ভ্রমণগদ্য
Published : 23 Oct 2025, 05:12 PM
চারদিকে দিগন্তজুড়ে ধানক্ষেত। ডানে-বামে-সামনে-পেছনে একই ধরনের একই আকারের। মৃদু বাতাসে হালকা দোল খাচ্ছে সবুজ ধানের শিষ। কোথাও কোথাও ধানের ফুল বেরিয়েছে। জমিগুলো ছোট নয়, একেকটা মনে হয় কয়েক একর আয়তনের। চারপাশে আইল নেই, বরং আছে ইটের সুড়কি দেওয়া সড়ক।
এই সড়কে ঘুরে ধানক্ষেত দেখার জন্য পর্যটন-রিকশা ভাড়া নেওয়া যায়। নিজে প্যাডেল চালিয়ে ছোট বড় সবাইকে নিয়ে গ্রাম্য আবহাওয়া উপভোগ করে মালয়েশিয়ান পরিবারগুলো। এরকম জমিগুলোকে ঘিরে আছে পিচঢালা সড়ক। সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বিশাল ধানক্ষেতের পুরোটা ঘুরে দেখা যায়। জমির একদিক থেকে অন্যদিকে, একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো যায়।
কিছু দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে বাংলোর মতো পাকা ঘর। ঘরগুলোতে সম্ভবত কৃষিকাজে নিয়োজিত মানুষেরা থাকেন আর ধান মাড়াই ও ধান রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার হয়। সময় স্বল্পতার কারণে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া সম্ভব হয়নি আমাদের। তবে ধারণা করে যা বললাম, সেটাই সঠিক হবে।
ধানক্ষেত ঘেঁষে আছে উন্নতমানের রেস্তোরাঁ। আশপাশে মূল সড়কের পাশে অনেক খাবারের দোকান। রেস্তোরাঁগুলোয় সি-ফুড খাওয়ার জন্য দূর দূরান্তের মানুষেরা আসে। ধানক্ষেত ঘেঁষে আছে ফটোসেশন করার মতো নানা স্থাপনা। ধানক্ষেতকেও পর্যটন স্পটে রূপান্তর করা যায়, এটা এই প্রথম দেখলাম সেকিনচানে এসে।
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের চারপাশে ঘিরে আছে সেলাঙ্গর প্রদেশ। এই সেলাঙ্গরের শেষ প্রান্তের এক জায়গার নাম সেকিনচান। জায়গার নামটা শুনতে চমৎকার। আমাদের দেশে চীনা ভাষার শব্দ একেবারে না-জানা মানুষেরা যেভাবে মশকরা করে চীনা ভাষা উচ্চারণ করে, ঠিক সে রকম একটা শব্দ যেন ‘সেকিনচান’। অথবা বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকা শাবনুরের ধনী পিতা ভিলেন রাজিবের সঙ্গে চীন দেশ থেকে আসা ব্যবসায়ী সেজে কাবিলা যেভাবে চীনা ভাষা বলেন, ঠিক সেরকম, ‘সেকিনচান’।

‘সেকিনচান’ নামটি শুনতে আমাদের কাছে চীনা ভাষার মতো মনে হলেও, এর নিজস্ব ব্যুৎপত্তি রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে স্থানীয় ইতিহাস ও লোককথা। মালয় ভাষায় ‘সেকিন’ অর্থ একটি এবং ‘চান’ অর্থ ক্ষেত্র বা ব্যাপক। ধারণা করা হয়, এই নামটি এলাকার বিস্তৃত কৃষিক্ষেতের ইঙ্গিত দেয়, যা এই অঞ্চলের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
তবে স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, এই নামের পেছনে আরও কিছু গল্প প্রচলিত আছে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি একজন আদিবাসী নেতার নাম থেকে এসেছে, যিনি এই অঞ্চলের প্রথম বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন। আবার কেউ বলেন, এটি প্রাচীন চীনা ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত শব্দ থেকে উদ্ভূত, যারা এই অঞ্চলে বাণিজ্য করতে আসতেন এবং ধানের প্রাচুর্যে মুগ্ধ হয়ে এমন একটি নাম দিয়েছিলেন।
