অনূদিত গল্প
Published : 10 Apr 2026, 08:58 AM
নিকোলাই নোসভ (১৯০৮ - ১৯৭৬) ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক। ইউক্রেনের কিয়েভে জন্মগ্রহণকারী এই লেখক মূলত শিশুদের মনোবিজ্ঞান এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনাকে হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরতেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি হলো ‘নেজনাইকা’ বা ‘ডানো’ চরিত্রটি।
১৯৫২ সালে নোসভ সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত হন। তার লেখনি আজও বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে কিশোর পাঠকদের আনন্দ দিয়ে যাচ্ছে। এটি তেমনি এক নিখাদ হাস্যরসে ভরপুর গল্প। দুই বন্ধুর অতি-আত্মবিশ্বাস আর রান্নার আনাড়িপনা কীভাবে একটা সাধারণ রাতকে মহাকাব্যিক বিপর্যয়ে রূপ দেয়, তা-ই এই গল্পের মূল উপজীব্য।
গত গ্রীষ্মের ছুটির কথা। আমি আর মা গ্রামের বাড়িতে দিন কাটাচ্ছিলাম। নিরিবিলি গ্রাম, চারদিকে গাছপালা; সব মিলিয়ে বেশ কাটছিল। তবে সমবয়সি খেলার সাথি না থাকায় মাঝে মাঝে একটু একঘেয়ে লাগত।
এমন সময় হঠাৎ একদিন আমার প্রাণের বন্ধু মিশকা এসে হাজির। ওকে দেখে আমার সে কী আনন্দ! মা-ও খুব খুশি হলেন। মিশকা থাকা মানেই সারাদিন হইহুল্লোড় আর নতুন কোনো অ্যাডভেঞ্চার।
মা জানালেন, পরদিন ভোরেই তাকে জরুরি কাজে শহরে যেতে হবে। ফিরতে ফিরতে পরের দিন রাত হতে পারে। মা একটু চিন্তিত মুখে আমাদের দুজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোরা কি একা থাকতে পারবি? নাকি আমি কাজটা পিছিয়ে দেব?” আমরা দুজন একযোগে প্রতিবাদ জানালাম। আমি বললাম, “আরে মা, আমরা কি এখনো দুধের শিশু নাকি? তুমি একদম চিন্তা কোরো না, আমরা সব সামলে নেব।”
মা হাসলেন। তারপর বললেন, “আচ্ছা, থাকার ধকল তো সামলাবি, কিন্তু পেটের খিদে সামলাবি কী করে? তোরা কি জাউ ভাত বা পোরেজ রাঁধতে পারিস?” মিশকা বুক ফুলিয়ে দস্তুরমতো বিশেষজ্ঞের ভঙ্গিতে বলল, “আন্টি, এ আর এমন কী কঠিন কাজ! আপনি শুধু ওটমিল আর জলের মাপটা বলে দিন, বাকিটা আমি দেখে নেব। ওসব রান্না-টান্না আমার বাঁ হাতের খেল।”
আমি আড়ালে মিশকাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে, তুই সত্যি জানিস তো? আগে কখনো রেঁধেছিস?” মিশকা অভয় দিয়ে বলল, “আরে ধুর! মাকে কতবার করতে দেখেছি। তুই শুধু দেখিস, এমন স্বাদের রান্না করব যে তুই আঙুল চাটতে বাধ্য হবি।”
পরদিন খুব ভোরে মা বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে আমাদের জন্য প্রচুর পাউরুটি আর জ্যাম রেখে গেলেন চা দিয়ে খাওয়ার জন্য। আর দেখিয়ে দিলেন ওটমিলের প্যাকেটটা কোথায় আছে। মা রান্নার নিয়মটাও বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, কিন্তু মিশকার আত্মবিশ্বাস দেখে আমি আর মনোযোগ দিলাম না। ভাবলাম, রাঁধুনি তো তৈরিই আছে, আমার আর মাথা ঘামিয়ে কী লাভ!
