তি আর কারণের কোনো জায়গা নেই এখানে। 

বুল্লা তার প্রাণের-প্রিয়ের সঙ্গে মিলনে আনন্দিত

তবে, কেন তিনি এখন সৃষ্টি করেন এই বিচ্ছেদ?

আহ! কী এক নির্ভার খেলা যে তিনি খেলেন!

পর্দার আড়ালে লুকিও না, আমার প্রেম

পর্দার আড়ালে লুকিও না, আমার প্রেম

তোমাকে এক পলক দেখবার আকাঙ্ক্ষা। 

আমার প্রিয়তমোকে ছাড়া নিজেকে পাগল পাগল লাগে,

চারপাশের মানুষ আমায় দেখে হাসে,

তার আসা উচিত, আর আমাকে চাঙ্গা করারও,

এই, একটাই অনুরোধ আমার।

পর্দার আড়ালে লুকিও না, আমার প্রেম,

তোমাকে এক পলক দেখবার আকাঙ্ক্ষা।

তোমার গোলামকে এখন বিনা দামে রাখা হচ্ছে নিলামে, 

আসো, প্রাণের-প্রিয়ে, আর এসে আমাকে উদ্ধার করো। 

অন্য কোথাও আর বাসা বাঁধতে পারছি না আমি,

আমি তো বুলবুল, তোমার-ই গাছের।

পর্দার আড়ালে লুকিও না, আমার প্রেম,

তোমাকে এক পলক দেখবার আকাঙ্ক্ষা।

বুল্লে! তিনি কে?

এক আশ্চর্যরকমের বন্ধু!

তার হাতে রয়েছে কোরআন

আর সেই হাতেই পবিত্র পৈতা।

রাঞ্ঝার নাম নিতে-নিতে

রাঞ্ঝার (প্রাণের-প্রিয়ের) নাম নিতে-নিতে,

আমি নিজেই তো হয়ে গেছি রাঞ্ঝা। 

এই যে—‘ধীধো-রাঞ্ঝা বলে ডাকো

                       তোমরা আমাকে।

আর কেউ যেন আমাকে না ডাকে হীর নামে।

রাঞ্ঝা তো আছেনএই আমার ভেতরেই,

আর আমিও আছি ওই রাঞ্ঝার মধ্যেই,

আমার মনে নেই আর কোনো অন্য চিন্তা। 

আমি নেই, শুধু তিনিই (রাঞ্ঝাই) তো আছেন।

নিজেকে নিয়ে তিনি করছেন আহ্লাদ, একাই।

[রাঞ্ঝা: পাঞ্জাবি লোকগাথা হীর-রাঞ্ঝা-এর প্রধান পুরুষ চরিত্র; এবং হীর-এর প্রেমিক। পাঞ্জাব অঞ্চলের সুফি বা আধ্যাত্মিক কবিতায় রাঞ্ঝা শব্দটিকে প্রায়শই পরম সত্তা (ঈশ্বর/আল্লাহ/ভগবান) বা প্রেমাস্পদ গুরুর প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ধীধো: এটি রাঞ্ঝার আসল নাম বা জন্মসূত্রে পাওয়া নাম। এই কবিতায় ধীধো-রাঞ্ঝা শব্দটি ব্যবহার করে প্রেমিকা (হীর) বোঝাতে চান যে তিনি রাঞ্ঝার পূর্ণ পরিচয়ে (তার জন্মগত নামসহ) বিলীন হয়ে গেছেন। এর অর্থ- এখন তার আর নিজের কোনো অস্তিত্ব নেই।]