মনিরা মিঠুকে বলা হুমায়ূন আহমেদের শেষ কথা

গাছদের সঙ্গে কথা বলতেন হুমায়ূন আহমেদ, পুরো নুহাশপল্লীকে চক্কর দিয়ে প্রতিটা গাছ স্পর্শ করতেন।

গ্লিটজ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Nov 2022, 09:21 AM
Updated : 13 Nov 2022, 09:21 AM

কেবল অভিনেত্রী মনিরা মিঠুকে মাথায় রেখে একটি নাটক বানিয়েছিলেন জনপ্রিয় লেখক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। তার বহু নাটকেই ছিল মিঠুর উপস্থিতি। তাই এ অভিনেত্রীর স্মৃতিতে হুমায়ূন আজও উজ্জ্বল।

প্রয়াত এই লেখকের জন্মদিনে মিঠুর নানা গল্পে নতুন আলোয় ধরা দিলেন হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন বেঁচে থাকলে রোববার তার বয়স হত ৭৪ বছর। ১৯৪৮ সালের এ দিনে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে জন্ম নেন হুমায়ূন। মারণব্যধি ক্যান্সারে তিনি চিরবিদায় নেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই।

তার জন্মবার্ষিকীতে গ্লিটজের কাছে স্মৃতির ডালা মেলে ধরে মিঠু বললেন ‘হুমায়ূন স্যারের’ সঙ্গে প্রথম কাজ করার গল্প।

“উনার সঙ্গে প্রথম দেখা ২০০১ সালে। ‘অপেন্টি বায়োস্কোপ’ নাটকে নতুন মুখ খুঁজছিলেন। ওই নাটকে কাজের সুযোগ পেয়ে গেলাম। আমার অভিনয় দেখে স্যার খুবই প্রশংসা করলেন। এরপর একে একে তার প্রায় সব নাটকেই আমাকে রাখতেন।”

এই অভিনেত্রীর ভাষ্য, তার কথা মাথায় রেখেই ‘বুয়া বিলাস প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের নাটকটি নির্মাণ করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।

শেষ সাক্ষাতে হুমায়ূন আহমেদের বলা শেষ কথাটি আজও মিঠুর কানে বাজে।

হুমায়ূন চিকিৎসার জন্য শেষবার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে গিয়েছিলেন তার প্রিয় নুহাশ পল্লীতে। তখন মিঠু সেখানে যান তার সঙ্গে দেখা করতে।

“স্যার তার লাইব্রেরিতে বসে ছিলেন। মনোযোগ দিয়ে নিজের বইগুলো দেখছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘ও তুমি আসছ?’ পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলাম। খুব অন্যরকমভাবে স্যার বললেন, ‘ভালো থেকো তোমরা সবাই।’

“কথাটা কলিজায় গিয়ে লাগল। স্যার মনে হয় জানতেন এটাই শেষ দেখা আমাদের। তিনি আর ফিরবেন না। শেষ কথাটা আমার এখনো কানে বাজে।”

হুমায়ূন আহমেদকে কখন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে? মিঠু বললেন, “এখন এক দিনে অনেকগুলো সিন নামাতে গেলে স্যারকে খুব মনে পড়ে। স্যারের সঙ্গে কত আরাম আয়েশে কাজ করতাম। “

হুমায়ূন কীভাবে শুটিং করতেন, সেই গল্পও বললেন মিঠু।

“দুপুরবেলায় বিশাল বড় ব্রেক দিতেন। বলতেন, ‘এখন সবাই সুইমিং পুলে নামো।’ বাচ্চাদের মত সবার সঙ্গে আনন্দ করতেন। আমরা সবাই সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতাম। মাছ ভেজে আমাদের দেওয়া হত। আমরা ভাজা মাছ খেতাম আর গোসল করতাম। স্যার সবার সঙ্গে মিশে যেতেন। বাচ্চাদের বলতেন, ‘সাঁতার শেখো।’ আমাদের বলতেন ‘সুইমিং করো সুইমিং করো’।

“দুপুরের খাওয়া সেরে লম্বা ঘুম দিতাম। সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠে স্যার কিছুক্ষণ ধ্যান করতেন। জিকির করতেন। তিনি চরম আস্তিক মানুষ ছিলেন। নুহাশ পল্লীতে সবাই মাগরিবের নামাজ পড়তাম। এরপর তিনি বলতেন, ‘লাইট রেডি করো।’ সেট রেডি করে পায়চারি করতেন। পায়চারি করতে করতে ঠিক করতেন সিকোয়েন্সটা কেমন হবে।”

হুমায়ূন আহমেদের বৃক্ষপ্রেমের পরিচয় মিলেছে তার অনেক গল্পে-নাটকে। গাছের প্রতি লেখকের ভালোবাসার কথা মিঠুর কথাতেও এল।

“তিনি সবসময় সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠতেন। নুহাশপল্লীর সবগুলো গাছের কাছে যেতেন। গাছেদের সঙ্গে কথা বলতেন।… পুরো নুহাশপল্লীকে চক্কর দিতেন। প্রতিটা গাছ স্পর্শ করতেন।

“গাছের যে প্রাণ আছে, সেটা স্যারকে দেখলে বুঝতাম। কোনো গাছ যদি নিস্তেজ হয়ে যেত, তিনি দ্রুত সেটাতে পানি দেওয়াতেন। গাছের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেন, যত্ন নিতেন। সেই গাছটা সতেজ হয়ে যেত।”  

মিঠু বলেন, “একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে। হুমায়ূন স্যার বলতেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে যা চাই তা পাই। আমি যদি খারাপটা চাই, সেটাও পাই।’ খারাপটা কতটুকু চাইতেন, কতটুকু পেতেন জানি না। কিন্তু তিনি যে সত্যিই পান তার প্রমাণ দেখেছি।”

সেই ‘প্রমাণ’ কী ছিল? মিঠু বললেন, “স্যার অনেকবার অনেকভাবে চেষ্টা করেছেন নুহাশপল্লীতে কদম গাছ লাগাতে। যতবার যেভাবেই লাগাতেন, কদম গাছ মরে যেত। নুহাশপল্লীর লাল মাটিতে কদম গাছ হত না।

“স্যারের রুমে দ্বিতীয় একটা দরজা ছিল। ওই দরজা দিয়ে পুরো নুহাশপল্লী দেখা যেত। একদিন ওই গ্লাসঘেরা দরজার সামনে বসে লিখছেন। হঠাৎ করে তার নজরে পড়ল একটা গাছের চারা। চারাটা দেখে বললেন, ‘এত সুন্দর, এটা কিসের চারা? এখানে তো কোনো গাছ হয় না?’”

ওটা ছিল মানুষের যাতায়াতের রাস্তা। মাটি খুব শক্ত। ওখানে কোনো গাছ হয় না। হুমায়ূন আহমেদ ঘর থেকে বেয়ে এসে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন।

“স্যার বললেন, ‘এটা তো কদমফুলের চারা! এখানে কেউ বোনে নাই। এখানে চারা বোনার প্রশ্নই ওঠে না। এখানে কদম ফুলের চারা হওয়ার কথা না।’ তিনি প্রচণ্ড খুশি হলেন। সবাইকে ডেকে দেখালেন। বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে এটা উপহার দিয়েছে ‘।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক