ভ্রমণগদ্য
Published : 14 Jan 2026, 01:45 AM
কৃষ্ণসাগরের সেই গাঢ় নীলাভ কালচে জলরাশি আর তার তীরে গড়ে ওঠা জনপদগুলোর মায়া যেন কোনো এক অলৌকিক জাদু। আমার কাছে কৃষ্ণসাগরের প্রতিটি অঞ্চলই অসম্ভব রহস্যময় আর আকর্ষণে ভরপুর। এই সৌন্দর্যের আদিম টানেই ২০১৯ সালে তুরস্কের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ট্রাবজোনে প্রথমবার পা রেখেছিলাম।
সেই যাত্রায় সামসুন থেকে শুরু করে অরদু, গিরেসুন ও রিজে পর্যন্ত পুরোটা পথ ছিল বিধাতার নিপুণ হাতে আঁকা এক মহাকাব্যিক ক্যানভাস। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা মেঘের আনাগোনা আর সফেন জলরাশির সেই উত্তাল রূপ আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করেছিল যে, তখন থেকেই আমি কৃষ্ণসাগরের প্রেমে চিরস্থায়ীভাবে মজে আছি।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি”। সেই গানের মর্মার্থ আর প্রকৃতির রূপের বাস্তবিক রূপান্তর আমি প্রথম চাক্ষুষ করেছিলাম কৃষ্ণসাগরের ঢেউয়ের আছড়ে পড়া দেখে। পাহাড় আর সাগরের এমন মিতালি পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। ট্রাবজোনের সেই মধুর স্মৃতিকে উপজীব্য করেই ২০২১ সালে আমি পা বাড়াই কৃষ্ণসাগরের আরেক প্রান্ত, জর্জিয়ার স্বপ্নপুরী বাটুমির দিকে।

ইউরোপ আর এশিয়ার এক অদ্ভুত সঙ্গমস্থলে দাঁড়িয়ে আছে ২৬ হাজার ৯১১ বর্গমাইল আয়তনের ছোট কিন্তু অসম্ভব বৈচিত্র্যময় দেশ জর্জিয়া। ককেশাস অঞ্চলের এই দেশটি দীর্ঘকাল সোভিয়েত ইউনিয়নের লৌহমানবের ছত্রছায়ায় ছিল। অবশেষে ১৯৯১ সালে ইউএসএসআরের পতন ঘটলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমানচিত্রে জর্জিয়া আত্মপ্রকাশ করে। নবীন রাষ্ট্র হিসেবে এর বয়স খুব বেশি না হলেও, এই ভূখণ্ডের জনবসতি আর সংস্কৃতির ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন।
গ্রিক পুরাণ অনুসারে, এই জর্জিয়াই ছিল সেই রহস্যময় ‘কোলচিস’ রাজ্য, যেখানে বীর জেসন এবং তার আর্গোনাটরা সেই বিখ্যাত ‘গোল্ডেন ফ্লিস’ বা স্বর্ণালি ভেড়ার চামড়ার সন্ধানে এসেছিলেন। বাটুমি হলো জর্জিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী এবং দেশটির অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। মূলত দেশটির একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর এই বাটুমিতেই অবস্থিত, যা একে এক অনন্য কৌশলগত ও পর্যটন গুরুত্ব দান করেছে।
ভ্রমণপিপাসুদের জন্য জর্জিয়ার একটি সুবিধা হলো এর উদার ভিসা নীতি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত যেকোনো দেশের বৈধ ভিসা কিংবা রেসিডেন্ট পারমিট থাকলে জর্জিয়া ভ্রমণের জন্য আলাদা কোনো ভিসার ঝক্কি পোহাতে হয় না। অভিবাসন কর্মকর্তা কেবল প্রবেশের সময় পাসপোর্টে একটি অ্যারাইভাল সিল দিয়ে দেন।

তবে আমার যাত্রাপথটি ছিল কিছুটা দীর্ঘ। স্লোভেনিয়ার সঙ্গে জর্জিয়ার সরাসরি কোনো ফ্লাইট সংযোগ নেই। তাই আমাকে প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অবস্থিত শোয়েচাট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে হয়। ভিয়েনা থেকে জর্জিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর কুতাইসি পর্যন্ত ফ্লাইটের টিকেট খরচ বাবদ আমাকে ৪৯ ইউরো গুনতে হয়েছিল, যা দূরত্বের তুলনায় বেশ সাশ্রয়ী।
কুতাইসি বিমানবন্দরে যখন পা রাখলাম, চারপাশটা দেখে আমি কিছুটা সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মুহূর্তেই ২০১৮ সালের ফিনল্যান্ড ভ্রমণের স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। কুতাইসি বিমানবন্দর আয়তনে খুব একটা বিশাল না হলেও এর নির্মাণশৈলী এবং পরিচ্ছন্নতা মুগ্ধ করার মতো। সেখানে একটি বিষয় আমার নজর কাড়ে, ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে বেশিরভাগ সেবামূলক কাজে নারীদের আধিপত্য।
ককেশাস অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাদের অবয়বে তুর্কি ও রাশিয়ান সৌন্দর্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। তবে সৌন্দর্যের এই প্রতিযোগিতায় সে দেশের পুরুষেরা ঠিক সমানে সমান নন। তাদের গড়ন খুব একটা সুঠাম নয় এবং বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মাথায় চুলের ঘনত্ব বেশ কম, মুখমণ্ডলও অনেকটা গোলাকার।

বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখে অভিবাসন কর্মকর্তা যেন কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। সম্ভবত এই পথে বাংলাদেশি পর্যটক খুব একটা দেখা যায় না। আমাকে মূল সারি থেকে সরিয়ে পাসপোর্ট কন্ট্রোল ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে অন্য এক কর্মকর্তা এসে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। জর্জিয়া আসার মূল উদ্দেশ্য কী, কোথায় কোথায় থাকব, এসব খুঁটিনাটি জানতে চাইলেন। আমি ধীরস্থিরভাবে আমার ভ্রমণের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করলাম এবং হোটেল বুকিং ও ফিরতি ফ্লাইটের টিকেট দেখালাম।
অতিমারির পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিনের গুরুত্ব অপরিসীম। আমি মডার্নার দুই ডোজ সম্পন্ন করেছিলাম, যা আমাকে কোভিড সংক্রান্ত জটিলতা থেকে রক্ষা করেছিল। সব নথি যাচাইয়ের পর অবশেষে তিনি আমাকে প্রবেশের অনুমতি দিলেন।
আমার জর্জিয়া সফরের প্রথম রাতটি কেটেছিল কুতাইসিতে। আগে থেকেই বুকিং ডটকমের মাধ্যমে একটি হোস্টেল ঠিক করে রেখেছিলাম। ছয়দিনের এই সফরে আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল কুতাইসির প্রাচীন স্থাপত্য দেখা এবং তারপর স্বপ্নের শহর বাটুমির দিকে রওনা হওয়া। তবে জর্জিয়ার যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিল না। অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিক থেকে দেশটি এখনও বেশ পিছিয়ে।

সাধারণ মানুষ চলাচলের জন্য কোচের চেয়ে ছোট ‘মার্শরুতকা’ বা মিনিবাসের ওপর বেশি নির্ভরশীল। কুতাইসি থেকে বাটুমি যাওয়ার পথে রাস্তার অবস্থা এবং মিনিবাসের ঝাঁকুনিতে আমার হাড়গোড় যেন নড়ে উঠছিল। ইউরোপের অন্য দেশগুলোর তুলনায় জর্জিয়ার মফস্বল অঞ্চলগুলো এখনও বেশ সাধারণ এবং কিছুটা শ্রীহীন।
জর্জিয়ার উন্নয়ন পরিকল্পনা মূলত তিবিলিসি আর বাটুমি কেন্দ্রিক। কুতাইসি শহরটিকে আমার কাছে অনেকটা সোভিয়েত আমলের জরাজীর্ণ ধ্বংসস্তূপের মতো মনে হয়েছে। কিন্তু বাটুমি শহরে প্রবেশ করতেই সেই ধারণা পাল্টে গেল। বাটুমি যেন এক আধুনিক ঝলমলে নগরী। এখানে আমি ‘কেটি’ নামক এক মাঝবয়সী নারীর বাড়িতে একটি রুম ভাড়া নিয়েছিলাম। এক রাতের জন্য আমাকে ২৫ জর্জিয়ান লারি দিতে হয়েছিল। বলে রাখা ভালো, এক লারি বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ টাকার মতো।
জর্জিয়াতে আবাসন ব্যবস্থা একটু অন্যরকম। অনেক সময় মানুষ তাদের নিজেদের বাড়ির একটি অংশকে গেস্ট হাউস হিসেবে ভাড়া দেয়, যার কারণে বাইরে কোনো সাইনবোর্ড থাকে না। ফলে ট্যাক্সি ড্রাইভারদের অনেক সময় সঠিক ঠিকানা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়।