শনিবার বিকেলে মাকে নিয়ে আমরা বেড়াতে গিয়েছিলাম সেকিনচান। কুয়ালালামপুর থেকে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে যাওয়ার সময় কুয়ালালামপুরের পর ঘণ্টাখানেক গাড়ি চালালেই সেলাঙ্গর প্রদেশও পার হওয়া যায়। কিন্তু সেকিনচানে যাওয়ার সময় বুঝলাম সেলাঙ্গর প্রদেশের এই পাশটা অনেক বড়। কুয়ালালামপুর থেকে আমরা সেকিনচানে যাচ্ছিলাম মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘শনিবার বিকেল’-এ। মালয়েশিয়ায় চলছিলো দীপাবলির ছুটির সময়। তাই হয়ত হাইওয়েতে গাড়ির জ্যাম ছিল।
‘হয়ত’ বলছি এই কারণে, যাওয়ার পথে আমাদের ঘটে এক ঘটনা, যা আমাদের জন্য অভূতপূর্ব না হলেও কিছুটা ব্যতিক্রম বটে। ছোটভাই নাছির গাড়ি ড্রাইভ করছিল, আমি সামনে বসা। পেছনে মা, নাছিরের স্ত্রী, আট বছরের সুইট কিড আলি ও দুই বছরের পুতুল আলিয়া।
মালয়েশিয়ায় গত এক দশক থেকে মানুষ গাড়ি চালায় ‘ওয়াইজ’ অ্যাপ ব্যবহার করে বা গুগল ম্যাপের মাধ্যমে। ‘ওয়াইজ’ যে দিকে পথ দেখায় চালক গাড়ির স্টিয়ারিং সেদিকে ঘুরায়। মাঝেমাঝে নানা কারণে ‘ওয়াইজ’ এমন পথ দিয়ে নিয়ে চলে যে পথে ঢুকলে ভয় লাগে এমন। এমনই এক পথ দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেলো সেদিন এই ‘ওয়াইজ’, যেন পথ হারিয়ে বনের পথে পথে দিশেহারা হয়ে ঘুরছি আমরা।

দুপাশে ঘন বন, সরু রাস্তা। খুবই ঘনঘন বাঁক, প্রতি মিনিটে ২-৩টা বাঁক, গাড়ি চালাতে হচ্ছে ধীরে। পথে তেমন গাড়ি নেই। মাঝে মাঝে দুয়েকটা দেখা যাচ্ছে। পথের ধারে ধারে পাহাড়ি বাদর বসে থাকে মানুষের মতো করে। তবে কোনো মানুষজনের দেখা নেই। দোকানপাট নেই। এভাবে পথ চলতে হয়েছে ১২-১৩ কিলোমিটার। এক সময় এই আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে গাড়ি চলে আসে গ্রামের মতো জায়গায়। এখানে এসে মানুষ, বাড়িঘর ও দোকানপাটের দেখা মিলেছে।
তারপর গাড়ি নিয়ে গেলো একবারে সরু গ্রাম্যপথ দিয়ে কয়েক কিলোমিটার। পরেই গাড়ি তুলে দিল হাইওয়েতে। পাশে রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট দেখতে পেয়ে থামলাম আমরা। রেস্তোরাঁয় বসে চা-নাশতা খেলাম, একটু আরাম করলাম। পাহাড়ি দুর্গম পথ পাড়িয়ে দিয়ে আসায় (যদিও গাড়ি করে আসা) মনের ভেতর যে ক্লান্তি ও কালো মেঘ জমেছিল তা কাটার পর আমরা আবারও রওনা দিলাম সেকিনচানের দিকে ওয়াইজের দেখোনো পথ হাইওয়ে ধরে।
পরবর্তী ৩৫ মিনিটের মধ্যে আমরা প্রথমে পৌঁছে যাই ‘পানতাই রেডাং সেকিনচান’। ‘পানতাই’ মানে হচ্ছে সৈকত। সেকিনচানে শুধু ধানক্ষেত নয়, আছে সমুদ্র সৈকতও। পানতাই রেডাং বিচের বাইরে দোকানপাটগুলো দেখে মনে মনে ভাবছিলাম, এটা তো দেখতে আমাদের পতেঙ্গার মতোই। সঙ্গে সঙ্গে ছোটভাই নাছিরও বলে উঠলো, এখানে অনেকটা পতেঙ্গার মতো। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত কিন্তু এখন অবশ্যই আগের মতো নেই, উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। দোকানপাটগুলো রেডাং বিচের মতো ছিল নব্বইয়ের দশকের দিকে। রেডাং বিচে তেমন বেশি পর্যটক নেই।
