অনূদিত গল্প
Published : 18 May 2026, 01:24 AM
লেখক ও শৌখিন বৈমানিক রিচার্ড বাখের জন্ম ১৯৩৬ সালে, যুক্তরাষ্ট্রে। তার জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে আকাশে বিমান উড়িয়ে, আর সেই উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন জীবনের দর্শন। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় বই হলো ‘জোনাথন লিভিংস্টোন সিগাল’।
এ গল্পের মূল শিরোনাম ‘দেয়ার ইজ নো সাচ প্লেস অ্যাজ ফার অ্যাওয়ে’। শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক কবীর চৌধুরীর অনুবাদে (দূর বলে কিছু নেই, সাহিত্য প্রকাশ) গল্পটি আমি প্রথম পড়েছিলাম প্রায় এক দশক আগে। সম্প্রতি মূল ইংরেজি পাঠটি খুঁজে পেয়ে এর দার্শনিক আবেদন নিজস্ব বয়ানে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করি। সেই পাঠ-অনুপ্রেরণা থেকেই বর্তমান ভাষান্তর।
বহু বছর আগের কথা। রে হ্যানসেন নামে ছোট্ট এক মেয়ে ছিল, যে তার জীবনের পঞ্চম বসন্তে পা রাখতে চলেছে।
রে তার জন্মদিনে বন্ধু রিচার্ড বাখকে নিমন্ত্রণ জানাল। ছোট্ট রে-র মনে অটল আত্মবিশ্বাস। সে জানত, রিচার্ড নিশ্চয়ই আসবে। যদিও তার বাড়িটি দিগন্তরেখায় মেশানো ধূসর মরুভূমি, উত্তাল ঝড় আর আকাশচুম্বী পাহাড়ের ওপারে। রিচার্ড বাখ কীভাবে সেখানে পৌঁছালেন এবং রে-র জন্য কী উপহার নিয়ে গেলেন, সেই মায়াবী আখ্যানই বর্ণিত হয়েছে এই গল্পে।
রে! তোমার জন্মদিনে আমাকে নিমন্ত্রণ করার জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা। তোমার বাড়িটি আমার এখান থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে। আমি সাধারণত বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া এত লম্বা ভ্রমণে বের হই না। কিন্তু তোমার নিমন্ত্রণ বলে কথা! তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দের চেয়ে বড় কারণ আর কী হতে পারে? আমি তৈরি হলাম তোমার কাছে পৌঁছাতে।
আমি আমার যাত্রা শুরু করলাম ছোট্ট মৌটুসি পাখির হৃদয়ের ভেতর বসে। সেই ছোট্ট পাখিটি আমার আর তোমার অনেকদিনের বন্ধু। তাকে যখন বললাম, আমি পুঁচকে রে-র জন্মদিনে যাচ্ছি এবং তার জন্য একটা উপহারও নিয়ে যাচ্ছি, তখন সে বেশ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল।
আমরা কিছুক্ষণ নিরবে ডানা মেলে উড়লাম। নীল আকাশের বুক চিরে এগিয়ে যাওয়ার সময় সে হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বলে উঠল, রিচার্ড, তুমি যা বললে তার সবটা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত লাগছে তোমার এই জন্মদিনের দাওয়াতে যাওয়ার ব্যাপারটা।
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, কেন? এতে না বোঝার কী আছে? আমি দাওয়াত পেয়েছি, তাই যাচ্ছি। মৌটুসি আর কিছু বলল না। আমরা যখন প্যাঁচার আস্তানায় পৌঁছালাম, তখন সে ডানা ঝাপটে স্থির হয়ে বসল। তারপর আমাকে লক্ষ্য করে বলল, আচ্ছা বন্ধু, কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কি সত্যি দুজন বন্ধুকে আলাদা করে রাখতে পারে? তুমি যদি এই মুহূর্তে মনেপ্রাণে রে-র কাছে থাকতে চাও, তবে তুমি কি এখনই সেখানে নেই?
আমি কিছুটা থতমত খেয়ে গেলাম। প্যাঁচাকে বললাম, হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। তবে আমি তো আসলে রে-র জন্মদিনে যাচ্ছি, উপহার নিয়ে। এই যে যাচ্ছি বলাটা হয়তো আমার অভ্যেস হয়ে গেছে।
প্যাঁচা অনেকক্ষণ নিরবে আমার সঙ্গে উড়ল। তার চোখ দুটো ছিল হিরন্ময় রঙের, রহস্যে ঘেরা। একসময় সে আমাকে ঈগলের আস্তানায় পৌঁছে দিয়ে বলল, তুমি যা বললে তার রহস্য আমি ঠিক বুঝলাম না। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত লাগল তোমার ওই শব্দটা, ‘ছোট্ট রে’। তুমি তোমার বন্ধুকে ছোট বললে কেন?
আমি বললাম, কেন? কারণ সে তো এখনো বড় হয়ে ওঠেনি। সে তো শিশুই। প্যাঁচা তার মায়াবী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। বলল, একবার গভীরভাবে ভেবে দেখো তো বন্ধু, বয়স দিয়ে কি কারো ছোট বা বড় হওয়া বিচার করা যায়?
ঈগলের পিঠে চড়ে আমি পাহাড়ের চূড়াগুলো পার হচ্ছিলাম। বাতাসের তীব্র ঝাপটা আর মেঘের লুকোচুরি খেলা চলছিল। আমি ঈগলকে বললাম, ছোট্ট রে বড় হচ্ছে, তার জন্মদিনে আমি উপহার নিয়ে যাচ্ছি। প্যাঁচার সঙ্গে কথা বলার পর ‘যাচ্ছি’ আর ‘ছোট’ শব্দ দুটো বলতে আমার নিজেরই একটু খটকা লাগছিল। তবুও ঈগল যাতে সহজে বুঝতে পারে, তাই আমি সাধারণ ভাষাতেই বললাম।
কিন্তু ঈগল তো অন্য ধাতুতে গড়া। সে মেঘের ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে উড়তে উড়তে বলল, জন্মদিন? বয়স বাড়ছে? তার মানে কি এক বছর জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া? আমার কাছে তো এটা বড় হওয়া বলে মনে হয় না।
এরপর আমার দেখা হলো বাজপাখির সঙ্গে। সেও একই সুরে কথা বলল। আসলে সময়ের হিসাব আর দূরত্বের গণ্ডি তো মানুষের তৈরি। প্রকৃতির বন্ধুদের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই।
অবশেষে দেখা হলো সিগাল বা গাঙচিলের সঙ্গে। আমি জানতাম, গাঙচিলের কাণ্ডজ্ঞান প্রখর। তাই এবার আমি খুব সাবধানে শব্দ বেছে কথা বললাম। আমি বললাম, বন্ধু গাঙচিল, তুমি তো জানোই যে আমি মনে মনে সব সময়ই রে-র সঙ্গে আছি। তবে কেন তুমি আমাকে ডানায় করে তার বাড়ির ছাদে নামিয়ে দিলে?
