Published : 07 Feb 2026, 12:06 AM
জনপ্রিয় একটি ইংরেজি প্রবাদ আছে যে, “বিড়ালের কোনো মালিক হয় না।” অর্থাৎ, বিড়াল কখনোই নিজেকে আপনার সম্পত্তি মনে করে না। হয়তো কথাটি কিছুটা হলেও সত্যি, তবে বিজ্ঞানীরা এখন জোর দিয়েই বলছেন যে, আমাদের এই প্রিয় আদুরে প্রাণীটি প্রায় ১২ হাজার বছর ধরে মানুষের সঙ্গে বসবাস করছে।
আজকের দিনে বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে বিড়াল সবচেয়ে জনপ্রিয় পোষা প্রাণী। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯ কোটি গৃহপালিত বিড়াল রয়েছে, যা দেশটির প্রায় ৩৪ শতাংশ বাড়ির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইন্টারনেটে বিড়াল নিয়ে প্রচুর মজার এবং জ্ঞানগর্ভ উক্তি খুঁজে পাওয়া যায়।
আমেরিকান লেখক ও সম্পাদক এলেন পেরি বার্কলে বলেছিলেন, “প্রতিটি বিড়ালের মালিকই জানেন যে, আসলে কেউ বিড়ালের মালিক হতে পারে না।” আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক জর্জ এফ উইল তো একধাপ এগিয়ে বলে দিয়েছিলেন যে, ‘গৃহপালিত বিড়াল’ শব্দযুগলটিই একটি স্ববিরোধী শব্দ। কুকুরের ক্ষেত্রে বলা হয় সে মানুষের পরম বন্ধু, কিন্তু বিড়ালের ক্ষেত্রে বলা হয় সে নিজেরই সেরা বন্ধু।
তবে রসিকতা যাই হোক না কেন, বিড়াল ও মানুষের সম্পর্কটি কয়েক হাজার বছর ধরে অত্যন্ত নিবিড় এবং একে অপরের পরিপূরক। এই ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা মানুষের সঙ্গে বিড়ালের সম্পর্কের সেই রহস্যময় রসায়নটি পরিষ্কার বুঝতে পারব।
প্রাচীন বিড়ালের রহস্য
বিড়াল কবে এবং কোথায় প্রথম গৃহপালিত হয়েছিল, সেই রহস্য সমাধান করা বিজ্ঞানীদের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সহজেই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবে। কিন্তু সমস্যা হলো, বুনো বিড়াল এবং গৃহপালিত বিড়ালের হাড়ের গঠন বা কঙ্কাল প্রায় একই রকম, যা বিজ্ঞানীদের বেশ বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছিল।
তবে প্রথম কিছু সূত্র পাওয়া যায় ১৯৮৩ সালে সাইপ্রাস দ্বীপে। সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ৮ হাজার বছর পুরনো একটি বিড়ালের চোয়ালের হাড় খুঁজে পান। মরুভূমি বা বনের হিংস্র বুনো বিড়ালকে কেউ জাহাজে করে দ্বীপে নিয়ে আসবে, এটি ভাবা অসম্ভব। লেখক ডেসমন্ড মরিস তার ‘ক্যাটওয়ার্ল্ড’ এনসাইক্লোপিডিয়ায় লিখেছেন, “খামচি দেওয়া, হিসহিস করা এবং আতঙ্কিত এক বুনো প্রাণী কখনোই মানুষের নৌ-ভ্রমণের সঙ্গী হতে পারে না।” সুতরাং, এই আবিষ্কারটি ইঙ্গিত দেয় যে বিড়াল গৃহপালিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি ৮ হাজার বছরেরও আগে শুরু হয়েছিল।
২০০৪ সালে সাইপ্রাসে আরও একটি প্রাচীন জায়গা আবিষ্কৃত হয় যেখানে একটি বিড়ালকে মানুষের সঙ্গে সযত্নে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। এই সমাধিটি ছিল ৯ হাজার ৫০০ বছরের পুরনো। এটি প্রমাণ করে যে, সেই সুদূর অতীতেও বিড়াল মানুষের কত কাছের ছিল। এরপর সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিড়ালের জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বর্তমানের সব গৃহপালিত বিড়ালই মধ্যপ্রাচ্যের বুনো বিড়াল ‘ফেলিস সিলভেস্ট্রিস’ থেকে এসেছে। যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘বনের বিড়াল’। গবেষকরা মনে করেন, এই বন্ধুত্বের শুরু হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার বছর আগে!