সেকিনচান কেবল ধানের ক্ষেত ও মৎস্যজীবীদের গ্রাম নয়, এটি আরও অনেক কিছু আছে যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ‘আহ চি চারা ধানের কল’-এ গিয়ে ধানের প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়া দেখতে পারেন তারা। এখানে ধান থেকে চাল তৈরি, প্যাকেজিং এবং বাজারজাতকরণের পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি দেখা যায়। এছাড়া, এখানে সেকিনচানের বিশেষ চাল এবং চাল থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্য কেনা যায়, যা পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় স্যুভেনিয়র।
কাকাও বাগানে গিয়ে পর্যটকরা কাকাও গাছ দেখতে এবং কাকাও তুলা থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্য কিনতে পারেন। কাকাও তুলার বালিশ, তোশক ইত্যাদি আরামদায়ক এবং স্বাস্থ্যসম্মত বলে পরিচিত। সেকিনচানের আশপাশের এলাকায় আনারসের বাগানও রয়েছে, যেখানে পর্যটকরা তাজা আনারসের স্বাদ নিতে পারেন এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আনারসের পণ্য কিনতে পারেন।
সম্প্রতি সেকিনচানে ড্রাগন ফ্রুট চাষও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখানকার খামারগুলোতে পর্যটকরা ড্রাগন ফ্রুট চাষ পদ্ধতি দেখতে এবং তাজা ড্রাগন ফ্রুট ও এর থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্য কিনতে পারেন। সেকিনচানের স্থানীয় বাজারগুলিতে তাজা ফলমূল, শাকসবজি এবং স্থানীয় হস্তশিল্পের জিনিস পাওয়া যায়, যা স্থানীয় জীবনধারা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়।

সেকিনচানে ও সেকিনচানের আগের গ্রামগুলোতে প্রচুর নারিকেল গাছ আছে। গাছে গাছে ডাব ও নারিকেলে ভরা। ভাবছিলাম এখানে হয়ত ডাবের দাম একটু কম হবে। কিন্তু, না, বরং কুয়ালালামপুরের ৫ রিঙ্গিতের ডাব এখানে ৬ রিঙ্গিত।
সমুদ্রের তীর ঘেঁষে সেকিনচান গ্রামটির মাঝ বরাবর চলে গেছে বড় রাস্তা। সড়কের বাম পাশে সৈকতের তীরে গড়ে উঠেছে জেলে পাড়া। সেকিনচান পৌঁছানোর পর থেকে এই পাশ থেকে নাকে আাসে মাছের তীব্র গন্ধ। এখানে আছে মাছের অসংখ্য আড়ত। মাছের গন্ধ পেয়ে মনে হচ্ছিল আমরা চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটে আছি। চারদিকে মাছের গন্ধ।
রাস্তার অন্যপাশে ধানক্ষেত। একটা সত্যিকারের গ্রাম যেন সেকিনচান। পরে গুগল করে দেখলাম, এই সেকিনচান এখনো মালয়েশিয়ার অন্যতম ধান উৎপাদনের স্থান। এখানকার জমি ধান উৎপাদনে মালয়েশিয়ার অন্যান্য জায়গার চেয়ে বেশি উর্বর।
সেকিনচানে যাওয়ার সময় বনজঙ্গলের মাঝ দিয়ে ছোট সড়ক ধরে আসতে হওয়ায় আমরা ভেবেছিলাম ফেরার সময়ও হয়ত একই রাস্তায় ফিরতে হবে। এজন্য সন্ধ্যার পর পর আমরা দ্রুত ফেরার পথ ধরেছি। তাই আরো সময় নিয়ে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের এই ধানক্ষেত আর মৎস্যজীবীদের গ্রামখানি প্রাণজুড়িয়ে দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়ে।
ফেরার সময় ওয়াইজ আমাদের এনেছে সরাসরি হাইওয়ে ধরে। আর কোনো বনজঙ্গলের ভেতর দিয়ে আসতে হয়নি। বড় রাস্তায় সাঁইসাঁই করে গাড়ি চালিয়ে কথা বলতে বলতে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের মধ্যে আমরা ফিরে এলাম প্রবাসের ব্যালকনিতে। যাওয়ার সময় লেগেছিল আড়াই ঘণ্টা।
পর্যটন শিল্পের আদলে গড়া ধানক্ষেত, জেলেপল্লী, মৎস্য আড়ত, সৈকত, গ্রামে শহুরে ছোঁয়া সবকিছু মিলে সেকিনচানকে মনভরে দেখার জন্য, জানার জন্য আরেকদিন যেতেই হবে। সেকিনচানকে জানলে মালয়েশিয়ার মাটিগন্ধা সংস্কৃতির নির্যাস কিছুটা হলেও হৃদয়ঙ্গম হবে।