অনূদিত গল্প
Published : 12 Jan 2026, 12:22 AM
ডোরিন ক্রোনিন (জন্ম ১৯৬৬) একজন আমেরিকান শিশুতোষ লেখক। তিনি মজার ছবিবই লেখার জন্য পরিচিত। তার লেখা ‘ক্লিক, ক্ল্যাক, মুউ: কাউস দ্যাট টাইপ’ বইটি ক্যালডেকট অনার পুরস্কার পেয়েছে, এবং এর পরের ধারাবাহিক বইগুলোও জনপ্রিয় হয়েছে।
লেখক হওয়ার আগে ডোরিন একজন আইনজীবী ছিলেন। প্রথম বইয়ের সাফল্যের পর তিনি পুরোপুরি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এরপর তিনি ‘দ্য চিকেন স্কোয়াড’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজ তৈরি করেন। ‘ডায়েরি অফ অ্যা ওয়ার্ম’ বইটিতে তিনি পোকামাকড় ও খামারের প্রাণীদের নিয়ে হাস্যরসাত্মক গল্প বলেছেন।
যদিও কারও ডায়েরি পড়তে নেই। তবুও…। ছোট্ট এক কেঁচো লিখেছে ডায়েরি। ওর ডায়েরির পাতা উল্টে প্রথমেই যা চোখে পড়বে তা হলো কয়েকটি ছবি ও একটা রিপোর্ট কার্ড।
শুরুতেই স্কচটেপ দিয়ে সেঁটে দেওয়া স্কুলে পড়াশোনার অগ্রগতি, আচরণ ও সার্বিক মূল্যায়ন সম্বলিত কাগজ। তার পাশেই সেঁটে দেওয়া আছে মাকড়সার জালের একটি ছবি, যে জালটি মাকড়সা নিজের হাতে তার জন্য বুনেছিল। নিচে আরও দুটি ছবি সেঁটে দেওয়া; একটি তার স্কুলের প্রথমদিনে ক্লাস টিচার ও বন্ধুদের সঙ্গে তোলা। আর অন্য ছবিতে তাকে দেখা যাচ্ছে তার বাবার সঙ্গে।
ডায়েরির পরের পাতায় দেখা গেল আরও কিছু ছবি! ওই যে মাকড়সা, যে ওর জন্য জাল বুনেছিল; তার সঙ্গে মজার একটি ছবি তোলা ছিল তার। এরপরের ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে জীবনে প্রথম যে সুরঙ্গ খুঁড়েছিল কেঁচো তারই একটি সুন্দর ছবি। সবশেষে যে ছবিটি সেঁটে দেওয়া তাতে দেখা যাচ্ছে কম্পোস্ট দ্বীপে পারিবারিক ভ্রমণের একটি হাইফাই ছবি।
লাল টুপি পরা ছোট্ট কেঁচোর জীবনটা কিন্তু দারুণ! কী বলো তোমরা? চলো চলো, সবাই মিলে এবার ওর ডায়েরিটা পড়ে নিই।
২০ মার্চ
মা বলেছে, আমাদের সব সময় তিনটি বিষয় মনে রাখা চাই। ১. আমাদের যা কিছু প্রয়োজন তার সবকিছু মাটিতেই রয়েছে। ২. আমরা যখন মাটি খুঁড়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করি তখন মাটি শ্বাস নিতে পারে। ৩. বাবা যখন খবরের কাগজ খেতে থাকবে তখন তাকে কোনোভাবেই বিরক্ত করা যাবে না।
২৯ মার্চ
আজ আমি মাকড়সাকে শেখানোর চেষ্টা করেছি, কীভাবে মাটি খুঁড়তে হয়। কিন্তু প্রথমেই তার পাগুলো মাটিতে আটকে গেল। সে বললো, তার গোড়ালি বোধহয় মচকেই গেছে! এরপর সে তো একগাদা মাটি গিলেই ফেলল! আমি হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলাম। মাকড়সা জানালো, আগামীকাল সে আমায় শেখাবে কী করে ওপর থেকে নিচের দিকে নামতে হয়।

৩০ মার্চ
মাকড়সা তার জাল জড়িয়ে আমাকে ওপর থেকে নিচে নামানোর চেষ্টা করল। কিন্তু, কেঁচোরা আসলে ওপর থেকে নিচের দিকে নামতে পারে না।
৪ এপ্রিল
আজ থেকে মাছ ধরার মৌসুম শুরু হয়েছে। জেলেরা কেঁচো সংগ্রহ করতে মাটি খুঁড়ছে। ফলে আমাদের আরও গভীর অবধি মাটি খুঁড়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
১০ এপ্রিল
সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। মাটি একেবারে কাদা কাদা হয়ে আছে। গোটা দিন আমরা ফুটপাতের ধার ঘেঁষে ছিলাম। বাচ্চারা যেভাবে লাফঝাঁপ করছে, ভয়ই লাগছে; উফ! ওদের এই খেলা আমাদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ!