সভ্যতার প্রিয় সঙ্গী
১২ হাজার বছর আগের হিসাবটি অনেকের কাছে বেশি মনে হতে পারে, তবে কৃষি সভ্যতার প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত যৌক্তিক। ঠিক এই সময়েই মধ্যপ্রাচ্যের উর্বর এলাকায় মানুষ প্রথমবারের মতো কৃষিকাজ এবং সমাজবদ্ধ জীবন শুরু করে। যখন মানুষ প্রধানত শিকারি ছিল, তখন কুকুর তাদের শিকারের কাজে দারুণ সাহায্য করত, তাই কুকুর অনেক আগেই গৃহপালিত হয়েছিল।
কিন্তু বিড়ালের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় যখন মানুষ থিতু হতে শুরু করে এবং শস্য গুদামজাত করতে শেখে। শস্যের গুদামে যখন ইঁদুরের উপদ্রব বাড়ল, তখন খাবারের লোভে বুনো বিড়ালগুলো মানুষের লোকালয়ে আসতে শুরু করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম সফল একটি ‘জৈবিক পরীক্ষা’। বিড়াল শস্যের গুদামে প্রচুর শিকার পেয়ে খুশি ছিল, আর মানুষ খুশি ছিল এই ভেবে যে বিড়াল তাদের কষ্টের ফসল ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা করছে।
গবেষক কার্লোস ড্রিসকলের মতে, বিড়াল আসলে অনেকটা নিজেই নিজেকে গৃহপালিত করেছে। তারা নিজেরাই মানুষের সংস্পর্শে এসেছিল। কালক্রমে মানুষ যখন শান্ত ও নম্র স্বভাবের বিড়ালদের পছন্দ করতে শুরু করল, তখন বিড়ালও নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিল। এভাবেই ধীরে ধীরে আজকের গৃহপালিত বিড়ালের বিবর্তন ঘটেছে।

ইতিহাসে বিড়াল: কখনো ঈশ্বর, কখনো শয়তান
বিড়াল ও মানুষের সম্পর্কটি যুগে যুগে অত্যন্ত বিচিত্র। প্রাচীন মিশরে বিড়ালকে নিয়ে যে ভক্তি ও সম্মান ছিল, তা আজ কিংবদন্তি। সেখানে বিড়ালের জন্য আলাদা কবরস্থান ছিল, যেখানে বিজ্ঞানীরা প্রায় ৩ লাখ বিড়ালের মমি খুঁজে পেয়েছেন। মিশরের ভালোবাসার দেবী ‘বাস্টেট’-এর মাথা দেখতে বিড়ালের মতো। মিশরে বিড়াল হত্যা করা ছিল চরম অপরাধ, শাস্তি হতো মৃত্যুদণ্ড।
প্রাচীন রোমানরাও বিড়ালকে খুব শ্রদ্ধা করত, তাদের কাছে এটি ছিল স্বাধীনতার প্রতীক। সুদূর প্রাচ্যে (চীন ও জাপান) অত্যন্ত মূল্যবান পাণ্ডুলিপিগুলো ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বিড়ালের কদর ছিল আকাশচুম্বী।
তবে ইতিহাসের সব সময় বিড়ালের জন্য সুখকর ছিল না। মধ্যযুগে ইউরোপে বিড়ালকে চরম ঘৃণা ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। মানুষ মনে করত বিড়াল হলো ‘ডাইনি’ বা ‘শয়তানের দোসর’। অশুভ শক্তির আশঙ্কায় প্রচুর বিড়াল মেরে ফেলা হয়। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, বিড়াল কমানোর এই নির্বোধ সিদ্ধান্তের কারণেই ইউরোপে ইঁদুরের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ভয়াবহ ‘প্লেগ’ মহামারি ছড়াতে সাহায্য করেছিল। ১৬০০ সালের পর থেকে বিড়াল নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের এই ভ্রান্ত ধারণা দূর হতে শুরু করে।
আজকের বিড়াল: সুপারস্টার
বর্তমানে বিড়াল কেবল ঘরের কোণে শুয়ে থাকা প্রাণী নয়, তারা রীতিমতো সুপারস্টার। কমিক বুক থেকে শুরু করে কার্টুন ও টেলিভিশন শো, সবখানেই তাদের জয়জয়কার। ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েই বিড়ালের বিভিন্ন সেবা এবং পণ্যের বাজার বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। তবু জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এখনো কিছুটা প্রাচীন সংশয় রয়েই গেছে। এখনো অনেক মুভিতে দেখা যায় মহানিষ্ঠুর কোনো ভিলেন তার আয়েশি চেয়ারে বসে জগৎ ধ্বংসের পরিকল্পনা করছে আর কোলে থাকা একটি বিড়ালের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করছে। গোল্ডেন রিট্রিভার জাতের কুকুরের ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য কি সচরাচর দেখা যায়?
এই যে বিড়ালের প্রতি আমাদের ভালোবাসা আর হালকা ভয় মেশানো এক অদ্ভুত আকর্ষণ, এটিই আমাদের ১২ হাজার বছরের এই সম্পর্কের মূল সৌন্দর্য। বিড়াল হয়তো সত্যিই কারো পোষ মানে না, কিন্তু তারা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েই আছে।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন