ভ্রমণগদ্য
Published : 23 Nov 2025, 02:59 AM
আজ ছিল সেমিনারের চতুর্থ দিন। সকালে তিন ঘণ্টার সেশন। এরপর দুপুরের পরপরই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস আমাদের নিয়ে ছুট দিয়েছিল অচেনা গন্তব্যে, ফিল্ড ট্রিপে। বাসে বসে উইঘুর যুবক সালামের দেওয়া গতকালের একটা লিংক পড়ছিলাম। লাল ড্রাগনের ধুন্ধুমার যুদ্ধের পৌরাণিক কাহিনি।
উরুমচি নদীর অববাহিকায় একসময় বাস করতো বিশালাকৃতির এক ড্রাগন। আগুনের মতো লাল রং ছিল তার। যেমন ছিল তার শক্তিমত্তা, তেমনই ছিল তার হিংস্রতা। নিষ্ঠুর ও খামখেয়ালিপূর্ণ। যখন তখন সে বন্যা সৃষ্টি করে বসতো, সৃষ্টি করতো প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের। এতে স্থানীয় উরুমচিবাসীর জীবন হয়ে ওঠে অতিষ্ঠ, দুঃসহ দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত।
অবর্ণনীয় ওই দুঃখ-কষ্ট থেকে রক্ষা পেতে নিরুপায় উরুমচিবাসীরা একদিন শরণাপন্ন হয় স্বর্গীয় দেবতার। প্রার্থনা জানায় তাদের রক্ষা করতে। সাড়া দিলেন এক সম্রাজ্ঞী। স্বর্গীয় সম্রাজ্ঞী, নাম ওয়াংমু। তিনি বাস করতেন স্বর্গের মনোরম এক উদ্যানে, সুখে শান্তিতে। কিন্তু অসহায় মানুষের যাতনা তিনি সহ্য করতে পারলেন না। সাড়া দিলেন প্রার্থনায়। নেমে এলেন পৃথিবীতে তলোয়ার হাতে, ঐশ্বরিক এক তলোয়ার! খুঁজে বের করলেন অত্যাচারী ওই ড্রাগনকে।
কিন্তু বীভৎস ওই ড্রাগন সম্রাজ্ঞীকে দেখে রেগে আগুন। বাঁধলো দু’জনের মাঝে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। অবশেষে স্বর্গ-মর্ত্যের সমস্ত শক্তি এক করে তলোয়ার উঁচিয়ে ড্রাগনকে সজোরে করলেন আঘাত। আর এতেই ‘আহ! উহ!’ আর্তচিৎকার। কেটে দু’ভাগ। ড্রাগনের এক ভাগ পড়লো উরুমচি নদীর পূর্ব তীরে, যা আজকের রেড হিল (স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে ‘হংশান’)। আরেক ভাগ পশ্চিম তীরে, যা ইয়ামালিক হিল (দানব পাহাড়)।
সম্রাজ্ঞী তখন তলোয়ারটি পুঁতে দিলেন মাটিতে। উরুমচিবাসীর বিশ্বাস, আজও ওই তলোয়ারের প্রভাবে উরুমচি নদী প্রবাহিত হচ্ছে, যা তাদের প্রতিনিয়ত রক্ষা করছে সর্বনাশা বন্যা থেকে।
উফ! ইন্টারেস্টিং! পড়া শেষে চোখ তুলতেই ধাঁ ধাঁ! অন্ধকার। পতপত, শো শো শব্দে বাস ছুটছে। কোথায়? বিভ্রম। লম্বা টানেল। সাঁই করে ঢুকে পড়েছে পাহাড়ের পেট কেটে! রেড হিল, ইয়ামালিক নাকি! নাকি ওই ড্রাগন? হঠাৎ আলোর ঝলকানি। দিনের আলো। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে। দৌড়। ডানে বাঁয়ে, সামনে পেছনে খেলনার মতো অসংখ্য গাড়ি। ভু ভু, শো শো শব্দ। ঘোর লেগে যায়। দুপাশে সারি সারি দালান। স্তম্ভিত, আকাশমুখী। কোথায় যাচ্ছি আমরা?