পরদিন বাটুমি ভ্রমণের মূল পর্ব শুরু হলো। কেটির সহায়তায় জর্জিও নামের এক স্থানীয় ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ২২০ লারির বিনিময়ে তিনি আমাকে সারাদিন বাটুমির পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঘুরিয়ে দেখানোর চুক্তি করলেন।
কৃষ্ণসাগরের জলরাশির দিকে তাকালেই মনটা শান্ত হয়ে যায়। হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতির কারণে এই সাগরের জলে এক অদ্ভুত কালচে আভা খেলা করে। সমুদ্রের পাড় দিয়ে হাঁটার সময় নাকে আসে সালফারের মৃদু গন্ধ। গ্রীষ্মের শুরুতে চারপাশ যখন সবুজে ছেয়ে যায়, তখন বাটুমির রূপ যেন শতগুণ বেড়ে যায়। সাগরের নোনা বাতাসের সঙ্গে প্রকৃতির এই মিলন আমাকে বারবার নদীমাতৃক বাংলাদেশের কাদা-মাটির গন্ধের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
বাটুমির রূপ কেবল সাগরেই সীমাবদ্ধ নয়। ম্যাচাখেলা ও মেটিরালা ন্যাশনাল পার্ক এবং বাটুমি বোটানিক্যাল গার্ডেন পর্যটকদের জন্য স্বর্গরাজ্য। আমি প্রথমেই গেলাম ম্যাচাখেলা ন্যাশনাল পার্কে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা ঝরনা আর নদ-নদীর কলতান সেখানে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। পার্কের প্রবেশপথে একটি বিশাল ভাস্কর্য দেখলাম, যা জর্জিয়ানদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক।

সেখানে মাখুন্টসেটি ও মিরভেটি নামক দুটি জলপ্রপাত আমার মন কেড়ে নিল। পাশেই স্খালটা নদীর ওপর ৯০০ বছরের পুরনো একটি পাথরের তৈরি ব্রিজ দাঁড়িয়ে আছে, যা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও অটুট। এই ব্রিজগুলো স্থানীয়দের কাছে ‘কুইন তামার ব্রিজ’ নামে পরিচিত, যা মধ্যযুগীয় জর্জিয়ার স্বর্ণযুগের স্থাপত্যের নিদর্শন।
জর্জিয়ার কথা বললে ওয়াইন আর মধুর কথা আসবেই। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, জর্জিয়াই হলো পৃথিবীর আদি ওয়াইন উৎপাদনকারী দেশ। প্রায় ৮ হাজার বছর আগে থেকে তারা এখানে ওয়াইন তৈরি করে আসছে। তারা ওক ব্যারেলের বদলে মাটির নিচে ‘কভেভরি’ নামক মৃৎপাত্রে ওয়াইন সংরক্ষণ করে। ম্যাচাখেলার গ্রামগুলোতে ঘুরে দেখার সময় আমি স্বচক্ষে তাদের এই ঐতিহ্যবাহী ওয়াইন শিল্প এবং মধু সংগ্রহের প্রাচীন পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারলাম।
এরপর আমাদের গন্তব্য ছিল গোনিও ফোরট্রেস। রোমান সম্রাট নিরোর শাসনামলে নির্মিত এই দুর্গটি ইতিহাসের এক বিশাল ধারক। দুর্গের ভেতরে প্রাচীন শস্যভাণ্ডার আর গোসলখানার ধ্বংসাবশেষ আজও সংরক্ষিত আছে। লোকগাঁথা আছে, যিশু খ্রিস্টের ১২ জন শিষ্যের একজন, সেন্ট ম্যাথিয়াসের সমাধি এই দুর্গের ভেতরেই অবস্থিত।

