Published : 24 Apr 2026, 01:15 AM
আমির খসরু (১২৫৩–১৩২৫) তেরো শতকের মরমি সাধক কবি, সংগীতজ্ঞ ও বহুভাষাবিদ। একদিকে ‘কাওয়ালির জনক’ হিসেবে খ্যাত, অন্যদিকে হিন্দুস্তানি আর পারসি সংস্কৃতির সংযোগকারী। ভারতের ‘তোতাপাখি’ খেতাবে ভূষিত এই কবির কবিতার মূল সুর আধ্যাত্মিকতা ও লৌকিক বিরহ। আভিজাত্য ভেঙে সাধারণ মানুষের আবেগ আর ভাষার ভেতর দিয়ে জীবনের দিকে তিনি তাকিয়েছেন একজন সুফির চোখে।
খসরু ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির এক মহিরুহ। ১২৫৩ সালে উত্তরপ্রদেশের পাটিয়ালিতে জন্ম নেওয়া এই সাধকের রক্তে ছিল তুর্কি ও ভারতীয় ধারার মিলন। এই সংমিশ্রণই তাকে করে তুলেছিল ‘গঙ্গা-যমুনা’ বা মিশ্র সংস্কৃতির প্রধান কারিগর।
সংগীতের জগতে খসরুর অবদান অতুলনীয়। তাকে কেবল কাওয়ালির জনক বলা হয় না, বরং প্রচলিত আছে যে তিনি সেতার এবং তবলার মতো বাদ্যযন্ত্রেরও ‘উদ্ভাবক’। তিনি পারস্যের সুরের সঙ্গে ভারতীয় রাগ-রাগিণীর সমন্বয় ঘটিয়ে ‘খেয়াল’ ও ‘তারানা’ সংগীত পদ্ধতি চালু করেন। তার সৃজনশীলতায় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত নতুন মাত্রা পায়।
খসরুকে উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যের ‘আদি পুরুষ’ হিসেবেও গণ্য করা হয়। তিনি প্রথম কবি যিনি আভিজাত্যের ফারসি ভাষার সঙ্গে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ‘হিন্দবি’ বা ‘ব্রজভাষার’ মিশেলে কবিতা লিখেছিলেন। তার রচিত ধাঁধা, প্রবাদ এবং ‘খালিক-ই-বারি’ নামক পদ্য-অভিধান আজও লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ভারতপ্রেমিক এই কবি তার ‘নুহ সিপহর’ কাব্যে ভারতের প্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতিকে ‘স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তার মুর্শিদ হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া। গুরু ও শিষ্যের এই প্রেম আধ্যাত্মিক জগতের এক অনন্য আখ্যান। দিল্লির সাতজন সুলতানের শাসনকাল দেখলেও রাজৈশ্বর্য তাকে স্পর্শ করতে পারেনি; তিনি আজীবন একজন সুফি হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থেকেছেন। তার বিখ্যাত কালাম ‘ছাপ তিলক সব ছিনি রে’ আজও খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী ও নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরবারে ভক্তির মূল সুর হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়।
১৩২৫ সালে গুরুর মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস পরেই শোকাচ্ছন্ন খসরু শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়া দরগাহ চত্বরেই তাকে সমাহিত করা হয়। তার কবিতা ও দর্শনে যে মানবিকতা ও প্রেমের জয়গান গাওয়া হয়েছে, তা শত শত বছর পার করেও আজও দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে আছে। এখানে তার কয়েকটি কবিতা ও দ্বিপদী ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হলো।
একটা সংবাদ আসল
আজ রাতে একটা সংবাদ আসল যে তুমি,
ও প্রাণের প্রিয়ে, তুমি আসবে—
সে পথে উৎসর্গ করা হোক আমার মস্তক,
যে পথে সওয়ার হয়ে তুমি আসবে!