জায়গাটা ছিল জিনজিয়াং ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যান্ড ট্রেড সেন্টার। আমরা কেউ ওর নাম দিয়েছিলাম ‘বঙ্গবাজার’, কেউ ‘গুলিস্তান’। কারণ দামাদামির ফিরিস্তি। সস্তা, পাইকারি। গ্র্যান্ডবাজার, ওয়ান্ডা কিংবা মিনজু রোডে অতোটা দেখিনি। ঘড়ি, ব্যাগ, জুতো, মোজা, খেলনা, প্রসাধনী, রোদ চশমা কিংবা গার্মেন্টস! ঢাকার নিউমার্কেটের মতো মূল্য ঝোলানো। অফার মূল্য, বিশেষ মূল্য, সাশ্রয়ী মূল্য। বাংলাদেশের কাছাকাছি, ক্ষেত্র বিশেষে আরও কম। কিন্তু জিনিস ভালো। সবার মুখে হাসি। অনেকের অবশ্য আফসোস, আগে কেন নিয়ে আসা হলো না এখানে! এরই মাঝে যে অনেকে বেশি দামে অনেক কিছু কিনে ফেলেছে!
যাই হোক, গত কয়েকদিনের শপিং-এ বিশেষ অভিজ্ঞতা হলো। চীনের বড় শহরগুলোতে প্রধানত তিন ধরনের বাজার পাওয়া যায়। এক, গ্র্যান্ডবাজারের মতো পর্যটন মার্কেট। শৌখিন, দাম চড়া, দরদাম কম। দুই, ওয়ান্ডার মতো বৃহৎ বিপণি বিতান। দাম চড়া, একদাম, ব্র্যান্ডেড। তিন, ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট। সাশ্রয়ী, বঙ্গবাজার বা গুলিস্তান ধরনের, দরদামপূর্ণ। এছাড়া আছে বিশেষ পণ্য কেন্দ্রিক মার্কেট, যেমন মিনজু রোড বা ইলেকট্রনিক মার্কেট। ঢাকার যেমন আইডিবি কিংবা মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার। এই সূত্র মাথায় রাখলে চীনে কেনাকাটায় সুবিধা হবে।
শপিং শেষে বাইরে এসে তো অবাক! সোমা আপু (সোমা বেগম, সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার) এতোদিন বলে আসছিলেন, শপিং নাকি ছোঁয়াচে। আজ দেখছি তার হাতেও কিছু ব্যাগ! মহামারী হলে আসলে কেউই রক্ষা পায় না, কিংবা ‘সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে’। সোমা আপুর হয়েছে সেই দশা। যাক, একে একে সবাই ফিরে আসতে লাগলো এমির নির্ধারিত জায়গায়, মার্কেটের সামনে।
এরই মাঝে সহকর্মী সজল কুমার দাশ লাপাত্তা। সঙ্গে সহকর্মী শাহ পরান ও মবিন হাই। শুনলাম তারা রেড হিলের দিকে গেছেন। আমি চমকে গেলাম! রেড হিল! সেই লাল ড্রাগন? বন্যা, ওয়াংমু, যুদ্ধ? রেড হিল মানেই তো সেই দানব পাহাড়, উরুমচি নদী। বিদ্যুৎ ঝলকের মতো নিমিষেই সব মনে পড়ে গেল, আসার সময়ই যে বাসে পড়লাম। আমি যাব না? কিন্তু সন্ধ্যার পর যে আমার আরেক জায়গায় যাওয়ার কথা!
উরুমচিতে আসার পর থেকেই শুনছিলাম হোটেলের কাছেই একটা স্কয়ারে নাকি চীনারা নাচ-গান করে সন্ধ্যার পর। দল বেঁধে, কমিউনিটি নাচ। সহকর্মী ইউনূস (মো. ইউনূস আলী, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা) খবরটা প্রথমে চাউর করেছিল। কিন্তু সময় পাচ্ছিলাম না। তাই আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম, আজ যাব। তাহলে এখন রেড হিলের কী হবে? দুই জায়গায় তো এক সঙ্গে যাওয়া অসম্ভব। তাছাড়া বিকেল ম্লান হয়ে আসছে। আলো পড়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার পর তো আবার অন্ধকার। তখন যদি মৃত লাল ড্রাগনটা ফের জেগে উঠে কালো কোর্তা গায়ে! আকাশের সব তারা আড়াল করে সামনে এসে দাঁড়ায়! তখন কী হবে?

