Published : 01 Jul 2026, 05:22 PM
বিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী ঔপন্যাসিক, কবি ও সমালোচক ভ্লাদিমির নাবোকভ (১৮৯৯-১৯৭৭)। তাকে আমরা অনেকেই চিনি তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ললিতা’-র জন্য। কিন্তু লেখকের জীবনে আরেকটি দারুণ দিক ছিল, তিনি তরুণ বয়সে ফুটবল মাঠের গোলকিপার ছিলেন।
ফুটবল কেবল শখ ছিল না, বরং এই গোলকিপিংয়ের অভিজ্ঞতা তার লেখক হওয়ার পেছনে এবং চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলেছিল। ১৮৯৯ সালে রাশিয়ায় নাবোকভের জন্ম। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর তাদের পরিবার রাশিয়া ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। জীবনের একটি বড় অংশ তিনি ইউরোপ এবং আমেরিকায় নির্বাসিত জীবন কাটান।
‘পেল ফায়ার’ এবং ‘পনিন’ নাবোকভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য বেশ কয়েকবার তার নাম মনোনীত হয়েছিল। বিখ্যাত এই মানুষটি শুধু একজন লেখকই ছিলেন না, একাধারে ছিলেন ফুটবল মাঠের গোলকিপার, দাবাড়ু এবং পেশাদার প্রজাপতি গবেষক।
নাবোকভ পড়তেন সেন্ট পিটার্সবার্গের টেনিশেভ স্কুলে। সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাবোকভের গোলকিপার হওয়াটা একদম পছন্দ করতেন না। তিনি মনে করতেন, খেলাধুলার মানে হলো সবাই মিলে ‘একসঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করা’। তাই তিনি নাবোকভকে সন্দেহ করতেন- এই ছেলে কেন অন্য সবার সঙ্গে মাঠে না ছুটে এক জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে!
স্কুলের রিপোর্টেও নাবোকভকে নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছিল যে সে দলের সবার সঙ্গে মেলে না, বড্ড বেশি নিজের মতো চলে এবং ওস্তাদি দেখায়। কিন্তু নাবোকভ জন্মগতভাবেই একটু একলা থাকতে পছন্দ করতেন। আর তাই ফুটবল মাঠের এই গোলপোস্টের একাকীত্বই তাকে সবচেয়ে বেশি টানত।
নাবোকভের চোখে গোলকিপারের ভূমিকাটা দলের বাকি দশজন খেলোয়াড়ের মতো সাধারণ ছিল না। তিনি গোলকিপারকে দেখতেন এক একাকী ও রহস্যময় নায়ক হিসেবে। তার আত্মজীবনী ‘স্পিক, মেমোরি’-তে তিনি লিখেছেন, “রাশিয়া এবং লাতিন দেশগুলোতে গোলকিপার হওয়াটা দারুণ গৌরবের ব্যাপার। সে এক রহস্যময় মানুষ, দলের শেষ ভরসা। রাস্তার ছোট ছোট ছেলেরা মাঠের সেরা গোলকিপারকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পেছন পেছন অনুসরণ করে। তার গায়ের সোয়েটার, মাথার ক্যাপ আর হাতের গ্লাভস তাকে দলের বাকি সবার থেকে একদম আলাদা করে রাখে।”
১৯১৯ সালে নাবোকভ যখন ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান, তখনও তিনি কলেজের ফুটবল দলে গোলকিপার হিসেবে খেলতেন। তবে ইংল্যান্ডের কাদা আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে ম্যাচ চলাকালীন তার মন পড়ে থাকত অন্য কোথাও। যখন খেলা মাঠের অন্য প্রান্তে চলে যেত এবং তার দিকে বল আসার কোনো সম্ভাবনা থাকত না, তখন নাবোকভ ফুটবল ম্যাচ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতেন। তিনি গোলপোস্টে পিঠ ঠেকিয়ে, চোখ বন্ধ করে মনে মনে রুশ ভাষায় কবিতা বানাতেন।
তিনি ভাবতেন, তিনি যেন এক ইংলিশ ফুটবলারের ছদ্মবেশে থাকা কোনো এক রূপকথার জীব, যে এমন এক ভাষায় কবিতা লিখছে যা মাঠের কেউ বোঝে না। নিজের এই অদ্ভুত স্বভাবের কারণে তিনি তার দলের বাকি খেলোয়াড়দের কাছে মোটেও জনপ্রিয় ছিলেন না।
১৯২০ সালে কেমব্রিজে থাকার সময় নাবোকভ তার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে রুশ ভাষায় একটি কবিতাও লেখেন, নাম দেন ‘ফুটবল’। সেটি ছিল মূলত এক তরুণীকে উদ্দেশ্য করে লেখা। কবিতার গল্পটা এমন- এক তরুণী তার এক বন্ধুকে নিয়ে মাঠের পাশে খেলা দেখতে এসেছে। মাঠে নাবোকভ তখন গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে আছেন- রোগা, উসকোখুসকো চুল।
হঠাৎ প্রতিপক্ষের একটা জোরালো শট নাবোকভ শূন্যে লাফিয়ে দারুণভাবে আটকে দিলেন। এই ‘সেভ’ দেখে মেয়েটি অবাক হয়ে তার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, “ওই সাদা জার্সির ছেলেটিকে চেনো?” বন্ধুটি পাইপ টানতে টানতে উত্তর দিল, “ও মনে হয় রাশিয়া থেকে এসেছে। তবে বেশ ভালো খেলে।”
খেলা শেষে মেয়েটি চলে যায়, কিন্তু নাবোকভের মনে তার গলার আওয়াজ থেকে যায়। কবিতার শেষে নাবোকভ লিখেছেন, মাঠের সাধারণ দর্শকরা তো কেবল খেলাই দেখছে, তারা তো আর জানে না যে মাঠের এই কেয়ারফ্রি খেলোয়াড়দেরই একজন রাতে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে আগামী যুগের জন্য অমর কবিতা তৈরি করছে! অর্থাৎ, মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও দর্শকদের মনে নিজের একটা কবি ও বীরের ইমেজ তৈরি করাটাই নাবোকভের কাছে বেশি আনন্দের ছিল।
নোবেল পুরস্কারজয়ী বিজ্ঞানী নিলস বোরের একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। বোরও ১৯০৬ সালের দিকে ডেনমার্কের একটা ফুটবল ক্লাবে গোলকিপার হিসেবে খেলতেন। একবার এক ম্যাচে প্রতিপক্ষ দল অনেক দূর থেকে শট মেরে গোল দিয়ে দেয়, অথচ বোর বলটা আটকানোর কোনো চেষ্টাই করেননি।
পরে জানা গেল, বোর তখন গোলপোস্টে চক দিয়ে গণিতের একটি সমীকরণ মেলাতে এত মগ্ন ছিলেন যে বল গোললাইনে ঢুকে গেছে তাও টের পাননি!
মজার বিষয় হলো, নিলস বোরও একসময় কেমব্রিজের যে কলেজে পড়েছিলেন, নাবোকভও তার কয়েক বছর পর সেই একই কলেজে পড়তে আসেন। হতে পারে তরুণ নাবোকভ কেমব্রিজে এসে বোরের এই গল্পটা শুনেছিলেন এবং মনে মনে মিল পেয়ে খুশি হয়েছিলেন। কারণ বোর গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে অঙ্ক কষতেন, আর নাবোকভ লিখতেন কবিতা!
ভ্লাদিমির নাবোকভের জন্য ফুটবল কেবল একটা খেলা ছিল না, এটি ছিল তার একাকী লেখক জীবনের প্রতিচ্ছবি। একজন গোলকিপার যেমন দলের অংশ হয়েও মাঠের এক কোণে একাই দাঁড়িয়ে থাকে, নাবোকভও সমাজের অংশ হয়েও দূর থেকে সবকিছু একাকী পর্যবেক্ষণ করতেন। ফুটবল মাঠের সেই নিঃসঙ্গ গোলপোস্টই তাকে ভিড়ের মাঝেও নিজের মতো করে সাহিত্য সৃষ্টি করার শক্তি জুগিয়েছিল।
নাবোকভ যে কেবল ফুটবল খেলতেন তা নয়, তিনি একজন অলরাউন্ডার অ্যাথলেট ছিলেন। বক্সিং ও টেনিস খেলতেন, এমনকি একসময় জীবিকার প্রয়োজনে বার্লিনে টেনিসের ট্রেইনার হিসেবেও কাজ করেছেন। খেলাধুলার এই অভ্যাসটি তিনি পেয়েছিলেন তার বাবার কাছ থেকে। তার বাবাও ছিলেন বক্সার ও ফেন্সিং খেলোয়াড়। ছোটবেলায় বাবার বইয়ের লাইব্রেরিতেই নাবোকভ একইসঙ্গে চামড়ার বইয়ের গন্ধ আর বক্সিং গ্লাভস দেখতেন, যা তার মনে দাগ কেটেছিল।
নাবোকভের ফুটবল প্রীতি কিন্তু শুধু কেমব্রিজেই থেমে থাকেনি। ১৯৩১-৩২ সালের দিকে জার্মানির বার্লিনে একটি রাশিয়ান স্পোর্টস ক্লাবের হয়ে খেলার সময় ডাইভ দিতে গিয়ে তিনি মাথায় আঘাত পান এবং মাঠেই অজ্ঞান হয়ে যান। এই ঘটনার পর তার স্ত্রী ভেরা স্বামীর জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তাকে ফুটবল খেলা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বাধ্য করেন।
ফুটবল ছাড়লেও খেলাধুলার প্রতি নাবোকভের ভালোবাসা কমেনি, যা পরবর্তীতে তার সাহিত্যেও ফুটে উঠেছে। তার উপন্যাস ‘গ্লোরি’-র প্রধান চরিত্র মার্টিন ছিল তার মতোই এক নিঃসঙ্গ গোলকিপার, যে নিজের ভয়কে জয় করতে ফুটবল খেলত। এছাড়া তিনি সমালোচক এডমন্ড উইলসনের কাছে চিঠিতে লিখেছিলেন, তিনি চান তাদের মধ্যকার সাহিত্যিক বিতর্কগুলো যেন ফুটবলের মতো গতিশীল ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়, যা থেকে এক হুড়োহুড়ির পর আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।
ফুটবল ও সাহিত্যের বাইরে নাবোকভের আরেকটি মস্ত বড় শখ ছিল। তিনি প্রজাপতি গবেষক ছিলেন এবং জাল হাতে বনে-জঙ্গলে প্রজাপতি ধরে বেড়াতেন। সমালোচকদের মতে, তার এই প্রজাপতি শিকারের সঙ্গে গোলকিপিংয়ের একটা জায়গায় মিল আছে। গোলকিপার যেমন শূন্যে লাফিয়ে বা ডাইভ দিয়ে হাত দিয়ে বল বাগে আনে, ঠিক তেমনি একজন প্রজাপতি শিকারিও শূন্যে জাল ছুড়ে বা লাফিয়ে প্রজাপতি ধরে। ১৯৭৭ সালে সুইজারল্যান্ডে মারা যান ভ্লাদিমির নাবোকভ।
সূত্র: নাবোকভ অনলাইন জার্নাল।