মা বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই আমাদের মাথায় মাছ ধরার ভূত চাপল। পাশের নদীতে মাছ ধরার জন্য আমরা ছিপ আর কেঁচো নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। যাওয়ার সময় আমি একবার খটকা জানিয়ে দিলাম, “রান্নাবান্না কখন হবে?”
মিশকা পাত্তা না দিয়ে বলল, “আরে খিদেই তো লাগেনি এখন। এখন জ্যাম-পাউরুটি আছে, ওতেই চলে যাবে। মাছ ধরে ফিরে এসে আয়েশ করে রাঁধা যাবে।”
নদীর ধারে আমাদের সময়টা দারুণ কাটছিল। সাঁতার কাটলাম, বালুর ওপর শুয়ে রোদ পোহালাম আর জ্যাম মাখানো পাউরুটি দিয়ে দুপুরের খিদেটা কোনোমতে মেটানো হলো। কিন্তু মাছ আর ধরা দেয় না! সারাদিন বসে থেকে কপালে জুটল কয়েকটা পুঁটি মাছের মতো ছোট ছোট মাছ।
সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলল, তখন আমাদের পেটের ভেতর রীতিমতো পিনপিন শুরু হয়ে গেছে। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। আমরা দৌড়ে বাড়িতে ফিরলাম। ঘরে ঢুকেই আমি বললাম, “ওরে মিশকা ওস্তাদ! এবার শুরু কর। পেটে একদম সইছে না। এমন কিছু রাঁধ যা দ্রুত তৈরি হয়ে যায়।” মিশকা বলল, “সবচেয়ে সহজ হলো ওটমিলের জাউ ভাত। ওইটাই করি।”
আমরা উনুন ধরালাম। মিশকা একটা বড় হাঁড়ি নিয়ে তাতে ওটমিল ঢালল। দেখেই মনে হলো চাল একটু বেশি হয়ে গেছে। তারপর সে একদম হাঁড়ির কানায় কানায় জল ভরে দিল। আমি একটু ভয়ে ভয়ে বললাম, “জল কি বেশি হয়ে গেল না?” মিশকা বিজ্ঞের মতো উত্তর দিল, “একদম না। মা এভাবেই রাঁধেন। তুই শুধু আগুনের দিকটা দেখ, রান্নাটা আমার ওপর ছেড়ে দে।”
বাইরে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। আমরা ঘরে ল্যাম্প জ্বালালাম। জাউ ভাত ফুটতে শুরু করেছে। আমি আগুনের পাশে বসে ঝিমোচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ কানে এল। চেয়ে দেখি, হাঁড়ির ঢাকনাটা নড়ে উঠছে আর ভেতর থেকে জাউ ভাতের সাদা ফেনা উপচে উনুনের ওপর পড়ছে। আমি চিৎকার করে উঠলাম, “মিশকা! দেখ, তোর খাবার তো হাঁড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে!”
মিশকা অপ্রস্তুত হয়ে একটা চামচ দিয়ে সেই বাড়তি ভাতগুলোকে হাঁড়ির ভেতরে ঠেলার চেষ্টা করল। কিন্তু বিধিবাম! ওগুলো যেন জাদুর মতো ফুলে ফেঁপে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। সে যত ভেতরে ঠেলে, হাঁড়ি থেকে আরও বেশি করে ওটমিল বেরিয়ে আসে। মিশকা একটু চেখে দেখল। তারপর মুখ বিকৃত করে বলল, “আরে, এটা তো এখনো পাথরের মতো শক্ত! এত জল গেল কোথায়?” আমি বললাম, “হাঁড়িটা কি ফুটো?”
আমরা হাঁড়ি পরীক্ষা করলাম, কিন্তু ফুটো নেই। মিশকা গম্ভীর হয়ে বলল, “জল বোধহয় বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে। আরও জল দিতে হবে।” সে কিছু আধাসিদ্ধ ওটমিল একটা বাটিতে তুলে রেখে আবার জল ঢালল। কিন্তু খানিক বাদেই আবার সেই একই দৃশ্য! জাউ ভাত আবার উথলে পড়া শুরু হলো। এবার মিশকা রেগে গিয়ে বলল, “সব দোষ তোর! তুই-ই তো বললি বেশি করে চাল দিতে, আমি এখন কী করব?”