“কী আর হবে, লেনিন ভাই চলেন” বলে পাশ থেকে সহকর্মী নজরুল হাত ধরে টান দিতেই সংবিৎ ফিরে পেয়ে বাসে ঢুকে পড়ি। পেছন থেকে সে বলতে থাকে, “কিচ্ছু হবে না। যারা দলছুট হয়েছে, হংশানের দিকে গেছে, ঠিকঠাক তারা ফেরত আসবে। চীনে চুরি ছিনতাইয়ের ভয় নাই।”
সবাই উঠলে বাস চলা শুরু করলো। মাথা ঘুরে উঠে পড়লো উড়ালসড়কে। দম নিয়ে ছুট, চোখ বুজে। পত পত, শো শো। টানেল। উঁচু উঁচু দালানের সারি। দৃষ্টি বাইরে। শেষ বিকেল, ম্লান আলো। এক্সপ্রেসওয়ে, উপরে ৭/৮ তলা উঁচু। নিচে আড়াআড়ি রাস্তা, প্রশস্ত। পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিক্ষিপ্ত মানুষ। দূরে, আরও দূরে তিয়ানশান পর্বত। তিয়ানশানের পর হাজার হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশ, ঢাকা। কয়েকটা মুখ। আহ! দীর্ঘশ্বাস।
দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে মোবাইলে সুইপ করি। মার্কেটে থাকতেই সালাম মেসেজ দিয়েছিল, “তোমাকে চীনের ঐতিহ্যবাহী সংগীতের একটা লিংক পাঠিয়েছি। সময় করে পড়ো।” ব্যাপারটা কাকতালীয়! আজ সন্ধ্যায়ই তো ওদের নাচ গানে যাচ্ছি। কোথাও যাওয়ার আগে সেখানকার প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো জেনে নিলে দৃষ্টির গভীরতা আসে। সুতরাং তাহলে আর দেরি কেন? পড়া শুরু করলাম।
জিনজিয়াং এমনকি সমগ্র চীনের জনপ্রিয় একটি সংগীত হলো ‘দেবাংচের মেয়ে’। গানে ও নাচে আবেগময় প্রেমের প্রকাশ, মনে পড়ে গ্র্যান্ডবাজারে উপভোগ করেছিলাম। হিউই নামে একটা মেয়ের সঙ্গে তখন পরিচয় হয়েছিল। তৃতীয় পর্বে যা লিখেছিলাম, হিউই এর কথা অবশ্য লেখা হয়নি। সামনের কোনো পর্বে লিখবো। দ্বিতীয় জনপ্রিয় সংগীত হলো ‘মুকাম’। পারস্য, আরব ও মধ্যএশিয়ার সংমিশ্রিত সম্মোহনী এক সংগীত। সিল্ক রোড কেন্দ্রিক। সঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূর্ছনা।
সবচেয়ে বিখ্যাত ‘দ্য টুয়েলভ মুকাম’। সাংস্কৃতিক মহাকাব্য। পূর্ণ পরিবেশনায় লাগে প্রায় ২০ ঘণ্টা। ইউনেস্কো যাকে বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তারপর আছে ‘সানাম’ নামে জনপ্রিয় আরেক ধরনের নৃত্যসঙ্গীত। এছাড়া আছে আলামুহান, লিফট ইয়োর ভেইল, আধুনিক পপ ও ফিউশন সঙ্গীত। তাহলে সন্ধ্যায় কী অপেক্ষা করছে?

কৌতূহলে হোটেলে ফিরে আর দেরি সইল না। হালকা একটু গুছিয়ে নিয়ে হাতের ব্যাগগুলো বিছানায় ফেলে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। হোটেল গেইট পার হতেই কানে মিউজিকের সুর ভেসে এলো। কোন দিকে? ডানে। আঁচ করতে পেরেই সেদিকে পা চালালাম। একটু এগোতেই সালামের সঙ্গে দেখা। সঙ্গে সেই লি ও জিন, সালামের দুই বান্ধবী। পরশু সন্ধ্যায় ক্যাফেতে পরিচয় হয়েছিল। আমাকে দেখে ওরা হাত নেড়ে সম্ভাষণ জানালো। স্মিত মুখে আমিও। সালাম কাছে ঘেঁষে বলল, “যাবে নাকি আমাদের সঙ্গে?”