গোনিও ফোরট্রেস থেকে একটু দক্ষিণে গেলেই দেখা মেলে সারপি বর্ডার ক্রসিংয়ের। এখানেই জর্জিয়ার সীমানা শেষ এবং তুরস্কের শুরু। একপাশে জর্জিয়ার পতাকা, অন্যপাশে তুরস্কের। সাগরের কোল ঘেঁষে এই সীমান্ত এলাকাটি বেশ রোমাঞ্চকর। বর্ডারের ওপারে তুর্কি স্থাপত্যের মসজিদগুলো দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যায়।
ভ্রমণ মানেই তো কেবল দেখা নয়, স্বাদ নেওয়াও বটে। বাটুমি যেহেতু আচারা প্রদেশের রাজধানী, তাই এখানকার খাবারের নিজস্বতা রয়েছে। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার হলো ‘আচারিয়ান খাচাপুরি’। একে ‘জর্জিয়ান পিজ্জা’ বলা হয়। এর আকার অনেকটা মাকুর মতো বা ছোট নৌকার মতো। মাঝখানে থাকে পনিরের এক সমুদ্র, আর তার ওপর বসিয়ে দেওয়া হয় একটি আধসিদ্ধ ডিমের কুসুম।
গরম থাকতেই মাখন আর চিজের সঙ্গে ডিমের কুসুম মিশিয়ে যখন পাউরুটি ছিঁড়ে সেই মিশ্রণে ডুবিয়ে মুখে পুরি, তখন এক অপার্থিব স্বাদ পাওয়া যায়। এই চিজের ঘ্রাণে আমি বারবার আমাদের অষ্টগ্রামের পনিরের সেই চিরচেনা স্বাদ খুঁজে পাচ্ছিলাম।

বিকেলের দিকে আমরা গেলাম বাটুমি বোটানিক্যাল গার্ডেনে। এটি বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় বাগান। এখানে এশিয়া, আফ্রিকা থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ছয়টি মহাদেশের উদ্ভিদরাজি আলাদা সেকশনে সাজানো হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে অবস্থিত এই গার্ডেন থেকে কৃষ্ণসাগরের যে প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়, তা বর্ণনাতীত।
এরপর যখন বাটুমি বুলেভার্ডে ফিরলাম, তখন মনে হলো আমি যেন দুবাইয়ের কোনো আধুনিক শহরে চলে এসেছি। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো ‘আলি অ্যান্ড নিনো’ স্ট্যাচু। এক মুসলিম আজারবাইজানি যুবক এবং এক খ্রিস্টান জর্জিয়ান তরুণীর বিয়োগান্তক প্রেমের কাহিনি এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রতি ১০ মিনিট পরপর ভাস্কর্য দুটি একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয় এবং আবার আলাদা হয়ে যায়, যা হৃদয়ের বন্ধনের এক জীবন্ত প্রতীক।
বাটুমির সমুদ্রসৈকত পাথুরে হলেও এর আভিজাত্য কম নয়। তবে বিকেলের সেই নীল দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আমার বারবার কক্সবাজারের কথা মনে পড়ছিল। আমাদের এত দীর্ঘ প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত থাকা সত্ত্বেও আমরা সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বিদেশি পর্যটক টানতে পারছি না।

বাটুমির সফরের একদম শেষ প্রান্তে এসে আমি দেখা পেলাম ওর্টা জামে মসজিদের। ১৮৮৬ সালে নির্মিত এই মসজিদটি শহরের আধুনিক দালানকোঠার ভিড়ে তার ঐতিহ্যের মিনার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জর্জিয়া অর্থোডক্স খ্রিস্টান প্রধান দেশ হলেও এখানে মুসলিমদের সহাবস্থান প্রশংসনীয়।
জর্জিয়া সফরের দিনগুলো সব সময় খুব মসৃণ ছিল না। ভাষা আর সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণে কিছু অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব একটা বন্ধুসুলভ আচরণ লক্ষ্য করা যায় না, বরং পর্যটক দেখলে এক ধরনের ব্যবসায়িক সুযোগ সন্ধানী মনোভাব দেখা দেয়। তবে কৃষ্ণসাগরের প্রতি আমার যে টান, তা আমাকে সব গ্লানি ভুলিয়ে দেয়। এই নীল জলরাশি আর পাহাড়ের মিতালি দেখার জন্য আমি বারবার ফিরে আসতে চাই।
বাটুমি আমার কাছে কেবল একটি শহর নয়, এটি কৃষ্ণসাগরের তীরে এক চিরস্থায়ী প্রেমের কাব্য। নভোগর্ডের রাজকুমার জ্যাঙ্কো যেমন সাগরকে ভালোবেসে গান শোনাতেন, আমারও ঠিক তেমনি এই অশান্ত সাগরের বিশালতাকে আলিঙ্গন করতে ইচ্ছে করে। বাটুমি ছিল, আছে এবং থাকবে আমার হৃদয়ের এক অলৌকিক উপাখ্যান হয়ে।