অনূদিত গল্প
Published : 26 Apr 2026, 01:18 AM
সামাদ বেহরঙ্গি (১৯৩৯–১৯৬৮) ছিলেন আধুনিক ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক, শিক্ষক এবং সমাজকর্মী। তিনি মূলত শিশু-কিশোরদের জন্য লিখলেও তার প্রতিটি লেখায় লুকিয়ে থাকত রাজনৈতিক ও দার্শনিক বার্তা। তার অমর সৃষ্টি ‘মাহি-ইয়ে সিয়াহ-ইয়ে কুচুলু’ (ছোট কালো মাছ) বইটি ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয়।
এটি কেবল একটি ছোটদের গল্প নয়, বরং একে অন্যায়, কূপমণ্ডূকতা এবং একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রূপক হিসেবে দেখা হয়। গল্পটি প্রকাশের পরপরই তা আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ইতালি ও চেকোস্লোভাকিয়ায় আন্তর্জাতিক পুরস্কার জয় করে। জীবনের সীমাবদ্ধ গণ্ডি পেরিয়ে অজানাকে জানার যে স্পৃহা, তার এক চিরকালীন দলিল এই গল্পটি।
শীতের সেই দীর্ঘতম রাত। সমুদ্রের অতল গভীরে এক বুড়ি মাছ তার ১২ হাজার সন্তান আর নাতি-নাতনিকে নিজের চারপাশে জড়ো করে চমৎকার এক গল্প বলতে শুরু করল। গল্পটি এমন–
এক সময় ছিল এক ছোট কালো মাছ। সে তার মায়ের সঙ্গে পাহাড়ের সরু খাঁড়িতে, পাথরের আড়ালে শ্যাওলা
ঘেরা ছোট্ট এক ঘরে বাস করত। মা আর সন্তান সারাদিন একে অপরের পিছু পিছু সাঁতার কাটত, মাঝে মাঝে অন্য মাছদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলত। মা মাছটির ১০ হাজার ডিমের মধ্যে কেবল এই কালো মাছটিই বেঁচে ছিল, তাই সে ছিল মায়ের নয়নের মণি।
কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে ছোট মাছটির আচরণে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিল। সে আর আগের মতো খেলাধুলা করে না, চুপচাপ কী যেন ভাবে। একদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগেই সে তার মাকে ডেকে তুলল, “মা, তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।”
মা আধোঘুমে হাই তুলে বললেন, “এখন তো কেবল ভোর হলো বাপু, কথা পরে হবে। চল আগে একটু সাঁতার কেটে আসি।” ছোট মাছটি দৃঢ় স্বরে বলল, “না মা, আমি আর এই সরু নালায় সাঁতার কাটতে চাই না। আমি চলে যেতে চাই।”
মায়ের ঘুম মুহূর্তেই ছুটে গেল, “চলে যেতে চাস মানে? কোথায় যাবি?” ছোট মাছ বলল, “আমি দেখতে চাই এই ঝরনাটি কোথায় শেষ হয়েছে। আমি জানতে চাই এই পাহাড়ের ওপারে কী আছে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তগুলোতে কী ঘটছে। জীবন কি কেবল একটা পাথরের তলে বুড়ো হওয়া পর্যন্ত চক্কর কাটা, নাকি এর বাইরেও অন্য কোনো মানে আছে?”
মা অবাক হয়ে হাসলেন, “পাগল নাকি! ঝরনার কোনো শেষ নেই। পৃথিবী বলতে এই যেটুকু দেখছিস এটুকুই। এসব আবোল-তাবোল চিন্তা মাথা থেকে বের কর।”
কিন্তু ছোট মাছটি থামল না। তাদের এই তর্কে প্রতিবেশীরাও এসে জুটল। এক বৃদ্ধা মাছ রেগে গিয়ে বলল, “কী অহংকারী ছোকরা! আমাদের কি তবে বুদ্ধি-শুদ্ধি নেই? একে একটা চড় মারা উচিৎ।”
প্রতিবেশীরা যখন তাকে আক্রমণ করতে চাইল, তখন কালো মাছটির কয়েকজন সমবয়সি বন্ধু এগিয়ে এলো। তারা তাকে রক্ষা করল। বিদায়লগ্নে ছোট মাছটি বলল, “বন্ধুরা, তোমরা হয়তো এখানে থেকে যাবে, কিন্তু মনে রেখো- জীবন মানে শুধু টিকে থাকা নয়, জীবন মানে অজানাকে জয় করা।” তার সাহসী কথাগুলো বন্ধুদের মনে এক নতুন চেতনার জন্ম দিল।
ছোট মাছটি ঝরনা বেয়ে নিচে ঝাঁপ দিল। এক বিশাল জলাশয়ে এসে পড়ল। সেখানে হাজার হাজার ব্যাঙাচি কিলবিল করছিল। তাকে দেখে ব্যাঙাচিরা হাসাহাসি শুরু করল, “কেমন বিদঘুটে কালো কুৎসিত চেহারা তোমার! আমাদের মতো অভিজাত রূপ কি তোমার আছে?”