আমি ইতস্তত করে বললাম, “আজ যে... আজ নাচের অনুষ্ঠানে...।” “ও শিউর। শিউর। গো এহেড, দেন লেফট।” সালামদের ছেড়ে রাস্তা ক্রস করে ওপারে চায়না টেলিকমের বিপরীতে প্রবেশ করতেই বিশাল এক স্কয়ার। উন্মুক্ত ফাঁকা স্থান। এপাশে এল-শেপের ছাউনি, কংক্রিটের, বসার লোহার বেঞ্চ। এক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে সামনের খোলা চত্বরে নেমে পড়ি। দূরে নাচ-গান হচ্ছে। সম্মিলিত নাচ-গান। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই অংশ নিচ্ছে। মিউজিকের তালে তালে হালকা ব্যায়ামের ধাঁচে।
দূরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে একটা বেঞ্চিতে বসি। পেছনে দেখি বিশাল নকশা আঁকা ইমারত। হোটেল হবে হয়তো। ডানে আর একটা ভবন, একটু দূরে। লাল সাইনবোর্ড। মোবাইল দিয়ে স্ক্যান করে দেখি লেখা ‘হসপিটাল অব চায়না ট্রেডিশনাল মেডিসিন’। তৎক্ষণাৎ মনে পড়লো আজকের ক্লাশেও প্রফেসর বলছিলেন, চীনে পশুচিকিৎসা পুরোপুরি অ্যান্টিবায়োটিকের উপর নির্ভরশীল নয়। ট্রেডিশনাল ড্রাগও পাশাপাশি ব্যবহার করে। এভাবেই তারা ‘অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ (এএমআর) মোকাবিলা করছে।
অথচ এই এএমআর ইস্যুতে পুরো বিশ্বে এখন হইচই চলছে। ব্যাকটেরিয়া যদি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে পড়ে, তাহলে তো সামান্য কাটা-ছেঁড়াতেই প্রাণী মারা পড়বে। অথচ চীনারা আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের হাজার বছরের নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতিও জারি রেখেছে। গবেষণা করছে, আরো আধুনিক করেছে। এজন্যই বোধ হয় বলা হয়, ‘জ্ঞান অর্জনে সুদূর চীনে যাও’।
এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ ‘আই এম অ্যা ডিসকো ড্যান্সার’ গান বেজে উঠল। চমকে যাই। পরিচিত না গানটা? হ্যাঁ হ্যাঁ, বহুবার শুনেছি। উঠে এগিয়ে গেলাম সামনে। ততক্ষণে গানের তালে তালে নাচ শুরু হয়ে গেছে। কাছে যেতেই ইউসুফ ভাইকে দেখলাম ওপাশে দাঁড়িয়ে। ঘুরে ওদিকে যেতেই দেখি সহকর্মী সাইদুল রহমানও আছেন। ইউসুফ ভাই আমাকে দেখে ইশারা করে ওদিকে ডাকলেন। তিন বিদেশিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চীনা কয়েকজন নারী-পুরুষ আমাদের তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু সংকোচে নিজেকে নির্বৃত্ত করলাম সেদিন।
রাতে রুমে ফিরে ক্লান্ত শরীর। জানালার ওপাশে রাতের উরুমচি। চেয়ারে গা এলিয়ে ভাবতে থাকি। পাঁচ দিন হলো বাংলাদেশ ছেড়েছি। নিয়ম করে ক্লাস করছি, এদিক সেদিক যাচ্ছি। কত কী দেখছি! নতুন নতুন, ভিন্ন ভিন্ন। শিশুর মতো কৌতূহল। প্রযুক্তির কল্যাণে বাংলাদেশের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছি, কথা বলতে পারছি। কিন্তু স্পর্শ করা যাচ্ছে না, কাউকে ছোঁয়া যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে যেন আকাশবাসী হয়ে গেছি। যাকে বলে আকাশের তারা। আপাতত ফেরার পথ বন্ধ...।
চলবে…