Published : 16 Jul 2025, 06:15 PM
বুধবার দিনটা ছিল অন্যরকম আনন্দের। বিশেষ করে এলেঙ্গার শিক্ষার্থীদের জন্য। এদিন যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা তার জাদুর ঝাঁপি নিয়ে হাজির হতো এলেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে, শিক্ষার্থীদের মাঝে।
বইভর্তি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি গাড়ি আসত। শিক্ষার্থীরা তখন বই নিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ত।
আমি ভাবতাম, ওই গাড়িটিতে শুধু বই থাকত না, থাকতো নতুন দিগন্তের নতুন স্বপ্নও। শিক্ষার্থীরা লাইন ধরে বই নেয়, এক সপ্তাহ ধরে তা পড়ে এবং পরের বুধবার সেটি ফেরত দিয়ে আবার নতুন বই নিত। কেউ বলতো ভূতের বই নিবো, কেউ গোয়েন্দার বই, কেউ আবার খুঁজে নিত পছন্দের লেখকদের বই। বই নেওয়ার দৃশ্য দেখে মনটা ভরে যেতো।
নানা সমস্যা কাটিয়ে দেশ এগিয়ে চলছে। বিশ্বের মাঝে আমরাও মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছি। উন্নত ও বৈষম্যহীন দেশ গড়তে প্রয়োজন বহুসংখ্যক আলোকিত মানুষ। সেই স্বপ্নবান মানুষ গড়তে অনন্য ভূমিকা রাখছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ছোটবেলায় নিজেও যুক্ত ছিলাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচিতে। ওটা ছিল একটা সোনালি সময়। সে স্মৃতিগুলো আজও আমাকে আন্দোলিত করে। নতুন কিছু লিখতে ও পড়তে প্রেরণাও জোগায়। এ কারণেই এলেঙ্গায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি থেকে শিক্ষার্থীদের বই নেওয়ার দৃশ্য স্মৃতিকাতর করে তুলত।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মাঝে বইপড়ার অসাধারণ এক অভ্যাস তৈরি করে। তারা বইপড়াকে ভালোবাসতে শুরু করে। যে শিশুটি আগে শুধুই পাঠ্যবইয়ের পড়ার বোঝা নিয়ে হতাশ থাকত, সেই-ই তখন বই পড়ে নতুন এক জগতে প্রবেশ করছিল। বইয়ের লিখনির পথ ধরে তারা কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেত। ফলে শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন গল্প শিখত, বাংলা শব্দভাণ্ডারও সমৃদ্ধ করত। কিন্তু সেই কার্যক্রম এখন থমকে আছে। শুনেছি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সেই প্রকল্পটি নাকি বন্ধ আছে। আবার তা অচিরেই চালু হওয়ার কথাও শুনছি নানা মাধ্যমে।
টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতি উপজেলার ছোট্ট একটি পৌরসভা এলেঙ্গা। এখানে প্রত্যেক বিদ্যালয়ে পৃথকভাবে ভালোমানের পাঠাগার নেই। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তাদের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির বইপড়া কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশের মতো এলেঙ্গাতেও আলোকিত মানুষ তৈরির কাজ করছিল। শিক্ষার্থীদের জন্য যা ছিল এক অনন্য সুযোগ। কিন্তু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় প্রতি বুধবার বইভর্তি ওই গাড়িটি এখন আর এলেঙ্গাতে আসছে না।
ফলে নতুন বই নিতে আসা শিক্ষার্থীদের কৌতূহলী ও উচ্ছ্বসিত চোখগুলো আর দেখা যায় না। প্রথম কয়েক সপ্তাহ শিক্ষার্থীরা জানতে চাইত, কবে আসবে বইভর্তি ওই গাড়িটা। কিন্তু এখন তারা ধরেই নিয়েছে বইয়ের ওই গাড়িটি আর আসবে না। মনখারাপের এই পরিবর্তন আমাকে ভীষণভাবে কষ্ট দেয়।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কাজ শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান দেওয়াই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের নতুন দিগন্তে নিয়ে যাওয়া। অনুভব করি, শুধু পাঠ্যবই পড়ে পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়, বরং জ্ঞানের আলোয় শিক্ষার্থীদের আলোকিত করাই প্রকৃত শিক্ষা। যা কেবল বইপড়ার মাধ্যমেই সম্ভব।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কার্যক্রমের মতো উদ্যোগগুলো কখনও বন্ধ থাকা উচিত নয়। যেসব শিশুরা আগে গল্পের বই হাতে নিয়ে বসে থাকত, তারা এখন অলস সময়গুলো নষ্ট করছে। বইপড়ার যে অভ্যাস তারা গড়ে তুলেছিল, তা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
এই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। যারা কখনো গল্পের বই পড়েনি, তারাও বইয়ের প্রতি আগ্রহী হচ্ছিল। তাদের ভাষাগত দক্ষতা, চিন্তাশক্তি এবং সৃজনশীলতাও অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু এখন তারা সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত।
বইপড়ার এমন কার্যক্রম যেন বন্ধ না থাকে এ বিষয়ে সরকারেরও উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা আবারও বই হাতে হাসুক, গল্পের জগতে ডুবে যাক, নতুন নতুন শব্দ শিখুক, নিজেদের কল্পনাশক্তিকেও সমৃদ্ধ করুক। শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে তারা তাদের মানসিক বিকাশও ঘটাক।
বইভর্তি ছোট্ট একটি গাড়ির শক্তি সত্যি অসীম। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির এ কার্যক্রম পুনরায় চালু হলে গোটা দেশের শিক্ষার্থীরা যেমন ঋদ্ধ হবে তেমনি আলোকিত হবে সমাজের মানুষ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইভর্তি ওই ছোট্ট গাড়িটি কি আবার আসবে এলেঙ্গাতে? আমরা সেই অপেক্ষাতেই থাকলাম।