মাছটি শান্তভাবে উত্তর দিল, “তোমরা আসলে রূপ নিয়ে বড়াই করছ কারণ তোমরা বাইরের জগৎ সম্পর্কে কিছুই জানো না। তোমাদের জগৎ এই পুকুরটুকুই। কিন্তু আমি জানি, এর বাইরেও একটা মহাবিশ্ব আছে।”
ঠিক সেই সময় এক বুড়ি ব্যাঙ গম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠল, “এই অসভ্য মাছ! আমার সন্তানদের মাথা নষ্ট করিস না। এই পুকুরই হলো আসল পৃথিবী।”
মাছটি তাকে অবজ্ঞা করে আরও সামনে এগিয়ে চলল। সে বুঝল, সংকীর্ণ মনের মানুষদের সঙ্গে তর্ক করে কোনো লাভ নেই। পথের মাঝে এক পাথরের খাঁজে সে বিশাল এক টিকটিকির দেখা পেল। টিকটিকিটি ছিল অত্যন্ত জ্ঞানী। সে মাছটিকে বলল, “সাবধান ছোট বন্ধু! সামনে গেলে তুমি পেলিক্যান বা গগনবেড় পাখি এবং ধূর্ত বকের মুখোমুখি হতে পারো। পেলিক্যান তার গলার থলিতে মাছ আটকে রাখে।”
টিকটিকিটি তার সংগ্রহের একটি অতি ক্ষুদ্র কিন্তু তীক্ষ্ণ ছোরা মাছটিকে উপহার দিল এবং বলল, “যদি কখনো পেলিক্যানের থলিতে আটকা পড়ো, এটি ব্যবহার করো।”
কালো মাছটি সেই ধারালো অস্ত্রটি মুখে নিয়ে আরও সামনে এগিয়ে চলল। পাহাড়ি ঝরনাটি ধীরে ধীরে এক বিশাল নদীতে রূপ নিল। নদীর দুপাশে ঘন বন, দূরে পাহাড়। সে পথে হরিণকে জল খেতে দেখল, দেখল কচ্ছপদের অলস রোদ পোহানো। রাতে সে চাঁদের সঙ্গে কথা বলল। চাঁদ তাকে বলল, “এই পৃথিবী অনেক বড়, ছোট বন্ধু। তবে তোমার সাহস দেখে আমি মুগ্ধ।”
একদিন হঠাৎ এক দুর্ঘটনা ঘটল। কালো মাছটি এবং একদল ছোট মাছ পেলিক্যানের বিশাল চঞ্চুর নিচে আটকা পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে তারা পেলিক্যানের গলার অন্ধকার থলিতে বন্দি হয়ে গেল। অন্য মাছগুলো ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করল এবং প্রাণভিক্ষা করতে গিয়ে কালো মাছটির ওপর সব দোষ চাপিয়ে দিল। তারা পেলিক্যানকে বলল, “হে মহান সম্রাট! এই কালো মাছটিই আমাদের কুপথে এনেছে। আমাদের ছেড়ে দিন।”
ধূর্ত পেলিক্যান হাসল। সে বলল, “তোমরা যদি ওই কালো মাছটাকে শ্বাসরোধ করে মারতে পারো, তবেই আমি তোমাদের মুক্তি দেব।”
অন্য মাছগুলো প্রাণের ভয়ে নিজেদের বন্ধুকেই হত্যা করতে উদ্যত হলো। ছোট কালো মাছটি বুঝল, ভয় মানুষকে কতটা নিচ করে দেয়। সে চেঁচিয়ে বলল, “তোমরা ভুল করছ! ও আমাদের কাউকেই ছাড়বে না।” কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না।