মরুভূমির সব হরিণ তাদের মাথা
রেখে বসে আছে তাদের হাতের ওপর
এই প্রত্যাশায় যে তাদের শিকার করতে
একদিন তুমি আসবে…
প্রেমের এই টান তোমাকে থাকতে দেবে না নির্বিকার;
আমার জানাজায় যদি তুমি না-ও আসো,
আসবে তুমি নিশ্চিত আমার কবরের নিকট
আমার প্রাণ থমকে আছে ঠোঁটে এসে
(যেমন—আমি শেষ মুহূর্তে):
আসো, যাতে বেঁচে থাকতে আমি পারি—
যখন আমি আর থাকব না, তখন আর
কোন প্রয়োজনেই বা তুমি আসবে?
প্রিয় পিতা
কেন তুমি আমাকে বিচ্ছিন্ন করলে তোমার থেকে? প্রিয় পিতা, কেন?
আমার ভাইদেরকে তুমি দিয়েছ দুইতলা বাড়ি,
আর আমাকে, একটা বিদেশ-ভূমি? কেন প্রিয় পিতা, কেন?
আমরা (কন্যাগণ) তো তোমার খুঁটিতে আটকা গরু মাত্র,
সেদিকেই যাবো চলে যেদিক দিয়ে নেবে খেদিয়ে, প্রিয় পিতা।
আমরা তো তোমার বাগানের স্রেফ ফুলের-কোরক,
যাদের চাওয়া হয়, প্রতিটি ঘরে-ঘরে, প্রিয় পিতা।
আমরা তো কেবল তোমার খাঁচার পাখি,
উড়াল দেব যখন আবার সকাল, প্রিয় পিতা।
বাড়িতে ফেলে আসলাম পুতুলভরা সব কুলুঙ্গি,
আর ছেড়ে আসলাম সব বন্ধুও, প্রিয় পিতা।
আমার পালকি যখন যাচ্ছিল বারান্দার নিচ দিয়ে,
ভাই আমার মূর্ছা গেল আর পড়ল লুটিয়ে, প্রিয় পিতা।
পালকি থেকে পর্দাটা যেই আমি সরিয়ে ফেললাম,
দেখি আমরা পৌঁছে গেছি প্রাণের প্রিয়ের ঘরে, প্রিয় পিতা।
কেন আমাকে পৃথক করলে তোমার থেকে, প্রিয় পিতা, কেন?
আমার এই যৌবন
আমার এ যৌবন মেলছে কুঁড়ি, তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ভরপুর;
প্রাণের প্রিয়েকে ছাড়া কী করে কাটাই আমার এই সময়?
কেউ কি ভুলিয়ে-ভালিয়ে আনবে নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে,
যতই তাকে আমি সাধি, ততই তিনি মুখ ফেরান অভিমানে;
আমার যৌবন মেলছে কুঁড়ি…
এই চুড়িগুলো ভেঙে ফেলতে চাই খাটের গায়ে,
আর এই পরিধান ছুঁড়ে দিতে চাই আগুনে,
শূন্য এই শয্যা আমাকে করে তোলে ভীত,
বিচ্ছেদের এই আগুন আমাকে পোড়ায় সারাক্ষণ।
ও, প্রাণের প্রিয়ে। আমার যৌবন মেলছে কুঁড়ি।
কাপলেট ১
মজনুর শেকলের ক্যাঁচক্যাঁচই প্রেমিকদের অর্কেস্ট্রা,
এর সংগীতের কদর করা পণ্ডিতদের বোধের বাইরে।
তাৎপর্য: দ্বিপদীটি ১৩ শতকের দিল্লি সালতানাত সময়ের পারস্য কবিতাধারার স্বতন্ত্র স্বাক্ষর বহন করে। মজনুর শেকলের কর্কশ বা কড়মড় ধ্বনিকে খসরু এখানে ভাবছেন ‘ঐকতান’ বা সংগীত হিসেবে। এটি সুফিদর্শনের এক গূঢ় সত্যকে উপস্থাপন করে। যেখানে দুনিয়াবি যন্ত্রণা আর প্রেমিকের আর্তি রূপ নেয় পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের সুরে। রূপকে আবৃত এই শৃঙ্খল-ধ্বনি নিছক উন্মাদনার প্রতীক-ই নয়; তপস্যা আর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের এক শৈল্পিক প্রতিফলনও।