আমি বললাম, “আমি কী জানি! তুই তো বলেছিলি তুই রান্না জানিস!” ঝগড়া করতে করতে টেবিলটা আধাসিদ্ধ ওটমিলের বাটিতে ভরে গেল। শেষে দেখা গেল হাঁড়ির জল একদম শেষ। আমরা জল আনতে বালতি নিয়ে কুয়োর কাছে গেলাম। কিন্তু রাতের অন্ধকারে আর ক্লান্তিতে মিশকা করল কী, দড়ি আর বালতি দুটোই কুয়োর ভেতর ফেলে দিল!
আমরা দমে গেলাম। এখন জল ছাড়া রান্না হবে কী করে? আমরা এক টুকরো মাছ ধরার সুতো আর একটা কেটলি নিয়ে অনেক কষ্টে কুয়ো থেকে জল তোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু সুতো ছিঁড়ে কেটলিও গেল জলের তলায়। শেষে একটা ছোট মগ দিয়ে কোনোমতে কয়েক চুমুক জল তুলে আমরা তৃষ্ণা মেটালাম। মিশকা তখন তত্ত্বকথা শোনাল, “খুব তেষ্টা পেলে মনে হয় পুরো নদী খেয়ে ফেলব, অথচ খাওয়ার সময় এক মগেই পেট ভরে যায়! মানুষ আসলেই বড্ড লোভী।”
রাত তখন প্রায় বারোটা। কোনোমতে জল জোগাড় করে আমরা আবার রান্না বসালাম। এবার আর ওটমিল উপচে পড়ল না ঠিকই, কিন্তু যা তৈরি হলো তা মুখে দেওয়া দায়! নুন দিতে ভুলে গিয়েছিলাম, আর জাউ ভাতটা একদম তলায় লেগে পোড়া গন্ধ হয়ে গেছে। মিশকা এক চামচ মুখে দিয়েই থু থু করে ফেলে দিল। সে বলল, “ক্ষুধায় মরে যাব তবু এই বিষ খাব না।”
তখন আমাদের সেই মাছগুলোর কথা মনে পড়ল। মিশকা বলল, “আরে, মাছগুলো ভেজে ফেললেই তো হয়!” কিন্তু তেল ছাড়া মাছ ভাজতে গিয়ে কড়াইতে লেগে সব ছাই হয়ে গেল। তারপর হঠাৎ অনেকটা তেল ঢালতেই কড়াইতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। ঘরের ভেতর কালো ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেল। মাছগুলো সব কয়লা হয়ে গেল।
অবশেষে আমরা কাঁচা ওটমিল চিবানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু তা খাওয়া সম্ভব নয়। শেষে সেই জ্যামের বয়ামটা চাটতে চাটতে আমরা দুই বন্ধু খিদের জ্বালায় কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম, জানি না।
পরদিন সকালে আমাদের চোখমুখ দেখে আমাদের বাড়িওয়ালা নাতাশা আন্টি সব বুঝতে পারলেন। তিনি আমাদের অবস্থা দেখে মায়া করে ঘরে নিয়ে গিয়ে গরম গরম দুধ আর বাঁধাকপির পিঠা খেতে দিলেন। আমরা সেভাবে গোগ্রাসে খেলাম যে মাসিমার ছোট্ট ছেলে ভোভকা তো হাঁ করে তাকিয়ে থাকল।
খাওয়া শেষে আমরা আন্টিকে সাহায্য করার জন্য তার বাগানের আগাছা পরিষ্কার করে দিলাম। আর অনেক কষ্টে হুক দিয়ে কুয়ো থেকে আমাদের বালতি আর কেটলি উদ্ধার করলাম। কাজ করতে করতে মিশকা আপনমনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বাগানের আগাছা পরিষ্কার করা কত সহজ! অন্তত ভাত রাঁধার চেয়ে অনেক ভালো।” আমি শুধু মুচকি হাসলাম।