অগত্যা ছোট মাছটি একটি ফন্দি আঁটল। সে মরে যাওয়ার ভান করল। অন্য মাছগুলো যখন ভাবল সে মরে গেছে, তখন পেলিক্যান মুখ খুলল তাদের গিলে ফেলার জন্য। ঠিক সেই চরম মুহূর্তে ছোট মাছটি তার লুকানো ছোরা দিয়ে পেলিক্যানের গলার পাতলা চামড়া চিরে ফেলল। যন্ত্রণায় পেলিক্যান ছটফট করতে লাগল এবং কালো মাছটি দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে খরস্রোতা নদীতে ঝাঁপ দিল। তার অন্য সঙ্গীরা কিন্তু আর ফিরতে পারল না, তারা পেলিক্যানের উদরেই প্রাণ হারাল।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। ছোট কালো মাছটি পৌঁছাল তার আজীবনের স্বপ্ন- বিশাল সমুদ্রে। চারদিকে নীল জলরাশি, যার কোনো কূল-কিনারা নেই। সে সেখানে বিশাল বিশাল মাছের ঝাঁক দেখল। তারা সমুদ্রে জেলেদের জাল ছিঁড়ে ফেলার পরিকল্পনা করছিল। কালো মাছটি ভাবল, “আমি এতদিন যা খুঁজছিলাম, তা পেয়েছি। জীবনের সার্থকতা কেবল নিজের সুখে নয়, বরং বৃহত্তর কোনো লড়াইয়ে শামিল হওয়ার মাঝে।”
তবে সমুদ্র যেমন সুন্দর, তেমনি ভয়ংকর। হঠাৎ আকাশ থেকে এক ক্ষুধার্ত বক বিদ্যুৎবেগে নেমে এলো এবং কালো মাছটিকে তার ঠোঁটে চেপে ধরল। বকের পেটের ভেতরে গিয়ে সে দেখল এক অতি ক্ষুদ্র মাছ ভয়ে কাঁপছে। সেই খুদে মাছটি কাঁদছিল আর তার মায়ের কাছে যেতে চাইছিল।
কালো মাছটি তাকে সাহস দিয়ে বলল, “কেঁদো না। আমি তোমাকে মুক্ত করার পথ দেখাচ্ছি। আমি বকের পেটের ভেতর সুড়সুড়ি দেব, আর ও যখন যন্ত্রণায় বা হাসিতে মুখ খুলবে, তুমি লাফ দিয়ে বেরিয়ে যাবে।” খুদে মাছটি অবাক হয়ে বলল, “আর আপনি?”
“আমার কথা ভেবো না। এই শয়তান বকটাকে শেষ না করে আমি যাচ্ছি না,” কালো মাছ জবাব দিলো। পরিকল্পনামতো কালো মাছটি বকের পেটের নরম অংশে নিজের ছোরা দিয়ে আঘাত করতে লাগল। বক যন্ত্রণায় চিৎকার করে মুখ খুলতেই খুদে মাছটি মুক্ত হয়ে জলে পড়ল। কিন্তু ছোট কালো মাছটির আর কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। বকটি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে সমুদ্রের লোনা জলে আছড়ে পড়ে চিরতরে হারিয়ে গেল।
বুড়ি মাছ তার গল্প শেষ করল। ১২ হাজার নাতি-নাতনির মধ্যে ১১ হাজার ৯৯৯টি মাছ ‘শুভরাত্রি’ বলে ঘুমিয়ে পড়ল। তাদের কাছে এটা ছিল কেবলই এক বীরত্বের কাহিনি। কিন্তু একটি মাত্র ছোট লাল মাছ কিছুতেই ঘুমাতে পারল না। সে সমুদ্রের নীল জলের স্বপ্ন দেখতে লাগল। তার দুচোখে তখন অজানাকে জয় করার এক নতুন অগ্নিশিখা। সে বুঝল, ছোট কালো মাছ মরে গিয়েও বেঁচে আছে তার মতো হাজারো লাল মাছের স্বপ্নের মধ্যে।