১৫ এপ্রিল
আজ আমি দুপুরের খাবার খেতে ভুলেই গিয়েছিলাম। এত ক্ষুধার্ত ছিলাম যে হোমওয়ার্ক খাতাই খেতে শুরু করলাম। এর শাস্তি হিসেবে আমার টিচার আমাকে ১০ বার লিখতে দিল ‘আমি আর কখনোই হোমওয়ার্কের খাতা খাব না।’ কিন্তু লেখা শেষ করে আমি সে কাগজটাও খেয়ে ফেললাম!
২০ এপ্রিল
পার্কে বাচ্চারা খেলছিল। আমি চুপি চুপি তাদের কাছে গিয়ে খেলা দেখতে লাগলাম। কিন্তু আমাকে দেখেই তারা চিৎকার করে পালিয়ে গেল। আমার তাতে ভালোই লাগল।
১ মে
দাদুভাই আমাদের শেখালেন, ভদ্রতা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সকালে প্রথম যে পিঁপড়াটির সঙ্গে আমার দেখা হলো, আমি তাকে ‘শুভ সকাল’ বলে স্বাগত জানালাম। তবে সেখানে সারিবদ্ধভাবে হেঁটে যাওয়া আরও ৬০০ পিঁপড়া ছিল। আমি বলতে লাগলাম এবং বলতেই লাগলাম, “শুভ সকাল, শুভ সকাল, শুভ সকাল। কেমন আছে সবাই? তোমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল! শুভ সকাল…।” সেখানে আমি সারাদিনই দাঁড়িয়ে রইলাম।
৮ মে
গত রাতটা একেবারে দুঃস্বপ্নের মতো গেছে! আমি যাচ্ছিলাম আর আমার পাশ দিয়ে বড় একটা পাখি থাপাস থপাস পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছিল! মাকে জানাতেই সে বলল, ঘুমাতে যাওয়ার আগে এত বেশি ময়লা আবর্জনা খাওয়ার অভ্যাস আমাকে বন্ধ করতে হবে!
১৫ মে
আজ আমার মাকড়সার সঙ্গে ছোট্টখাটো ঝগড়া হলো। সে আমাকে বলল, “চতুর হতে হলে আমার কয়েকটা পা থাকতে হতো।” একথা বলে সে হুড়হুড় করে এগিয়ে গেল। আমি আর তাকে ধরতে পারলাম না। হয়ত সে ঠিকই বলেছে।
১৬ মে
আমি মাকড়সাকে এমন হাসালাম। হাসতে হাসতে সে গাছ থেকে উল্টে পড়েই গেল। আমার পা না থাকলেও কিন্তু ক্ষতি নেই!
২৮ মে
গত রাতে আমি স্কুলের নাচের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলাম। মাথা এদিক-ওদিক নেড়ে, শরীর বাঁকিয়ে কীই না আমরা করতে পারি বলো!

৫ জুন
আজ আমরা আর্ট ক্লাসে ম্যাকারনি নেকলেস বানানো শিখেছি। আমারটা আমি বাড়ি নিয়ে এসেছি। রাতে আমরা ওটা দিয়েই ডিনার সেরেছি! বাবা বলেছে, আমার অনেক বুদ্ধি!
১৫ জুন
আমার বড় বোন ভাবে, সে খুবই সুন্দরী। কিন্তু আমি তাকে বলেছি, “সারাদিনে তুমি যত সময়ই আয়না দেখে নষ্ট করো না কেন, তোমার মুখ দেখতে একেবারে তোমার লেজের মতোই!” একথা শুনে মাকড়সা মজা পেলেও আমার মা একেবারেই খুশি হননি।
৪ জুলাই
আমি বড় হয়ে গোয়েন্দা হতে চাই। কিন্তু মাকড়সা বলেছে, আমাকে খুবই সাবধানে থাকতে হবে। এটা খুবই বিপজ্জনক কাজ। কিন্তু আমার মতে, কেউ না কেউ তো কাজটা করবেই তাইনা!
২৮ জুলাই
কেঁচো হয়ে জন্মে আমি তিনটি বিষয়ে খুব হতাশ। ১. চুইংগাম চিবাতে পারি না। ২. কুকুর পুষতে পারি না। ৩. আর এত্ত এত্ত হোমওয়ার্ক করতে হয়, বলার মতো না!
২৯ জুলাই
কেঁচো হওয়ার কিছু সুবিধাও রয়েছে। ১. আমাদের কখনোই দাঁতের ডাক্তার দেখাতে হবে না। ২. বাড়িতে ঢোকার সময় পায়ে মাটি বয়ে আনলেও বকুনি খেতে হবে না। ৩. কোনোদিনও গোসল করতে হবে না।
১ অগাস্ট
কেঁচো হয়ে বেঁচে থাকা সবসময় সহজ নয়। আমরা খুবই ছোট। মাঝে মাঝে মানুষ আমাদের উপস্থিতি ভুলেই যায়। তবে মা সবসময় বলে, “মাটি কখনও আমাদের কথা ভোলে না।”
ছোট্ট কেঁচোর ডায়েরির এটিই শেষ পাতা। ওহ্ না, শেষের দুটো পাতাতে সে আরও কিছু ছবি সেঁটে দিয়েছে। কী হতে পারে সেই ছবি? তোমরা কি কল্পনা করে বলতে পারো!