Published : 03 Apr 2026, 01:30 AM
উদ্ভ্রান্তের মত মহাখালীর সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটোছুটি করছিলেন টঙ্গী থেকে আসা মো. শরিফ।
তার তিন মাসের ছেলে আয়ানের হাম হয়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, তার অবস্থা ‘ভালো নয়’; প্রয়োজন আইসিইউ। কিন্তু এ হাসপাতালে কোনো আইসিইউ বেড খালি নেই।
শরিফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাচ্চার অবস্থা খারাপ। আপাতত এখানে ভর্তি রেখেছি। অন্য হাসপাতালে আইসিইউ খালি আছে কিনা খোঁজ নিচ্ছি।”
হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়া সারা দেশ থেকে আক্রান্ত শিশুরা আসছে মহাখালীর সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালে। আইসিইউ বেড তো খালি নেই, সাধারণ ওয়ার্ডেও জায়গা না থাকায় মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা। জরুরি বিভাগ থেকে রোগীর স্বজনদের বিষয়টি জানিয়েই ভর্তি নেওয়া হচ্ছে।
গত মঙ্গল ও বুধবার রাজধানীর এ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশুদের নিয়ে স্বজনদের লম্বা কিউ। হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবিকারা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের রোগী আসতে শুরু করে গত জানুয়ারি মাসে। তবে মার্চে, ঈদের আগে আগে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে।
আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগই শিশু। বিভিন্ন জেলায় হাম আক্রান্ত হয়ে বা হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০ পেরিয়ে গেছে।
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ সংক্রামক রোগ ও ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহজাহান নাজির বলেন, বর্তমানে যারা হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে, তাদের তাদের অধিকাংশের বয়স ৯ মাসের কম।
“কিন্তু আমাদের দেশে হামের ভ্যাকসিন দেওয়া হয় ৯ মাস পার হলে। তার কারণ হচ্ছে মায়ের শরীরের অ্যান্টিবডি বাচ্চাদের ৯ মাস পর্যন্ত মিজেলস প্রতিরোধ টিকা হিসাবে কাজ করে। কিন্তু এখন আর হচ্ছে না।”
তিনি জানান, আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু; তবে প্রাপ্তবয়স্ক রোগীও পাওয়া যাচ্ছে।
“আমরা তো পার ডে এই দুই-তিনটা করে পাচ্ছি। আমরা অ্যাডাল্টদের জন্য একটা ওয়ার্ড করেছি।”
এই চিকিৎসক বলেন, যারা টিকা নিয়েছে, তাদের কারও কারও হাম শনাক্ত হলেও সংক্রমণ গুরুতর নয়।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মুজিবুর রহমান বলেন, “হামের বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। তবে এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে এনআইসিইউ সংকট।
“দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা সেবার সবচেয়ে বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতাল এখনও এনআইসিইউ নেই। আমরা চেষ্টা করছি অন্তত বড় জেলাগুলোতে এনআইসিইউ সাপোর্ট দিতে, যাতে রোগীর জটিলতা বাড়লে এনআইসিইউতে চিকিৎসা করানো যায়।”
হাম একটি ভাইরাসজনিত অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা মূলত কাশি, হাঁচি এবং বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। উচ্চ মাত্রায় জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি এর প্রধান লক্ষণ।
ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ১০ থেকে ১৪ দিন পর হামের লক্ষণ শুরু হয়। প্রথমে ১০৩ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং গাল বা মুখের ভেতর ছোট সাদা দাগ (কপলিক স্পট) দেখা দিতে পারে।
এরপর ৩-৪ দিনের মাথায় মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। ফুসকুড়ি ওঠার ৪ দিন আগে থেকে ৪-৫ দিন পরে পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে এ রোগ।
সঠিক চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), কানে সংক্রমণ বা মারাত্মক পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জ্বর, সর্দি, কাশি, র্যাশ ও চোখ ওঠার মত কোনো লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। জ্বর না কমলে বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
হামের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, তবে উপসর্গ কমানোর জন্য ওষুধ দেন চিকিৎসকরা। সঠিক সময়ে এমএমআর টিকা নেওয়াই এ রোগ প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায়।
ধারণ ক্ষমতার বাইরে রোগী
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ১৩ মাস বয়সী হাবিবা সংক্রামণ ব্যাধি হাসপাতালের পঞ্চম তলার ওয়ার্ডে ভর্তি।
তার বাবা হাবিবুর শেখ মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “ঈদের পর থেকে এক সপ্তাহ হল হাসপাতালে ভর্তি আছে বাচ্চাটা। ওর হাম ও চিকেন পক্স একসঙ্গে হয়েছে। আপাতত অবস্থা কিছুটা ভালো। ডাক্তার বলেছেন শিগগিরই ছেড়ে দেবেন।”
হাবিবাকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল কি-না তা স্পষ্ট করে বলতে পারেননি প্রবাসী বাবা হাবিবুর। তার ভাষ্য, “আমি দেশের বাইরে থাকি, একটা টিকা মিস হয়েছে শুনেহি। কিন্তু সেটা কি টিকা তা বলতে পারছি না।”
হামে আক্রান্ত হয়ে তিন দিন ধরে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি আছে ৯ মাস বয়সী মিনহাজ। তার বাবা মো. সুজন পোশাক কারখানায় কাজ করেন, অসহায়ের মত ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি।

