Published : 14 Oct 2025, 12:08 PM
ভ্রমণ তোমাকে বাকরুদ্ধ করে দেয়, তারপর গল্পে পরিণত করে। মধ্যযুগের পরিব্রাজক ইবনে বতুতা উক্তিটি করেছিলেন। বতুতা সম্পর্কে সবাই কম-বেশি জানেন। সেই বিস্তীর্ণ অনাধুনিক, অযান্ত্রিক, মরুময় ঊষর কি বিপদসংকুল প্রস্তরময় পার্বত্য এলাকা পরিভ্রমণে তিনি ছিলেন সিদ্ধপুরুষ। ‘রিহলা’ তার ভ্রমণবিষয়ক বিখ্যাত বই।
কিন্তু উপরের উক্তিটি ছিল তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতাপ্রসূত। কোনো বইয়ে তিনি একথা লিখেননি, যা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি এই লেখাটা লিখার আগ পর্যন্ত। কোনোভাবেই নিজেকে নিভৃত রাখতে পারছিলাম না। আমাকে লিখতেই হল। না লিখে উপায় ছিল না। ১৫ দিনের চীন ভ্রমণ আমাদের নিয়ে গিয়েছিল অজানা এক জগতে।
জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীনে যাও। ছোটবেলা থেকেই কথাটা শুনে আমরা অভ্যস্ত। এক মুসলিম মনীষীর কথা। তবে কেন চীন দেশের কথা বলা হলো? কী আছে চীনে? জ্ঞানের সঙ্গে চীনেরই কী সম্পর্ক? কী এমন অপরিমেয় আধার যা পান করলে জ্ঞানী হওয়া যায়? বহু বছর ধরে এসব প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খেয়েছে। কাকতালীয় ঘটনা ঘটে গেল। ঘণ্টা বেজে উঠলো। ডাক পড়লো সেই চীন ভ্রমণের। চূড়ান্ত মনোনয়ন শেষে চীন সরকার আমন্ত্রণপত্র পাঠালো। সিসিম ফাঁক! বন্ধ দরজা খুলে গেল। এবার উড়াল দেওয়ার পালা সীমানা পেরিয়ে।
আমাদের দলটা ছিল ৩৪ জনের। সবাই সরকারি চাকুরে, সহকর্মী। পরস্পর নির্ভরশীল। কিন্তু অবস্থান ছিল দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ভার্চুয়াল দুনিয়া আমাদের সেই দূরত্ব ঘুচিয়েছিল। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হল। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত বিনিময় হতে থাকলো। আঁধার ঘুচে গেল। স্বপ্নের তারায় আলোকিত হতে লাগলো অনাগত ভ্রমণের অচেনা অন্ধকার পথ।

ওদিকে আকাশে উড়ার দিন যত এগিয়ে আসছিল রোমাঞ্চকর স্বপ্নময় এক ভ্রমণের অপেক্ষায় সবার উত্তেজনার পারদ ক্রমেই চড়ছিল। ঝড়ের বিজলির মতো হঠাৎ হঠাৎ গ্রেট ওয়াল, তিয়েনআনমেন স্কয়ার, মাও সে তুং, বিপ্লব, কমিউনিজম, প্রলেতারিয়েত, জেকি চেং, শি জিনপিং, দালাই লামা, তিব্বত, তুষার, সাংহাই ও বেইজিং নগরীর সুউচ্চ ভবনের ছবিগুলো দপদপ করে কল্পনায় জ্বলে উঠছিল।
দিনে দিনে দিন ফুরিয়ে গেল। যাত্রার ক্ষণ চলে এলো। ৯ সেপ্টেম্বর। মঙ্গলবার। ফ্লাইট রাত ১১টা ১৫ মিনিটে। এয়ারলাইন্স চায়না সাউদার্ন। গন্তব্য উরুমচি, জিনজিয়াং উইঘুর অটোনোমাস রিজিয়ন। সেদিন আমরা ছিলাম মোট ১৭ জন। বাকিদের একটা দলকে অবশ্য আগের রাতেই বিমানে চড়তে হয়েছিল টিকেট স্বল্পতার কারণে। একে একে সবাই বিমানবন্দরে মিলিত হলাম। নির্দেশ ছিল উড়োজাহাজ উড়ালের অন্তত ৩ ঘণ্টা আগে যেন সবাই পৌঁছে যাই।
আমি এর আগেও বহুবার বিমানবন্দর গিয়েছি, কাউকে এগিয়ে দিতে কিংবা নিয়ে আসতে। কিন্তু এই প্রথম নিজে যাচ্ছি ইন্টারন্যাশনাল ইমিগ্রেশন পার হয়ে। সরকারি পাসপোর্ট থাকায় সহজেই ইমিগ্রেশন সুসম্পন্ন হয়ে গেল। এবার বিমানে উঠার পালা। হাতে সময় ছিল পর্যাপ্ত। প্রায় ২ ঘণ্টা। সহকর্মীদের অনেকেই ওয়েটিং লাউঞ্জে অপেক্ষা করছিল। তাদের সঙ্গে আছি আমিও। এর মাঝে সাত্তার বেগ হঠাৎ বললো, সবাই এদিকে তাকান! সোমা আপা, মিস সোমা, সরফরাজ, আসাদ, কর্ণ আর আমি স্মিতমুখে ফিরতেই ক্লিক। হয়ে গেল সেলফি। এ যাত্রায় আমাদের প্রথম ছবি। তারপর আরো গ্রুপ ছবি, সেলফি যে যার মতো।
ওদিকে সময় বয়ে যাচ্ছে। লাউঞ্জের পরিপাটি শপে ঘোরাঘুরি চলছে। কেউ কেউ আবার ডিনার সেরে নিতে সিঁড়ি ভেঙে উঠছে দ্বিতীয় তলায়। ক্রেডিট কার্ড থাকায় আমিও রফিককে নিয়ে গিয়ে বসলাম ইউসিবি লাউঞ্জে। ফ্রিতে ডিনারটা সেরে নেওয়া যাক। তখনই ঘটে এক অবাক কাণ্ড। আমাদের যাত্রাপথ ছিল গুয়াংজু হয়ে উরুমচি। আয়েশি ভঙ্গিতে ডিনার শুরু করেছি। স্যুপে দুই চুমুক দিতেই ডাক। গুয়াংজুর ফ্লাইট চলে যাচ্ছে। সময় শেষ।

আমরা চমকে গেলাম। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি, ৯টা। সঙ্গী রফিককে বললাম, বিমান কি কখনো আগে ছেড়ে যায়? সে কিছুটা কনফিউজড। যাই হোক, খাবার রেখে তড়িঘড়ি করে উঠছি, এমন সময় একজন ওয়েটার দ্রুত এগিয়ে আসে, স্যার আপনাদের কি ইউএস বাংলা? আমি বললাম, না! উত্তর এলো, তাহলে বসুন। আপনাদেরটা পরে। রফিক তখন বলে উঠে, বলছিলাম না ভাই, এটা অন্য বিমান।
হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। দারুণ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তবে এই অভিজ্ঞতা চিন্তার বাইরে। বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ টার্মিনালের মতো বিমানবন্দরেও কি ডেকে ডেকে যাত্রী তোলা হয় নাকি! শেষমেষ শুভাকাঙ্ক্ষী ওই ওয়েটার লাউঞ্জে ঢোকার দরজার উপরে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলে, ওই ডিপারচার বোর্ডের দিকে খেয়াল রাখলেই হবে স্যার। আপনারা ডিনার শেষ করুন।
রাত সাড়ে দশটার দিকে সিকিউরিটি চেক শেষে আমাদেরকে শাটল বাসে করে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পার্কিং-এ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দাঁড়ানো ছিল বিশালাকৃতির বিমান। চোখ ঘোরাতে দেখি, কাছে দূরে আরো অনেক বিমান। উপরে শুক্লপক্ষের চাঁদ। চারপাশে উন্মুখ ঢাকা। বিমানের গর্জন। সেলফিতে কেউ কেউ। বেশিরভাগ সারিবদ্ধভাবে সিঁড়ি বেয়ে বিমানের পেটে ঢুকে পড়ছে। আমরাও উঠলাম। টিভি-সিনেমাতে দেখেছি বিমানবালারা অপরূপ রূপবতী ও বিনয়ী হয়। কিন্তু আমাদের বিমানবালারা ছিল এলিয়েন টাইপ।
মনে পড়ে ২০০৯ সালে জেমস ক্যামেরনের অস্কারজয়ী ‘অ্যাভাটার’ চলচ্চিত্রের কথা। নায়িকা নেইটিরির লম্বা একহারা গড়ন, প্রসারিত হাত, ছিপছিপে আঙুল আর হরিণের মতো কান। বড় মাথায় কালো চুলের খোপায় এদেরও ভিন্ন গ্রহের মনে হচ্ছিল। সব যাত্রী নিজ নিজ আসনে স্থির হলে সংক্ষিপ্ত সতর্কতামূলক ঘোষণার পর বিমানের নাক ঘুরে গেল। রানওয়েতে উঠে একটু দম নিয়ে দিল লম্বা দৌড়।

দৌড়াতে দৌড়াতে গগনবিদারী চিৎকারে অলৌকিক কোনো শঙ্খপাখির মতো ডানা ঝাপটে বিমান হঠাৎ উঠে গেল আকাশে। পেছনের দিকে কাত হয়ে আমরা শূন্যে ভেসে থাকি। জানালায় চোখ দিলে দেখা যায় নিচে রাতের ঢাকা। অন্ধকারে লক্ষ কোটি জোনাকি, কিংবা আকাশ যেন উলটে গেছে। অথবা পাতালপুরী। নক্ষত্র বিথীকা। দেশ। স্ত্রী-পুত্র, পিতা-মাতা, বন্ধু আর স্বজন। তাদের চোখেও হয়ত নক্ষত্রে আমি। কিন্তু বিরাম নেই নির্দয় শঙ্খটার। ক্রমে ১০ হাজার, ২০ হাজার, ৩০ হাজার ফুট উঁচুতে ছোটে। নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম দিয়ে সীমানা পেরিয়ে।