খসরু এখানে ‘উলুল-আলবাব’ বা বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণদের প্রসঙ্গ টেনে ইঙ্গিত করছেন জ্ঞানের সেই সীমাকে; যুক্তিনির্ভর পাণ্ডিত্য এসে যেখানে থেমে যায়। পাশাপাশি তৈরি করছেন এক সূক্ষ্ম বৈপরীত্য—সাধারণ চোখে যা বিশৃঙ্খলা বা বিলাপ; সেটাই আশেক বা প্রেমিকদের কাছে আধ্যাত্মিক সামঞ্জস্যের সংগীত। বুদ্ধি ও যুক্তির গণ্ডি পেরিয়ে, হৃদয়ের অতল অনুভূতি দিয়ে এই সুর অনুভব করতে পারাই এর সার কথা।
কাপলেট ২
যদি তাকে নাও দেখি, অন্তত তার কথা ভাবতে তো পারি, আর এতেই আমি সুখী;
ভিক্ষুকের কুঁড়েঘর আলো করতে জোছনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোনো মোমবাতি নেই।
তাৎপর্য: দ্বিপদীটি ১৩ শতকের দিল্লি সালতানাতে প্রচলিত সুফি দর্শনের এক শান্ত ও গভীর প্রকাশ; যেখানে জাগতিক বিচ্ছেদ যন্ত্রণাকে খসরু ধ্যান আর স্মরণের মাধ্যমে রূপ দেন এক অন্তর্গত প্রশান্তিতে। প্রাণের প্রিয়ে অর্থাৎ স্রষ্টা দূরে অবস্থান করলেও তার স্মৃতিই যখন আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে, তখন সেটা সুফিবাদের ‘ইশক-এ-হাকিকি’ বা আল্লাহর প্রেমের ইঙ্গিত দেয়। কবিতায় ব্যবহৃত ‘জোছনা’ ও ‘ভিক্ষুকের কুঁড়েঘর’ এই দুই রূপক মূলত এমন তৃপ্তির প্রতীক যা আড়ম্বরহীন। খসরু বলছেন, কৃত্রিম মোমবাতির চাইতে অবাধ জোছনাই নিঃস্বের কুটিরকে অধিক আলোকিত করে। এর মানে বাহ্যিক মিলনের চাইতে হৃদয়ে লালিত প্রিয়তমের যে স্মৃতি সেটাই দৃঢ় বিশ্বাসী আত্মার শান্তির জন্য বেশি জরুরি। খসরু এও স্মরণ করিয়ে দেন—সুখের আসল চাবি পাওয়াতে নয়; বরং অন্তরের গভীর অনুধ্যানে।
কাপলেট ৮
তোমাকে দেখাচ্ছে নির্ঘুম, কার আলিঙ্গনে তোমার রাত কেটেছে?
তোমার মাতাল চোখে এখনও রয়ে গেছে সেই নেশার দাগ।
তাৎপর্য: দিল্লি সালতানাত যুগের পারস্য ধ্রুপদী কবিতারীতির আরেক অসামান্য উদাহরণ—যেখানে অনিদ্রা ও রক্তাভ নয়ন কেবল জাগতিক প্রেমের-ই লক্ষণ নয়; সুফি দর্শনে এটি ঐশ্বরিক প্রেমের ‘খুমারি’—অর্থাৎ এক গভীর আধ্যাত্মিক আবেশের ইঙ্গিত। এখানেও খসরু তার স্বতন্ত্র সৃজনশৈলী আর রূপকের মাধ্যমে আড়াল করছেন মরমি মিলন ও অন্তর্লীন ব্যকুলতাকে। সেই সঙ্গে, এটি পারস্য ‘গজল’ ঐতিহ্যের সূক্ষ্ম-ইঙ্গিতময় শৈলীকেও সামনে নিয়ে আসে। যেখানে প্রেমিকের বাহ্যিক লক্ষণ—অনিদ্রা, মত্ত দৃষ্টি, ক্লান্ত অবয়ব—সাক্ষ্য হয়ে ওঠে অন্তরের গোপন অনুরাগের। জাগতিক মত্ততা আর আধ্যাত্মিক পরমানন্দের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খসরু এখানে এক চমৎকার অস্পষ্টতা বজায় রাখছেন, সেটা অত্যন্ত সচেতনভাবেই।