অনূদিত গল্প
Published : 16 Apr 2026, 09:23 AM
কথাসাহিত্যিক আমোস তুতুওলা (১৯২০–১৯৯৭) আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৯২০ সালে নাইজেরিয়ার আবেওকুতা শহরে এক ইয়োরুবা পরিবারে জন্ম নেওয়া এই লেখক তার নিজস্ব ঘরানার গদ্যশৈলী আর জাদুকরী লোকগাথার মিশেলে বিশ্বসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছেন।
পশ্চিম আফ্রিকার মৌখিক ঐতিহ্য ও আদিম সংস্কারকে তুতুওলা আধুনিক সাহিত্যের আদলে তুলে ধরেছেন। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তার গল্প সংকলন ‘দ্য ভিলেজ উইচ ডক্টর অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ মূলত তার লোকজ গল্পের সেই ধারাকেই সমৃদ্ধ করেছে। ১৯৯৭ সালে নাইজেরিয়ার ইবাদান শহরে এই লেখক মারা যান। তবে তার সৃষ্টি আজও পাঠককে মায়াবী ও আদিম জগতের স্বাদ দিয়ে যাচ্ছে।
বহু, বহু বছর আগের কথা। তখন মানুষের চোখের দৃষ্টি ছিল অজ্ঞতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সেই সময়ে বড় এক শহরে এক যুবক বাস করত, যার নাম ছিল অজপা। তাকে সবাই ‘আলাবাহুন’ বলেও ডাকত।
যৌবনের শুরুতে অজপা ছিল বেশ হৃষ্টপুষ্ট, সুদর্শন এবং দারুণ সম্ভাবনাময় এক তরুণ। সে সবসময় হাসিখুশি আর আমুদে থাকত। অজপার বাবা-মা ছিল বেশ ধনী, আর সেই কারণে ছোটবেলা থেকেই সে ভীষণ আদরে আর প্রশ্রয়ে বড় হয়েছিল। তার মনকাড়া গুণের জন্য শহরের সবাই তাকে ভালোবাসত ও বিশ্বাস করত। রাজা তো তাকে ছাড়া একদিনও থাকতে পারতেন না; রাজপ্রাসাদে গিয়ে রাজাকে আনন্দ না দিলে রাজার দিনটাই বৃথা যেত।
কিন্তু বয়স ৩০ হতে না হতেই অজপার চরিত্রে অদ্ভুত বদল এল। হঠাৎ করেই ধূর্ত, নিষ্ঠুর, স্বার্থপর আর চরম বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠল। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সে হয়ে উঠল এই তল্লাটের সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী, শয়তান, চোর আর দেশদ্রোহী। ভালো মানুষ থেকে রাতারাতি এক মন্দ মানুষে পরিণত হওয়ায় শহরের সবাই তাকে ঘৃণা করতে শুরু করল। তার পাপাচার যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল, রাজা তখন তাকে শহর থেকে তাড়িয়ে দিলেন।
বিতাড়িত হয়ে সে ওলোমু নামের এক শহরে গিয়ে আস্তানা গড়ল। চোর তো বটেই, তাই সেখানে গিয়ে সে এক ডাকাত দলের সঙ্গে হাত মেলাল। খুব শীঘ্রই চতুর অজপা তার দলকে নিয়ে নিজের পুরনো শহর মোসানে হানা দিল। মাঝরাতে তারা অনেকের ব্যক্তিগত ধন-সম্পদ ও গবাদি পশু লুট করে নিয়ে গেল। শহরের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ল। কারা এই কাজ করছে তারা বুঝতে পারল না। নিজেদের ভেতর চোর খুঁজলেও আসল অপরাধী যে সেই বিতাড়িত অজপা আর তার ডাকাত দল, তা কারো মাথায় এল না।
কিছুদিন পর, শহরের মানুষের কাছে আর বিশেষ কিছু বাকি নেই দেখে অজপারা ডাকাতি বন্ধ করল। কিন্তু তার মাথায় তখন ঘুরছে নতুন ফন্দি। এক মাঝরাতে, অজপা এক বিশাল মাটির জলার ভেতর ঢুকে পড়ল। দলের লোকজনকে বলল, ওই বড় কলসটি মোসান শহরের রাজপ্রাসাদের সামনে রেখে আসতে। তারা সেটি রেখে আসার পর সে নিচু গলায় ফিসফিসিয়ে বলল, “তোমরা সবাই গিয়ে কাছেই কোথাও অন্ধকারের ভেতর লুকিয়ে থাকো।”
এরপর ওই জলার ভেতর থেকে ভয়ংকর আর অদ্ভুত কণ্ঠে অজপা চিৎকার করে উঠল, “হো-ও-ও! রো-রো-ও, রো-ও-ও! ওহে মোসানের রাজা, পাত্রমিত্র আর অনুচররা, এখনই বাইরে এসে আমাকে পূজা করো! আমি তোমাদের পূর্বপুরুষ, আজ মাঝরাতে স্বর্গ থেকে নেমে এসেছি! এখনই বাইরে এসো, নইলে আজ রাতেই রাজাকে আমার সঙ্গে স্বর্গে যেতে হবে!”
কথা শোনামাত্র রাজা এবং তার পারিষদরা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে প্রাসাদের বাইরে বেরিয়ে এলেন। সেই অদ্ভুত জলার সামনে তারা ভয়ে থরথর করে নতজানু হয়ে বসে পড়লেন। হাত কচলাতে কচলাতে রাজা কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, “আহা, আমাদের মহান পূর্বপুরুষ! আপনি যে আমাদের প্রতি সদয় হয়ে আজ মাঝরাতে দেখা দিতে এসেছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা পরম সুখে আপনাকে প্রণাম জানাই!”
ভেতর থেকে অজপা আবার সেই বিকট স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, “হো-ও-ও! রো-রো-ও! আমি তোমাদের সেই পূর্বপুরুষ, যে এই মুকুট, রাজদণ্ড, প্রবালের মালা আর ধনসম্পদ রেখে গিয়েছিলাম। রাজা, তুমি এখন যা ব্যবহার করছ তার সবটাই আমার! এখন সেই সব কিছু এখানে নিয়ে এসো। ওগুলো সব পুরনো হয়ে গেছে, আমি ওগুলো পাল্টে নতুন করে দেব! হো-ও-ও! রো-রো-ও!”
সেকালের মানুষের মন ছিল সরল আর অন্ধকার। তারা দ্বিতীয়বার কিছু না ভেবেই বিশ্বাস করে নিল যে, ওই জলার ভেতরে রাজার পূর্বপুরুষই কথা বলছেন। ভয়ে তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে প্রাসাদের ভেতর দৌড়ে গেল। এমনকি ঘরের চাবি খোঁজারও সময় পেল না, কুঠার দিয়ে রাজকোষের দরজা ভেঙে সব রাজকীয় সম্পদ- মুকুট, দণ্ড, অর্থ, দামি পোশাক সব বাইরে এনে জলার সামনে রাখল।
রাজা বিনয়ের সঙ্গে প্রার্থনা করলেন, “প্রভু, এই নিন সব রাজকীয় সম্পদ। এগুলো গ্রহণ করুন আর আমাকে দীর্ঘকাল রাজত্ব করার আশীর্বাদ দিন। আমাদের শহরে শান্তি ফিরিয়ে দিন।” অজপা বিকট স্বরে আদেশ দিল, “হো-ও-ও! রো-রো-ও! ওগুলো ওখানে রেখে তোমরা শান্তিতে প্রাসাদে ফিরে যাও।”
রাজা ভেতরে ঢোকামাত্রই অজপা জলার ভেতর থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এল। তার ডাকাত দলও অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল। মুহূর্তের মধ্যে তারা শূন্য কলস আর সমস্ত ধন-সম্পদ কাঁধে নিয়ে অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে গেল। এভাবেই ধূর্ত অজপা তাকে তাড়িয়ে দেওয়া রাজাকে বোকা বানিয়ে সর্বস্ব লুট করল।
এরপর তারা ওলোমু শহরে গিয়ে রাজার মুকুট ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে দিয়ে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নিল। কিন্তু সেই অসৎ উপায়ে অর্জিত টাকা তারা কয়েক দিনেই বিলাসিতা করে উড়িয়ে দিল।
কিছুদিন পর, মোসান শহরের কিছু লোক একদিন দেখতে পেল ওলোমু শহরের রাজার মাথায় তাদের হারিয়ে যাওয়া সেই রাজকীয় মুকুট। তারা এই খবর তাদের রাজাকে জানালে, মোসানের রাজা ওলোমুর রাজার কাছে দূত পাঠিয়ে মুকুটটি ফেরত চাইলেন। কিন্তু ওলোমুর রাজা সাফ জানিয়ে দিলেন যে তিনি এটি কিনে নিয়েছেন, তাই ফেরত দেবেন না। এ নিয়ে দুই রাজার মধ্যে তুমুল কথা কাটাকাটি চলল এবং যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল।
মোসানের রাজা যখন গোপনে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন বিশ্বাসঘাতক অজপা ওলোমুর রাজাকে গিয়ে সেই গোপন খবর ফাঁস করে দিল। ওলোমুর রাজাও তখন তার সৈন্যবাহিনী সাজাতে শুরু করলেন।
যুদ্ধ শুরু হলো। মোসানের সৈন্যরা এমন বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করল যে তাদের জয় অবধারিত মনে হতে লাগল। কিন্তু ধূর্ত অজপা দেখল তার পুরনো শহর জিতে যাচ্ছে, অমনি সে ওলোমুর সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে নিজের লোকেদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরল।
এত বাধা সত্ত্বেও মোসানের সৈন্যরা তাদের মুকুট উদ্ধার করতে সমর্থ হলো। তখন বিশ্বাসঘাতক অজপা শত্রুপক্ষকে জানিয়ে দিল মোসানের সৈন্যরা কোথায় তাদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে। ওলোমুর সৈন্যরা সহজেই সেই সব অস্ত্র চুরি করে নিল। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না; অস্ত্র হারিয়ে মোসানের মানুষ আরও হিংস্র হয়ে লড়াই শুরু করল।
চার মাস যুদ্ধের পর ওলোমুর প্রায় সব সৈন্য মারা গেল। অনেককে বন্দী করা হলো, যাদের মধ্যে অজপাও ছিল। তাকে যখন মোসানের রাজার সামনে আনা হলো, রাজা তাকে দেবতাদের বেদীর সামনে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দিলেন। সেখানে তাকে শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে শুইয়ে রাখা হলো।
রাজা ঘোষণা করলেন, “তোমরা সবাই জানো, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র এর আগে কখনো চুরি হয়নি। কিন্তু এই সুদর্শন চেহারার অজপা আমাদের সঙ্গে বেইমানি করেছে। ও-ই শত্রুদের কাছে আমাদের গোপন খবর ফাঁস করেছে।” জনতা চিৎকার করে উঠল, “ধিক্কার তোমাকে অজপা! হে বিশ্বাসঘাতক! রাজার লোকরা একে এখনই বলি দিক, ওর মাথা কেটে ফেলা হোক!”
