১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

হামে মৃত্যু থামছে না কেন? সংক্রমণ কমবে কীভাবে?

টিকা দেওয়ার পর অ্যান্টিবডি যাচাই করতে পারলে, তা ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে, বলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী।

হামে মৃত্যু থামছে না কেন? সংক্রমণ কমবে কীভাবে?
হামের উপসর্গে আক্রান্ত তিন ছেলেমেয়েকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছেন জেলার রুমা সদর ইউনিয়নের লেতং পাড়ার বাসিন্দা শৈলুং খুমি। পাশে বসা তার এক আত্মীয়।

আব্দুস সবুর লোটাস আব্দুস সবুর লোটাস

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Aug 2026, 01:17 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

টিকা দেওয়ার পরেও হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন শিশুর প্রাণহানি হচ্ছে। সংক্রমণও কমছে না।

কেন মৃত্যু থামছে না? আর সংক্রমণ কেনই বা কমছে না? এই প্রশ্ন ওঠছে এখন। 

বিশেষজ্ঞরা মোটা দাগে হামের প্রকোপ না কমার দুটি কারণ বলেছেন। এগুলো হল-অনেক শিশুর টিকা না পাওয়া এবং হাম মোকাবিলায় ‘গাইডলাইন’ বা নির্দেশিকা না করা।

হাম ও লক্ষণ নিয়ে ইতোমধ্যে ঝরেছে প্রায় তিনশ প্রাণ। গত দুই দশকে এমন চিত্র দেখেনি বাংলাদেশ। ফাইল ছবি

হাম ও লক্ষণ নিয়ে ইতোমধ্যে ঝরেছে প্রায় তিনশ প্রাণ। গত দুই দশকে এমন

হাম পরিস্থিতি এতদিন পর্যন্ত লম্বা হওয়া এবং মৃত্যু ঠেকাতে না পারার বিষয়ে তারা সরকারের অবহেলা দেখছেন। 

তারা বলছেন, টিকা দেওয়ার পর এখন অ্যান্টিবডি যাচাই করা উচিত, আদতেই টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হল কিনা। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় মতো সঠিক সিদ্ধান্ত মাঠে বাস্তবায়ন করা গেলে হামের প্রকোপ এ পর্যায়ে আসত না।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান দাবি করেন, হামের সংক্রমণ ‘কিছুটা’ কমেছে। আগামীতে আরো কমবে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমাদের টিকা কার্যক্রম এবং মানুষদের সচেতন করার জন্য বিভিন্ন কাজ চলমান রয়েছে।”

ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, “বর্তমানে যেসব শিশু মারা যাচ্ছে তারা আসলে হামে নাকি নিউমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে, সেটি আরো ভালোভাবে দেখার জন্য বিভিন্ন বিভাগীয় পরিচলাকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

“কারণ হামের পর থেকে আর নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যু সেভাবে উল্লেখ হয়নি। তবে আমাদের দেশে স্বাভাবিকভাবে অনেক শিশু নিউমোনিয়া মারা যায়।”

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মৃত্যু ও সংক্রমণের চিত্র

হাম ও এই রোগের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা শিশুদের মধ্যে প্রাণহানি হয়েছে প্রায় ৮৫০ জনের। 

চলতি বছরের শুরুর দিকে হামের প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া গেলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৫ মার্চ থেকে তথ্য দিচ্ছে। সে হিসাবে গড়ে প্রতিদিন ছয়জনের মৃত্যু হচ্ছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাম সংক্রমণের শুরু থেকে পঞ্চম মাসেও গড় মৃত্যু খুব একটা কমেনি।

সংক্রমণের তথ্য দিতে শুরু করার প্রথম ৩০ দিন পর ১৪ এপ্রিলে দেখা যায়, হামের উপসর্গ ও হাম আক্রান্ত মিলিয়ে ১৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ৬ দশমিক ৬ জন করে মারা গেছে। এ এক মাসে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৩৬১। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৬৩৮ জন করে আক্রান্ত হয়েছে। 

দেশের দুটি বিশেষজ্ঞ দল বলেছেন, সন্দেহজনক হাম রোগী বলে কিছু নেই। যারা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন তারা সবাই হাম আক্রান্ত।

৬০তম দিন ১৪ মে পর্যন্ত মোট মারা যায় ৪৩৯ জন, গড়ে প্রতিদিন ৭ দশমিক ৩ জন করে মারা যায়। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসাপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৪১৯। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৯০৬ জন করে আক্রান্ত হয়েছে। 

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

৯০তম দিন ১৩ জুন পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৪৮। এ হিসাবে গড়ে প্রতিদিন ৭ দশমিক ২ জন করে মারা গেছে। এ সময়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪ হাজার ৮৯৯। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৯৪৩ জন করে আক্রান্ত হয়েছে।

১২০তম দিন ১৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ৭৫৯ জন মারা যায়, গড়ে প্রতিদিন ৬ দশমিক ৩ জন। এ সময়ে রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ১২ হাজার ৩৭৬। তার মানে, গড়ে প্রতিদিন ৭৫৯ জন আক্রান্ত হয়েছে। 

সর্বশেষ ১৩৯তম দিন ৩১ জুলাই পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৮৩৭ জনের, গড়ে প্রতিদিন ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে মোট রোগী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৩১০। তার মানে গড়ে প্রতিদিন ৯২৩ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম ৩০ দিনের গড় মৃত্যু যা ছিল, এখনো তাই রয়ে গেছে, আর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।

টিকাদান কার্যক্রম শেষ করার প্রায় ৩০ দিন পরে গড়ে প্রতিদিন ৯ শতাধিক আক্রান্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও আক্রান্তের গড় একই রয়ে গেছে। 

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

টিকা ‘কাভারেজ’ নিয়ে প্রশ্ন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ৩১ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তি রয়েছে ৪ হাজার ১২৮ জন। যা প্রথম মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রথম ৩০ দিন বা এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশের হাসপাতাললোতে প্রায় আড়াই হাজার রোগী ভর্তি ছিল। অর্থাৎ সংক্রমণ কমছে না। প্রতিদিনের গড় মৃত্যুও শুরুর দিকের প্রায় সমানই রয়ে গেছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসলে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমানো না গেলে মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়। তাই সবার আগে টিকার ‘কাভারেজ’ সঠিক করতে হবে।”

হামের প্রাদুর্ভাবের পর সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে সরকার প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় হাম-রুবেলার টিকাদান শুরু করে ৫ এপ্রিল। 

এরপর চারটি সিটি করপোরেশনে টিকাদান শুরু হয় ১২ এপ্রিল। আর ২০ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে শেষ হয় দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি।

গেল ১৪ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ ‘কাভারেজ’ বা শতভাগ শিশুকে টিকাদান সম্পন্ন হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে প্রতিদিন দেওয়া তথ্য বলছে, দেশের আট বিভাগে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন ‘টার্গেট’ শিশুর বিপরীতে ১ কোটি ৮৭ লাখ ২১৭ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ টিকার ‘কাভারেজ’ ১০৪ শতাংশ।

হামের প্রকোপ ঠেকাতে টিকাদানের যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার ঠিক করেছিল তার সঙ্গে ‘ভিটামিন এ প্লাস’ ক্যাপসুল কর্মসূচির আওতায় আনা শিশুর সংখ্যার ফারাক টিকা ‘কাভারেজ’ নিয়ে প্রশ্ন তোলার বড় কারণ।

হামের মতো একই বয়সি শিশুদের ‘ভিটামিন এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার। দুই কর্মসূচিরই শিশুর বয়স ৬ থেকে ৫৯ মাস ছিল। 

জাতীয় পুষ্টিপ্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুসারে, গেল ২৮ জুন ২ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ৫০৯ জন শিশুকে ‘ভিটামিন এ প্লাস’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়েছে। 

আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনের তথ্য অনুসারে, হামের টিকা পেয়েছে এক কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ জন শিশু। ক্যাপসুল খাওয়া ও টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে ৩৮ লাখ ৮২ হাজার ৮৯৩ জনের পার্থক্য দেখা গেছে। 

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআইর সাবেক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিাফোর ডটকমকে বলেন, “বর্তমান সরকার যে কাভারেজ দেখাচ্ছে, সেটি সঠিক নয়। বরং ‘ভিটামিন এ’ ক্যাপসুল খাওয়া শিশুদের সংখ্যাই বর্তমানে সঠিক।

“কারণ ২০১০ সালে টিকা কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখের মতো, এতদিন পর এসেও একই ধরনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে হাম-রুবেলার টিকার দেওয়া ক্ষেত্রে, যেটা আসলে সঠিক নয়।” 

তিনি বলছেন, হামের প্রকোপ কমাতে হলে বাদ পড়া শিশুদের টিকা দিতে হবে।

২৯ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “গত চার বছরে যেখানে হামের টিকা দেওয়ার কথা ছিল, তারা টিকা সংগ্রহ করেনি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। ইউনিসেফ যখন অনুরোধ করেছে, তখনও তারা টিকা কেনেনি। 

“আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর যখন হাম দেখা দিয়েছে…, বর্তমানে যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তার ৯৯ শতাংশই ‘আনভ্যাক্সিনেটেড’। তাই এই টিকাদান কর্মসূচিকে এখন আরো বেগবান করা হয়েছে এবং সম্প্রতি আরো ১ লাখেরও বেশি নতুন শিশুকে এর আওতায় আনা হয়েছে।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, “টিকার ‘কাভারেজ’ সঠিক না হওয়ার কারণে মৃত্যু থামছে না। কারণ একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার আগে হাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।”

বাদ পড়া শিশুদের বিষয়ে জানতে চাইলে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির সহকারী পরিচালক হাসানুল মাহমুদ বলেন, “আমরা দুই কর্মসূচির পার্থক্য হওয়া শিশুদের বিষয়টি লক্ষ্য করেছি। বিষয়টি মন্ত্রীকে জানানো হয়েছে। দ্রুতই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

“এছাড়া বর্তমানে আমাদের টিকা কার্যক্রম চালু রয়েছে। যে কেউ এখনো টিকা নিতে পারে। বিভিন্ন এলাকায় ক্যাপসুল খাওয়া এবং টিকা গ্রহণ থেকে বাদ পড়াদের তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে।”

অন্যদিকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ‘ত্রুটির’ দিকে আঙুল তুলেছেন আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন।

তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরো ভালো হলে কিছুটা মৃত্যু ঠেকানো যেত, কিন্তু এই দিকটাও ভালো নেই। কারণ এখনো দেশের সব মানুষকে সচেতন করা যায়নি।” 

সচেতনতার বিষয়ে ডা. মুশতাক বলছেন, শুধু জ্বর হলেই যাতে শিশুদের আলাদা রাখা হয়। আর জ্বর না সারলে স্থানীয় কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতে ভর্তি করা হয়। সেখানে যদি হাম শনাক্ত হয়, তাহলে শরীর ভালো না হওয়া পর্যন্ত ভর্তি থাকবে।

তিনি বলেন, “দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নত করতে হবে। অর্থাৎ আইসিইউ আর বাসার মাঝখানে একটা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকতে হবে। এতে রোগীদের যেমন জীবন রক্ষা হবে, তেমনি শহরের হাসপাতালে ভিড় কমে আসবে।”

হয়নি ‘গাইডলাইন’

একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন, হাম মোকাবিলায় একটি জাতীয় নির্দেশিকা বা ‘গাইডলাইন’ থাকলে মৃত্যু এবং সংক্রমণের হার কম হতো। 

তারা বলছেন, নির্দেশিকা থাকলে ‘একই ধরনের’ চিকিৎসাসেবা দেওয়া যেত, যার ফলে কমে আসত শিশু মৃত্যুর সংখ্যা।

হাম মোকাবিলায় গত ২৭ এপ্রিল একটি বিশেষ ‘টেকনিক্যাল কমিটি’ গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশিদকে প্রধান করে এই কমিটি গঠিত হয়। 

গেল ১৮ জুন অধ্যাপক হালিমুর রশিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, ‘গাইডলাইন’ তৈরি হয়েছে, কিন্তু অনুমোদন হয়নি। 

‘গাইডলাইন’ অনুমোদন হয়েছি কিনা, তা জানতে বৃহস্পতিবার তাকে একাধিক বার ফোন করলেও তিনি ধরেননি।

এছাড়া ওই টেকনিক্যাল কমিটির আর কোনো বৈঠকের তথ্যও পাওয়া যায়নি। 

গাইডলাইনের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) জাহিদ রায়হান বলেন, “আমার দপ্তরে এখন পর্যন্ত এমন কিছু আসেনি। তাই বলতে পারছি না।”

যাচাই করা হয়নি অ্যান্টিবডি

দেশে তিন ধাপে টিকার দেওয়ার পরেও হামের প্রকোপ না কমায় অ্যান্টিবডি যাচাইয়ের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন অ্যান্টিবডি যাচাই করতে হবে? জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, টিকাদান শুরুর পর সব সময় ‘কাভারেজ’ যাচাই করা হয়। কিন্তু এবারের ‘কাভারেজের’ তথ্য সঠিক নয়। নানা কারণে সঠিক লক্ষ্যমাত্রা ঠিক না করায় কম শিশু টিকা পেয়েছে। যে কারণে টিকাদানের পর শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি যাচাই করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।

