Published : 12 Feb 2026, 05:26 PM
রাজনীতির মাঠে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দবন্ধ হলো ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি’। ঐতিহাসিকভাবে শব্দটির রূপক ব্যবহার উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ অর্থে ‘ল্যান্ডস্লাইড’ প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলেও গণতান্ত্রিক বিশ্বে এর অর্থ ভিন্ন।
যখন কোনো নির্বাচনে একজন প্রার্থী বা দল তার প্রতিপক্ষকে ‘বিপুল ভোটের’ ব্যবধানে পরাজিত করেন, তখনই সেটিকে ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন অনেকে। কিন্তু এই প্রাকৃতিক শব্দটি কীভাবে রাজনীতির ব্যাকরণে ঢুকে পড়ল? এর গাণিতিক পরিমাপই বা কী?
প্রকৃতি থেকে রাজনীতির ময়দানে: ব্যুৎপত্তি ও ইতিহাস
‘ল্যান্ডস্লাইড’ শব্দটির আক্ষরিক উৎস ভৌগোলিক। পাহাড়ের মাটি বা পাথরের স্তূপ যখন হঠাৎ ভেঙে নিচে নেমে আসে, তাকেই আমরা ল্যান্ডস্লাইড বলি। এই প্রাকৃতিক ঘটনার মতোই যখন বিপুল পরিমাণ জনমত কোনো এক দিকে ধাবিত হয়ে বাকি সব পক্ষকে প্রবল ব্যবধানে পরাজিত করে, তখন তাকে রূপক অর্থে ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি’ বলা শুরু হয়।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রয়াত রাজনৈতিক কলামনিস্ট উইলিয়াম সাফায়ারের ‘পলিটিক্যাল ডিকশনারি’ অনুযায়ী, ১৮৪০-এর দশকের দিকে মার্কিন রাজনীতিতে এই রূপক শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। মূলত ১৮৪০ সালে রাষ্ট্রপতি পদে উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসনের বিশাল জয়কে বর্ণনা করতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো এই উপমাটি ব্যবহার করতে থাকে।
তারপর ১৮৭২ সালে ইউলিসিস এস. গ্রান্ট যখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন, তখন ‘ল্যান্ডস্লাইড’ শব্দটি স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক পরিভাষায় জায়গা করে নেয়। এর মূল ভাবার্থ হলো- এমন এক ‘নিরঙ্কুশ বিজয়’ যেখানে প্রতিপক্ষ আক্ষরিক অর্থেই জনমতের তলে ‘সমাধিস্থ’ হয়।
‘ল্যান্ডস্লাইড’ বিজয়ের গাণিতিক সংজ্ঞা: কত ভোট হলে ল্যান্ডস্লাইড?
মজার ব্যাপার হলো, কোনো সংবিধানে বা আইনে ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি’-এর কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে কিছু গাণিতিক ঐকমত্য রয়েছে:
১. জনপ্রিয় ভোটের শতাংশ: ঐতিহাসিকভাবে, অনেক সংবাদমাধ্যম ১৫ শতাংশ বা তার বেশি ব্যবধানে জয়কে ‘ল্যান্ডস্লাইড’ বলে গণ্য করে। যেমন- যদি কোনো দ্বিমুখী লড়াইয়ে একজন প্রার্থী ৫৮ শতাংশ এবং অন্যজন ৪২ শতাংশ ভোট পান, তবে সেটি ‘ল্যান্ডস্লাইড’।
তবে রাজনৈতিক সংবাদ সংস্থা ‘পলিটিকো’ এই ব্যবধানকে অন্তত ১০ শতাংশের কথা বলে। তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নয়, সাংবাদিকতাসুলভ ব্যবহার। আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেরাল্ড এন. হিল এবং ক্যাথলিন থম্পসন হিলের মতে, “যদি কোনো প্রার্থী মোট পপুলার ভোটের ৬০ শতাংশ পান, তবেই সেটি প্রকৃত ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি।”
২. ইলেক্টোরাল কলেজের হিসাব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে, যেখানে মোট ৫৩৮টি ইলেক্টোরাল ভোট রয়েছে, সেখানে অন্তত ৩৭৫টি বা ৭০ শতাংশ ভোট পেলে সেটিকে ‘ইলেক্টোরাল কলেজ ল্যান্ডস্লাইড’ বলা হয়। তবে এটিও কোনো সাংবিধানিক মানদণ্ড নয়, বিশ্লেষকদের ব্যবহার।
৩. জেলাভিত্তিক ব্যবধান: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্লগার নেট সিলভারের মতে, “কোনো জেলার ফলাফল যদি জাতীয় গড় ফলাফলের চেয়ে অন্তত ২০ শতাংশ বেশি ব্যবধান তৈরি করে, তবে সেটিকে ল্যান্ডস্লাইড ডিস্ট্রিক্ট বলা যেতে পারে।”
ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় ল্যান্ডস্লাইড
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে কিছু বিজয় ছিল অবিশ্বাস্য। ১৯৩৬ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট যখন ৫৩১টি ইলেক্টোরাল ভোটের মধ্যে ৫২৩টি পেয়েছিলেন এবং তার প্রতিপক্ষ আলফ ল্যান্ডন পেয়েছিলেন মাত্র ৮টি। তখন সেটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ল্যান্ডস্লাইড।
আবার ১৯৮৪ সালে রোনাল্ড রিগ্যান ৫২৫টি ইলেক্টোরাল ভোট পেয়ে (জনপ্রিয় ভোটের ৫৯ শতাংশ) প্রতিপক্ষ ওয়াল্টার মন্ডেলকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন। মন্ডেল পেয়েছিলেন মাত্র ১৩টি ইলেক্টোরাল ভোট।
সাম্প্রতিক সময়ের বিভ্রান্তি: ওবামা, ট্রাম্প ও বাইডেন
আধুনিক যুগে ‘ল্যান্ডস্লাইড’ শব্দটির ব্যবহার কিছুটা ঢিলেঢালাভাবে হলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০০৮ বা ২০১২ সালে বারাক ওবামার বিজয়, ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় কিংবা ২০২০ সালে জো বাইডেনের বিজয় আসলে ‘ল্যান্ডস্লাইড’ সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না। ট্রাম্প ২০১৬ সালে ইলেক্টোরাল ভোটে জিতলেও হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে প্রায় ৩০ লাখ ভোট কম পেয়েছিলেন।
অন্যদিকে জো বাইডেন ৩০৬টি ইলেক্টোরাল ভোট এবং ৭০ লাখ বেশি জনপ্রিয় ভোট পেলেও তা গাণিতিকভাবে ল্যান্ডস্লাইডের ওই ‘৭০ শতাংশ ইলেক্টোরাল’ বা ‘১৫ শতাংশ পপুলার ভোট’ ব্যবধানের মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।
বাংলাদেশে ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি’ ও প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে এই শব্দটির ব্যবহার এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস হয়ে আছে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই জয়লাভ করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তখন এই নজিরবিহীন জয়কে ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি’ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে।
এছাড়া ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের ২৩০ আসনে জয়লাভ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি’ হিসেবে সমাদৃত।
আসলে ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি’ কেবল সংখ্যার জয় নয়, এটি একটি জোরালো জনসমর্থনের বহিঃপ্রকাশ। মার্কিন সাংবাদিক, লেখক ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ লেখক উইলিয়াম সাফায়ারের ভাষায়, “এমন নির্বাচনে জয়ী প্রার্থী মূলত প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে ‘কবর’ দেন।”
তবে ইতিহাস বলে, বড় ম্যান্ডেট মানেই বড় দায়িত্ব। জনগণের এই বিপুল জোয়ার যেমন আকাশচুম্বী সাফল্যের রাস্তা তৈরি করে, তেমনি প্রত্যাশার চাপ সামলানোও হয়ে ওঠে এক বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: থটকো ডটকম, তথ্য ও শিক্ষাভিত্তিক আমেরিকান ওয়েব পোর্টাল।