টঙ্গীর চেরাগআলীর বাসিন্দা সুজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হাসপাতালে বেড পাইনি। তাই ফ্লোরেই চিকিৎসা নিচ্ছে আমার বাচ্চা।
“প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে করে তিন-চার দিন বাসাতেই রেখেছিলাম। পরে অবস্থা খারাপ হওয়ায় মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যাই। তখন পরীক্ষায় হাম ধরা পড়ে। এরপর এখানে এনেছি।”
মিরপুর-২ থেকে নিজের ১১ মাস বয়সী বাচ্চাকে নিয়ে একই হাসপাতালে এসেছেন গৃহিণী মোরশেদা আক্তার। বাচ্চাকে নেবুলাইজার দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি।
মোরশেদা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি ওর হাম হয়েছে। এরপর দেখলাম ঘামাচির মত কি যেন উঠে সারা গা ভরে গেছে। পরে এখানে নিয়ে এসেছি আজ চার দিন হয়। এখন কিছুটা ভালোর দিকে।”
সংক্রামক ব্যধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) তানজিনা জাহান বুধবার বিকেলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হাম আক্রান্ত ও লক্ষণ নিয়ে মোট ৮৪ জন ভর্তি ছিল তখন।
মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “হাসপাতাল ১০০ শয্যার হলেও এখানে এইচআইভি, জলাতঙ্কসহ অন্যান্য রোগীরাও চিকিৎসা নিচ্ছে। সব হিসাব বাদ দিয়ে বেড থাকে ১১টা। স্বাভাবিকভাবেই মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।”

নেই সমন্বিত তথ্য
সারাদেশে সব মিলিয়ে কতজন হামের রোগী এখন হাসপাতালে ভর্তি আছে, সে তথ্য সুনির্দিষ্ট করে জানাতে পারেননি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
তথ্য চেয়ে মঙ্গলবার প্রথমে যোগাযোগ করা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে; সেখানকার একজন কর্মকর্তার পরামর্শে কথা হয় সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক আশরাফুন নাহারের সঙ্গে। তিনি মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এরপর মঙ্গল ও বুধবার দুদিন ধরে চেষ্টা করেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অধিদপ্তরের অন্য কর্মকর্তারাও দিয়েছেন ভিন্ন-ভিন্ন তথ্য।
অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের পরিচালক আহম্মেদ আল মামুন বুধবার দুপুরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সারাদেশে আক্রান্তের সমন্বিত তথ্য এই মুহূর্তে নেই। একজন মুখপাত্র নির্বাচন করা হবে। তিনি এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে পারবেন।”
পরে তিনি অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহিদ রায়হানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন। কিন্তু জাহিদ রায়হানের ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক মো. হালিমুর রশিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জানুয়ারি থেকে বুধবার পর্যন্ত সারাদেশে ৬৮৪ জন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে।
“এটা নিশ্চিত শনাক্তের তথ্য। লক্ষণ আছে বা সাসপেক্টদের তথ্য জানা নেই। আমরা বিভিন্ন হাসপাতালে তথ্য চেয়েছি। সেটা এলে তখন জানা যাবে।”