কিন্তু রাজা বললেন, “না! ওর অপরাধ এতই বড় যে শুধু শিরশ্ছেদ করলে তার সঠিক শাস্তি হবে না। শিরশ্ছেদের চেয়ে অভিশাপের ওজন অনেক বেশি!” অজপা কাঁদতে কাঁদতে প্রাণভিক্ষা চাইল, “মহারাজ, আমাকে ক্ষমা করুন! আমি আপনার দাস হয়ে থাকব!”
রাজা কোনো কথা শুনলেন না। তিনি দেবতাদের দিকে ফিরে প্রচণ্ড রাগে গর্জন করে বললেন, “হে আমাদের পূর্বপুরুষ ও দেশের দেবতারা! এই সুদর্শন মানুষ অজপাকে আজ থেকে এক ‘খোলস-মানবে’ পরিণত করো। ওর পোশাক হোক শক্ত খোলস, আর ও সারাজীবন বনের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে কাটাক!”
রাজার অভিশাপ শেষ হতে না হতেই সবার চোখের সামনে অজপা ছোট হয়ে গেল, তার পিঠে এক শক্ত খোলস গজিয়ে উঠল। সে এক অদ্ভুত প্রাণীতে পরিণত হয়ে বনের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে লাগল। লোকজন তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, “যা, বনে চলে যা, ওরে খোলস-মানব বিশ্বাসঘাতক!” সেই দিন থেকেই অজপা কচ্ছপ হয়ে পশুদের দলে নাম লেখালো।
বছরের পর বছর কচ্ছপ বনের ভেতর ঘুরে বেড়াতে লাগল। একদিন এক আমব্রেলা গাছের নিচে সে খাবারের অপেক্ষায় বসে ছিল। সেখানে সে এক গুবরেপোকা-মানবীকে আসতে দেখল। কচ্ছপ অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি একসময় মানুষ ছিলে?”
সেই পোকা-মানবী দুঃখে জানাল যে তার নাম ছিল ইয়ান্নিবো। সে ছিল শহরের সবচেয়ে সুন্দরী নারী। রাজা তাকে এক বলিদান বা নৈবেদ্য নিয়ে সৈন্যদের ক্যাম্পে যেতে বলেছিলেন, কিন্তু ভয়ে সে তা মাঝপথেই বনে ফেলে দেয়। সেই অপরাধে সে পোকা হয়ে গেছে।
কচ্ছপও নিজের পাপের কথা তাকে জানাল। এরপর সে প্রস্তাব দিল, “আমরা দুজনেই অভিশপ্ত। চলো আমরা একে অপরকে বিয়ে করি।” পোকা-মানবী জিজ্ঞেস করল, “আমাদের বিয়ের ঘটক কে হবে?” কচ্ছপ তার চিরচেনা ধূর্তামিতে বলল, “আমরাই তো আমাদের প্রজাতির প্রথম পুরুষ ও নারী। দেখো, এখনই একটা ব্যবস্থা হবে।”
ঠিক তখনই গাছ থেকে একটা পাকা ফল টুপ করে পড়ল। কচ্ছপ সেটা কুড়িয়ে নিয়ে অর্ধেক নিজে খেল আর অর্ধেক ইয়ান্নিবোকে দিল। বলল, “এই ফলটাই আমাদের ঘটক। কারণ আমরা দুজনেই এটার স্বাদ ভাগ করে নিয়েছি।”
এরপর তারা কিছু বুড়ো হনুমানকে সাক্ষী রেখে এবং বনের পাখিদের গান শুনিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করল। সেই দিন থেকে ইয়ান্নিবো হলো কচ্ছপের স্ত্রী। তারা দুজনে বনের ফলমূল সংগ্রহ করে নাচতে নাচতে গভীর অরণ্যের দিকে চলে গেল। এভাবেই কচ্ছপের এককালের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের সমাপ্তি ঘটল কঠিন খোলসের আড়ালে।