পরদিন দুপুর ২টায় আমরা উরুমচি পৌঁছই। পথিমধ্যে গুয়াংজুতে ছিল ৩ ঘণ্টার ট্রানজিট। গুয়াংজু চীনের পঞ্চম বৃহত্তম শহর। ভোর ৫টার দিকে গুয়াংজুতে আমাদের বিমান মাটি ছুঁয়েছিল। জানালা দিয়ে বাহির দেখার চেষ্টা করি। সুবিশাল বিমানবন্দর। দূরে ঘুমন্ত শহর। ল্যাম্পপোস্ট। গভীর রাত। নিস্তব্ধতা ভেঙে শহরের বুকে আমাদের বিমান নামে। যাত্রীরা আড়মোড়া ভাঙে। কাকনিদ্রার অবসান হয়। পেছন থেকে কে একজন আমাকে খোঁচা দেয়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সহকর্মী আসাদ। ভাই চলেন। ঘুম কেমন হল? হেঁয়ালি করে উত্তর দিলাম, শঙ্খপাখির পিঠে যেমন হয়! আসাদ অবাক হল, মানে? আমি হাসলাম, কিছু না। চলো নামি।
হ্যান্ড লাগেজ বগলদাবা করে সারিবদ্ধভাবে বিমান থেকে আমরা বেরিয়ে এলাম। নিমিষেই আমাদের পুরো দলটা মিলিত হলো। দলনেতা শাহ আলম মুকুল স্যার সবাইকে সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা দিলেন। তারপর আমরা ছুটলাম ডোমেস্টিক টার্মিনালের দিক। উরুমচির বিমান ধরতে হবে। গুয়াংজু থেকে উরুমচির দূরত্ব প্রায় ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার। উরুমচির ফ্লাইটের টিকেট ঢাকা থেকেই আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফ্লাইট নাম্বার ‘সিজেড-৮৪৩৪’। পাসপোর্ট স্ক্যান করে ফ্রি ওয়াইফাই পেয়ে গেলাম বিমানবন্দরে। পৃথিবীর সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপিত হলো যেন দূর কোন গ্রহ থেকে।

তারপর কখনো হেঁটে কখনো ট্র্যাক এসকেলেটরে আমরা এগোতে লাগলাম। সুবিশাল গুয়াংজু বিমানবন্দর, পুরো নাম ‘গুয়াংজু বাইউন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। পথ যেন ফুরোয় না। ইলেকট্রনিক্স ডিসপ্লে বোর্ডে উরুমচিমুখী ‘সিজেড-৮৪৩৪’ ফ্লাইটের বোডিং গেট দেখে নিলাম। ততক্ষণে বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। পুরো বিমানবন্দর যেন স্বচ্ছ কাচ মোড়ানো বিশাল এক কাচঘর। পৃথিবীতে যেন ভয়ানক কোনো প্রলয় ঘটে গেছে। তাই কাচের ভেতর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হয়ে চলছি আমরা। বাইরে সারি সারি বিমান দাঁড়িয়ে। ঝা চকচকে সাজানো গোছানো চারদিক।
নির্ধারিত বোডিং ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম একসময়। অনিদ্রায় আমাদের পুরো দলটা ততক্ষণে ক্লান্ত। কিন্তু কৌতূহলী দৃষ্টিতে সবাই উৎসুক। ওয়াশরুম, হালকা স্ন্যাকস সেরে ঠিক পৌনে ৮টায় শাটল বাসে চড়ে পার্কিং-এ দাঁড়ানো অপেক্ষাকৃত ছোট একটা বোয়িং বিমানে আমরা ফের উঠে বসলাম। তারপর আবার উড়ান। হাজার হাজার মাইলের বনজ সবুজ পাহাড়, লালচে বালুময় মরুভূমি, আর তুষারাবৃত সাদা পর্বতের মাথা ভেঙে, শত শত বছরের চৈনিক সভ্যতার উপর ছায়া ফেলে, হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে প্রায় ৫ ঘণ্টা পর চীনের সর্ব উত্তর-পশ্চিমে উরুমচি নামক অজানা অচেনা শহরে আমরা পৌঁছাই।
বিমানবন্দরের নাম ‘উরুমচি দিয়োপো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। সেখানে এমি নামে হালকা-পাতলা এক নারী ও তার দল প্ল্যাকার্ড হাতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। স্মিতমুখে প্ল্যাকার্ডধারীর দিকে এগিয়ে গেলে তিনি সাদরে আমাদের গ্রহণ করলেন। তারপর একটি গ্রুপ ছবি শেষে সবাই ছুটলো দু’হাত বাড়িয়ে থাকা উরুমচি বিজয়ে।
চলবে...