তিনি বলেন, “টিকাদানের দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। টিকাদানের পর শিশুদের রক্তে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে অ্যান্টিবডির মাত্রা ১২০ মিলিলিটার থাকলে সেটি হাম থেকে সুরক্ষা দেবে।

“দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্তের নমুনা নিয়ে এটি যাচাই করা সম্ভব। এটি করতে পারলে ভবিষ্যতের জন্য ভালো।”

কোনো শিশু হাম থেকে সুস্থ্য হওয়ার পর তার রক্তে এই অ্যান্টিবডি ৮০০ মিলিলিটারের বেশি পাওয়া যাবে, যোগ করেন এই বিশেষজ্ঞ।

একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআর, আইসিডিডিআর,বি, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে অ্যান্টিবডি যাচাই ও গবেষণা করতে পারে। 

তবে এখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের তেমন পরিকল্পনার কথা শোনা যায়নি। এ খাতের জন্য কোনো বাজেটও নেই, বলছেন ওই বিশেষজ্ঞ।

আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “যে প্রতিষ্ঠান টিকা দেয়, তারা বা বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এটি করবে। কিন্তু হামের প্রকোপ বিবেচনায় বর্তমানে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বৈঠকের মাধ্যমে সর্বোচ্চ কাজ করা না গেলে পরিস্থিতির আরো উন্নতি করা কঠিন।”

গেল ২৩ জুন অ্যান্টিবডি যাচাইয়ের জন্য প্রটোকল তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছিলেন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমান। তবে গেল ২৭ জুলাই তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি করার কথা জানা গেছে।

হাম রোগীর ক্ষেত্রে করণীয় প্রশ্নে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ফাইল ছবি

হাম রোগীর ক্ষেত্রে করণীয় প্রশ্নে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ফাইল ছবি

‘অবহেলা দেখছেন’ বিশেষজ্ঞরা

হামের প্রকোপ মোকাবিলায় সরকারের ঢিলেমি দেখছেন আইইডিসিআর সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক বেনজির আহমেদ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন আরো ১ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা হবে। এটি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় অন্তত টিকার ‘কাভারেজ’ সঠিক নেই। তাই সবার আগে টিকাদান সম্পন্ন করতে হবে।

তিনি বলেন, “দেশে অন্তত ৯৫ শতাংশ নির্দিষ্ট বয়সি শিশুদের টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে, না হয় বাদ পড়া শিশুদের হাম হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সংক্রমণ থামবে না।”

বাদ পড়া শিশুদের কীভাবে টিকার আওতায় নিয়ে আসা যাবে? জবাবে তিনি বলেন, “আসলে বর্তমানে এই কাজটা কঠিন। তবে অনেক টাকা খরচ করে এটি করা সম্ভব। আর এটা না করলে সংক্রমণ থামানো যাবে না। 

“এটির জন্য প্রতিটি গ্রাম এবং পাড়ায় পাড়ায় মাইকিং করে জনসচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। এই মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব।” 

এ বিষয়ে আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক ও হাম-রুবেলা টিকাসংক্রান্ত ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি-এনভিসির চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “পরিস্থিতি এ পর্যায়ে চলে এসেছে, সরকারের সেভাবে খেয়ালই নেই।” 

তার মতে, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সভা করে সে অনুসারে হাম মোকাবিলায় কাজ করতে হবে।

মাহমুদুর রহমান বলছেন, “দেশে ছয় মাসের কম বয়সিরা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের জন্য এক ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার সংক্রমণ যেহেতু থামছে না, তাই নির্দিষ্ট বয়সের বেশি বয়সিদেরও টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। 

“এছাড়া আরো কিছু টেকনিক্যাল বিষয় রয়েছে, যেগুলো বিশেষজ্ঞদের মতামতসহ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। এসব ছাড়া পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।”

আগের খবর:

'জোড়াতালিদিয়ে চলছে হাম মোকাবিলাবিশেষজ্ঞদের সুপারিশ 'উপেক্ষা'

'হামের টিকা নিলে হয়ত পরিবারের ছয় শিশুকে হারাতে হত না', আক্ষেপ শৈলুং

হামে মৃত্যুর শততম দিন পার, 'অ্যান্টিবডিযাচাই দাবি

টিকা দিলেও হামের সংক্রমণ কমছে না? 'গলদকোথায়?

হামএনআইসিইউ সংকটনেই আক্রান্তের সমন্বিত তথ্য

নয় মাসের কম বয়সিরা কেন হামে মারা যাচ্ছে?