Published : 07 Sep 2026, 08:36 AM
প্রসব বেদনা নিয়ে গত ২৯ জুন ফরিদপুরের সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন কনিকা রানী মণ্ডল (৩২)।
সেদিন সন্ধ্যায় চিকিৎসক লক্ষ্মী রানী দত্তের অধীনে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাসন্তান প্রসব করেন তিনি।
অস্ত্রোপচারের (সি-সেকশন) একদিন পর পেট ফুলে যায় কনিকার। বিষয়টি জানানোর পরও হাসপাতালের লোকজন গুরুত্ব দেয়নি বলে স্বজনদের অভিযোগ।
এরপর নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগতে থাকেন ওই নারীর। এর মধ্যে গত ৭ জুলাই ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে তার পেটে গজ (অস্ত্রোপচারের সময় ব্যবহৃত পাতলা জালির মতো কাপড়) পাওয়া যায়। এরপর গত ১৯ অগাস্ট মারা যান তিনি।
শুধু কনিকা নন, অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর পেটে গজ, মপ এমনকি ছুরি-কাঁচি রেখে সেলাই করে দেওয়ার ঘটনা দেশে প্রায়ই সংবাদের শিরোনাম হয়।
এর আগে ২০ এপ্রিল রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার হাবীবা জান্নাত নামে এক নারী একই ধরনের অভিযোগ তোলেন।
তিনি বলেন, “গত ৮ মার্চ নগরীর বন্ধন জেনারেল হাসপাতালে আমার অস্ত্রোপচার করেন গাইনি চিকিৎসক রাজিয়া বেগম মুক্তা। অস্ত্রোপচারের পর থেকেই তীব্র পেটব্যথা ও জটিলতায় ভুগছি।”
গত বছরের ২৮ অগাস্ট ফেনীতে অস্ত্রোপচার করান (সি-সেকশন) ফরিদা ইয়াসমিন (৪০) নামের এক নারী।
স্বজনদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসক ভুল করে ফরিদা ইয়াসমিনের পেটে গজ রেখে সেলাই সম্পন্ন করেন।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর ভাই ফেনী সিভিল সার্জন বরাবর চিকিৎসকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানান।
কনিকার মৃত্যুর দুদিন পর ২১ অগাস্ট স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘‘তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা বরদাস্ত করা হবে না। চিকিৎসা অবহেলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
তদন্ত প্রতিবেদনে গাফিলতি প্রমাণিত
ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে খোঁজ-খবর এবং সমবেদনা জানাতে গিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিতে ফরিদপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. মোক্তার হোসেন খানকে সভাপতি এবং ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুলতানা বেগমকে সদস্য সচিব করা হয়।
কনিকার দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার করা চিকিৎসক রাজধানীর ইবনে সিনা মেডিকেলের সিনিয়র কনসালটেন্ট আব্দুল জলিল বলেন, ‘‘পেটে গজ-মপ পাওয়া গেছে। আমরা সে অনুসারে তদন্ত কমিটির কাছে বিস্তারিত জানিয়েছি।’’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. পারভেজ কবির বলেন, ‘‘পেটের ভেতরে গজ থাকায় ওই নারীর পেটে সেপটিসেমিয়া হয়েছে। এছাড়া রোগীর শরীরে সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক সেনসিটিভিটি রেজিস্ট্যান্স ছিল।”
তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘‘পেটে গজ ছিল এবং চিকিৎসকদের কিছু গাফিলতি পাওয়া গেছে। আমরা সেই অনুসারে সুপারিশ করে দিয়েছি।’’
এ বিষয়ে ফরিদপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং তদন্ত কমিটির প্রধান ডা. মো. মোক্তার হোসেন বলেন, ‘‘আমরা গত ২৭ অগাস্ট তদন্ত প্রতিবেদন সিভিল সার্জন অফিসে জমা দিয়েছি। তবে এটির বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।’’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘‘আমরা তদন্ত প্রতিবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আমরা বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে প্রতিবেদন করেছি। এ বিষয়ে এখন মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘‘তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। মেডিকেল নেগলেজেন্সি পাওয়া গেছে, আমরা বিধি অনুসারে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’’
সিজারের সময় কেন গজ-মপ থেকে যায়?
অস্ত্রোপচারের সময় সাধারণত রক্তক্ষরণ ঠেকাতে এবং ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে গজ-মপ ব্যবহার করা হয়।
একাধিক বিশেষজ্ঞের মতে, অনভিজ্ঞ ও ডিগ্রি ছাড়া যারা চিকিৎসক হন, তাদের ক্ষেত্রে এমন ভুল হতে পারে। আর এসব ভুলের কারণে পেটের ভিতরে নানা জটিলতা তৈরি হয়। তবে খুব দ্রুত শনাক্ত এবং নতুন করে অস্ত্রোপচার করা গেলে রোগী স্বাভাবিক হয়ে যায়।
এ বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের ইউনিট প্রধান ডা. খন্দকার শেহনীলা তাসমিন (সুমি) বলেন, “একজন ডিগ্রিধারী চিকিৎসক এমন ভুল করতে পারেন বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় অনভিজ্ঞ এবং ডিগ্রি ছাড়া অনেকে অস্ত্রোপচার করলে তখন এমন ভুল হতে পারে।”
একটি সি-সেকশন করতে কতজন দক্ষ জনবল প্রয়োজন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “স্বাভাবিক সিজারের ক্ষেত্রে পাঁচজন হলেই চলে। এর মধ্যে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক এবং তার সঙ্গে তুলনামূলক জুনিয়র একজন চিকিৎসক, একজন সিনিয়র নার্স, একজন সহকারী নার্স এবং আরেকজন টেকনিশিয়ান লাগে।”
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “অনেক সময় অপারেশনে প্রচুর রক্তপাত হয়, তখন অনেক গজ-মপ ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু এখানে সব সময় প্রতিটি জিনিসের হিসাব রাখা হয়। প্রধান চিকিৎসক কোনো বিষয় মনে না রাখলে পাশের জন মনে করিয়ে দেন। সেক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
“প্রান্তিক এলাকায় হয়তো এভাবে এত কিছু মেইনটেইন বা জনবল নিয়ে অপারেশন করা হয় না। তখন ভুল হতে পারে।”
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ এবং অ্যালায়েন্স হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট বিলকিস মাহমুদা বলেন, “অস্ত্রোপচারের সময় পাঁচ থেকে ছয়জন দক্ষ জনবল প্রয়োজন পড়ে। এর মধ্যে একজন থাকেন, যিনি ট্রলি সাজিয়ে দেন। সেখানে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং গজ-মবের হিসাব থাকে।
“অস্ত্রোচার শেষ হওয়ার আগে কতগুলো ব্যবহার হয়েছে এবং হয়নি, সেটির হিসাব সম্পন্ন করতে হয়। এসব বোর্ডেও লেখা থাকে। তাই ভালো চিকিৎসক এবং হাসপাতালে এমন ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।”
ভুলে গজ বা মপ থাকলে করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পেটে বা অপারেশনের জায়গায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া। এক্ষেত্রে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে জানা। তেমন কিছু হলে দ্রুত আরেকবার অপারেশন করা। তবে এটি দেরি হয়ে গেলে বিভিন্ন সংক্রমণ হতে পারে।”
আরও পড়ুন