Published : 24 Aug 2025, 10:10 AM
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের (১৯২৭-২০১৪) লেখার জগৎ এক আশ্চর্য মায়াবী ক্যানভাস, যেখানে বাস্তবতা আর অলৌকিকতা হাত ধরাধরি করে চলে। তার গল্পে মৃতেরা অনায়াসে ফিরে আসে, হলুদ প্রজাপতির ঝাঁক কারো আগমনি বার্তা দেয়, আর এক সুন্দরী কন্যা বাতাসে ভেসে স্বর্গে চলে যায়। বিশ্ব সাহিত্যকে ‘জাদু বাস্তবতা’ নামক এক নতুন পথের সন্ধান দেওয়া এই জাদুর উৎস কোথায়? কীভাবে কলম্বিয়ার এক ছোট শহরের বালক হয়ে উঠলেন বিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তি?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার শৈশবের স্মৃতি, নানির মুখে শোনা গল্প এবং এক রাতে পড়া একটি অবিশ্বাস্য লাইনের মধ্যে। লেখক হওয়ার সেই মুহূর্তটির কথা মার্কেস নিজেই শুনিয়েছিলেন এক সাক্ষাৎকারে। শৈশবে তিনি ছবি এঁকে, কার্টুন এঁকে নিজেকে প্রকাশ করতেন। এমনকি স্কুলে লেখক হিসেবে খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও তখনো তিনি তেমন কিছুই লেখেননি।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এক রাতে এক বন্ধুর কাছ থেকে ফ্রানৎস কাফকার একটি বই ধার নেন। হোস্টেলে ফিরে যখন তিনি ‘দ্য মেটামরফোসিস’ পড়া শুরু করেন, প্রথম লাইনটিই তাকে প্রায় বিছানা থেকে ফেলে দেওয়ার জোগাড় করে। সেই লাইনটি ছিল, “এক সকালে গ্রেগর সামসা অস্বস্তিকর স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে দেখল, সে তার বিছানায় এক বিশাল পোকায় রূপান্তরিত হয়েছে...”।
মার্কেসের ভাষায়, সেই মুহূর্তে তিনি এতটাই বিস্মিত হয়েছিলেন যে নিজেকে বলেছিলেন, “আমি তো জানতামই না যে কাউকে এভাবে লেখার অনুমতি দেওয়া হতে পারে!” কাফকার ওই একটি লাইন যেন তার সামনে সম্ভাবনার এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল। তিনি সেদিনই বুঝেছিলেন, সাহিত্যের জগৎ কেবল নিরেট বাস্তবতার বর্ণনায় সীমাবদ্ধ নয়; এখানে অবিশ্বাস্য কল্পনাকেও অনায়াসে জায়গা দেওয়া যায়।
তবে এই স্ফুলিঙ্গটি পড়ার জন্য যে বারুদ দরকার ছিল, তা সঞ্চিত হয়েছিল তার শৈশবে। জীবনের প্রথম আট বছর তিনি কলম্বিয়ার আরাকাটাকার এক বড় বাড়িতে তার নানা-নানির কাছে বেড়ে ওঠেন। এই বাড়ি এবং এর বাসিন্দারাই ছিলেন তার সাহিত্যিক ডিএনএ-র মূল উৎস। তার নানা, কর্নেল নিকোলাস মার্কেস ছিলেন বাস্তবতার প্রতীক। একজন উদারপন্থি যোদ্ধা হিসেবে তিনি ছোট্ট ‘গাবো’-কে শোনাতেন যুদ্ধ, রাজনীতি আর ইতিহাসের রোমাঞ্চকর সব গল্প।
অন্যদিকে, তার নানি ত্রাঙ্কিলিনা ইগুয়ারান ছিলেন অলৌকিক জগতের বাসিন্দা। তার জগৎ ছিল কুসংস্কারে ভরা, যেখানে ভূত-প্রেত আর অশুভ আত্মার আনাগোনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তিনি সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক ঘটনাগুলো এমন ভাবলেশহীন মুখে বলতেন, যেন সেগুলো দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ।
নানার কাছ থেকে পাওয়া বাস্তবতার কঠিন ভিত এবং নানির কাছ থেকে পাওয়া পরাবাস্তবের মায়াবী জগৎ, এই দুই ভিন্ন মেরুর প্রভাব মার্কেসের লেখায় এক নিখুঁত মিশ্রণ ঘটিয়েছে। আরাকাটাকার সেই বাড়িটি, যা সারাক্ষণ আত্মীয়-স্বজন আর অদ্ভুত সব গল্পে ভরপুর থাকত, সেটিই পরবর্তীকালে তার কালজয়ী উপন্যাস নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর কিংবদন্তি শহর ‘মাকোন্দো’ হয়ে ওঠে।
পরবর্তীকালে আইন পড়া ছেড়ে দিয়ে মার্কেস সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এই পেশা তাকে কলম্বিয়ার আনাচে-কানাচে ঘুরতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়। সাংবাদিকতার নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ গদ্যশৈলী তার সাহিত্যিক ভাষাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি তার সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ও জাদুকরী ঘটনাগুলোকেও এমন নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বর্ণনা করতেন, যেন তিনি কোনো সংবাদপত্রে একটি সাধারণ ঘটনার প্রতিবেদন লিখছেন।
এই শৈলীই তার অলৌকিক বর্ণনাগুলোকে পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলত। সমস্ত অভিজ্ঞতা আর অনুপ্রেরণা একত্রিত হয়ে অবশেষে জন্ম দেয় তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’। কথিত আছে, গাড়িতে করে আকাপুলকো যাওয়ার পথে হঠাৎ করেই উপন্যাসটির প্রথম অধ্যায়টি দৈববাণীর মতো তার মাথায় আসে। তিনি তৎক্ষণাৎ গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন এবং নিজেকে প্রায় ১৮ মাস ধরে ঘরবন্দি করে উপন্যাসটি লেখা শেষ করেন।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ১৯২৭ সালের ৬ মার্চ কলম্বিয়ার ক্যারিবীয় উপকূলের ছোট্ট শহর আরাকাটাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল এই লেখকের জীবনাবসান ঘটলেও তার সৃষ্টি তাকে অমর করে রেখেছে। তার মৃত্যুর পর কলম্বিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস যথার্থই বলেছিলেন, “কিংবদন্তিরা কখনো মারা যান না।” সত্যিই তাই। যে বালকটি একদিন ছবি আঁকত, নানির মুখে ভূতের গল্প শুনত আর কাফকার পোকায় বিস্মিত হয়েছিল, সে আজ বিশ্ব সাহিত্যাকাশের এক চির উজ্জ্বল নক্ষত্র, এক অবিস্মরণীয় জাদুর কারিগর।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন ডটকম