প্রকোপ জেলায়-জেলায়
সারাদেশেই বিস্তার ঘটেছে হামের। বিভিন্ন জেলায় আক্রান্তদের তথ্য আসছে প্রতিদিনই। আসছে মৃত্যুর খবরও।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম দিন থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিভাগে মোট ১০৩ জন হাম আক্রান্ত হয়েছেন। আর হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৬৩৬ জন।
সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ১১৫ জন। আর ৪ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে।
এ বছর হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন মারা গেছে গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বি জানান, গত ২৯ মার্চ থেকে এ বিভাগে হামের লক্ষণ নিয়ে ২০৬ জন চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসা নিয়েছে ৯৭ জন।
আর ২৯ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত পরীক্ষায় মোট ১৮ জন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ২ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে।
হামের লক্ষণ নিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে এ পর্যন্ত মারা গেছে পাঁচজন।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের ১০ জেলায় অন্তত ৫২ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। এর মধ্যে ১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। আগের দিন শনাক্ত হয়েছিল ১৯ জনের।
গত ১৭ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট ১৭২ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ২৬ জন।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহা. গোলাম মাওলানা বলেন, মার্চ মাসে হামের লক্ষণ নিয়ে এ হাসপাতালে ১২২ জন চিকিৎসা নেয়। তাদের মধ্যে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়।
আর ময়মনসিংহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বহস্পতিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ৬০ জনের মধ্যে, শনাক্ত হয়েছে একজন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, মার্চ মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪০ জনে।
সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২০ জন নতুন রোগী। বর্তমানে মোট ১৩২টি শিশু চিকিৎসাধীন।
শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, “হামের নিশ্চিত পরীক্ষার ফল পেতে সময় লাগায় আপাতত সব রোগীকেই ‘সাসপেক্টেড’ হিসেবে ধরা হচ্ছে। কারণ রাজশাহীতে দ্রুত এ পরীক্ষা করার সুযোগ নেই।”
এ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শাহীদা ইয়াসমিন জানান, মার্চ মাসে সেখানে হামের সংক্রমণ এবং উপসর্গ নিয়ে মোট ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বরিশাল বিভাগে এ বছর হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে গেছেন মোট ৩৮৫ জন। আর পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ৬৩ জনের।
শেষ ২৪ ঘণ্টায় এ বিভাগে ১১৫ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে গেছেছে, এই সময়ে পরীক্ষায় নতুন কারো সংক্রমণ নিশ্চিত হয়নি।
হামে আক্রান্ত হয়ে বরিশাল বিভাগে এ পর্যন্ত চারজন এবং হামের লক্ষণ নিয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

করণীয় কী?
চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই অল্পবয়সী শিশু। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী এবং ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। যেসব শিশু এখনো দুই ডোজ টিকা পায়নি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হাম একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। এটি সাধারণত শিশুদের হয়, তবে বড়দেরও হতে পারে। আমাদের দেশে সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল–এই সময়টাতে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। তবে ইদানিং আমরা দেখছি হামের প্রকোপটা বেড়েছে।
“এর পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে—আমাদের দেশে যে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) আছে, সেখানে কোনো কারণে শিশুদের অংশগ্রহণ হয়ত কমেছে। বিশেষ করে কোভিডের সময় অনেকে শিশুকে সময়মতো টিকা দেওয়া যায়নি, সেই গ্যাপটার কারণে এখন প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে।”
তিনি বলেন, “হামের টিকা এক ডোজ দিলে হবে না, দুটো ডোজ সময়মতো নিতে হয়। অনেকে প্রথম ডোজ দিলেও দ্বিতীয় ডোজের কথা ভুলে যান বা দেন না। ফলে শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না।”
হাম থেকে সুরক্ষায় করণীয় কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রথমত, শিশুকে অবশ্যই নয় মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে হবে। যদি কোনো কারণে টিকা বাদ পড়ে যায়, তবে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করে টিকা দিয়ে নিতে হবে।
“আর যদি কোনো শিশুর হাম হয়ে যায়, তবে তাকে আইসোলেশনে (আলাদা) রাখতে হবে যাতে অন্য শিশুরা আক্রান্ত না হয়। প্রচুর তরল খাবার ও ভিটামিন-এ খাওয়াতে হবে এবং অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। হামের পর অনেক সময় নিউমোনিয়া বা ডাইরিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়, তাই সতর্ক থাকতে হবে।”

টিকা রোববার থেকে
সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে আগামী সপ্তাহের রোববার থেকে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
এ কর্মসূচি পরিচালনায় বৃহস্পতিবার থেকে মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্মীদের ছুটি বাতিল ঘোষণা করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ইতোমধ্যে ৯০ লাখ ডোজ হামের টিকা সংগ্রহ করার তথ্য জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, “এখন সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে যেসব উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত, সেগুলোসহ প্রত্যেকটা উপজেলায় এসব টিকা পাঠিয়ে দেওয়া হবে।”
হামের প্রাদুর্ভাব ও এর সঙ্গে নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যু রোধে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আইসিডিডিআর,বি যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে বলেও জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
আইসিডিডিআর,বির পক্ষ থেকে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ভাবনী ও সাশ্রয়ী ‘বাবল সিপ্যাপ’ প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা কমাতে অত্যন্ত কার্যকর বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
[এই প্রতিবেদন তৈরিতে আমাদের চট্টগ্রাম অফিস এবং রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ প্রতিনিধি তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।]