গাঙচিল সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে ঠিক রে-র বাড়ির ছাদে ল্যান্ড করল। তারপর শান্ত স্বরে বলল, কারণ বন্ধু, সত্যটা জানা আর সত্যকে অনুভব করার মধ্যে তফাৎ আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি পূর্ণ জ্ঞান না পাচ্ছ, ততক্ষণ তোমাকে যন্ত্র, পাখি কিংবা মানুষের সাহায্য নিতে হবে। কিন্তু মনে রেখো, তোমার না জানাটা কিন্তু চিরন্তন সত্যকে বদলে দেয় না। সত্য সব সময়ই এক।
গাঙচিল বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম রে-র বাড়ির সামনে।
রে! এবার সময় হয়েছে তোমার উপহারটি খোলার। কাচ কিংবা টিনের তৈরি খেলনা উপহার দিলে তা একদিন ভেঙে যাবে, মরিচা ধরবে কিংবা হারিয়ে যাবে। কিন্তু আমি তোমার জন্য নিয়ে এসেছি এক বিশেষ উপহার। এটি এমন এক উপহার যা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, কেউ ধ্বংস করতে পারবে না।
এটি হলো জাদুকরী আংটি। তবে সাধারণ ধাতুর তৈরি নয়। এই আংটিটি শুধু তুমিই দেখতে পাবে, যেমন এক সময় আমি দেখতে পেতাম যখন এটি আমার ছিল। এই আংটি তোমাকে নতুন শক্তি দেবে। এটি পরলে তুমি যেকোনো পাখির ডানায় ভর করে নীল আকাশে ভেসে বেড়াতে পারবে।
তুমি তাদের সোনালি চোখের দৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখতে পাবে। পাখির পালক ছুঁয়ে যাওয়া বাতাসের ঝাপটা অনুভব করতে পারবে। নিচের পৃথিবীর সব দুশ্চিন্তা আর পিছুটান ভুলে গিয়ে তুমি মেঘের ওপরে আনন্দের রাজ্যে ঘুরে বেড়াতে পারবে। তুমি যতক্ষণ খুশি সেখানে থাকতে পারবে।
গোধূলির রাঙা আলোয় ডানা ঝাপটাতে পারবে। আর যখন তোমার নিচে নেমে আসার ইচ্ছে হবে, দেখবে তোমার সব প্রশ্নের উত্তর তুমি পেয়ে গেছো, তোমার সব দুশ্চিন্তা কর্পূরের মতো উবে গেছে।
এই আংটিটি তোমার কল্পনার মতো। তুমি যত বেশি এটি ব্যবহার করবে, এটি তত শক্তিশালী হবে। প্রথম দিকে হয়তো তুমি শুধু যখন বাড়ির বাইরে থাকবে এবং কোনো পাখিকে উড়তে দেখবে, তখনই এটি কাজ করবে। কিন্তু ধীরে ধীরে তুমি দেখবে, ঘরে বসে চোখ বন্ধ করেও তুমি অদৃশ্য পাখিদের ডানায় ভর করে উড়তে পারছ।
একদিন হয়তো তুমি আবিষ্কার করবে যে, তোমার আর কোনো আংটি কিংবা পাখিরও প্রয়োজন নেই। তুমি একাই মেঘের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে মহাশূন্যে ডানা মেলতে পারছ। সেইদিন যখন আসবে, তখন এই আংটিটি অন্য কাউকে দিয়ে দিও, এমন কাউকে যে এর সঠিক ব্যবহার জানবে। এমন কাউকে, যে বুঝতে পারবে যে পৃথিবীর দামি জিনিসগুলো টিন বা কাচের নয়, বরং সেগুলো আনন্দ আর সত্য দিয়ে তৈরি।
রে, আজ তোমার জন্মদিন হলেও আমার কাছে এটি বছরের আর পাঁচটা দিনের মতোই একটি বিশেষ দিন। বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া এই জ্ঞান নিয়ে আমি তোমার কাছে এসেছি।
আসলে, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসিনি, কারণ আমি তো সবসময়ই সঙ্গে আছি। তুমি ছোট নও, কারণ তুমি তোমার ভেতরে এক বিশাল সত্তাকে ধারণ করে আছ। আমরা সবাই জীবনের এই মঞ্চে অভিনয় করছি মাত্র। আমরা যাকে জন্মদিন বলি, তা কেবল ক্যালেন্ডারে একটি তারিখ মাত্র। কারণ তুমি চিরকালই ছিলে এবং চিরকালই থাকবে।
বন্ধুর দেওয়া প্রতিটি উপহারই হলো এক একটা সুখের প্রার্থনা। এই আংটিও তেমন। তুমি এই পৃথিবীর সময় আর জন্মদিনের গণ্ডি পেরিয়ে মুক্ত ও আনন্দিত মনে ডানা মেলে ওড়ো চিরকাল। আমাদের আবার দেখা হবে, যখনই আমাদের মন চাইবে। আমরা মিলেমিশে এক হবো সেই পরম উৎসবে, যার কোনো শেষ নেই।