০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

চিরবিদায়ের আগে প্যারিসে তৌফিক ভাইয়ের ৫ দিন

বুঝতেই পারিনি, তার জীবনের শেষের কয়েকটি দিনের সাক্ষী হতে যাচ্ছি আমি!

চিরবিদায়ের আগে প্যারিসে তৌফিক ভাইয়ের ৫ দিন

আইফেল টাওয়ারের সামনে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে আমি।

এনায়েত হোসেন সোহেল, ফ্রান্স প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 09 Oct 2026, 11:30 AM

Updated : 09 Oct 2026, 12:33 PM

কিছু বিদায় এত নিঃশব্দে আসে যে চূড়ান্ত মুহূর্তেও বোঝার উপায় থাকে না—এটাই ছিল শেষ দেখা। ২০ সেপ্টেম্বর, রোববার। প্যারিসের স্থানীয় সময় তখন সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিট। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ঢাকা অফিস থেকে মাজহার সরকারের ফোন এলো। তিনি জানালেন, আমাদের প্রধান সম্পাদক শিগগিরই প্যারিস সফরে আসছেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আকিব জাভেদের বার্তা পেলাম। ফোনে তিনি জানালেন, প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী লন্ডন থেকে বৃহস্পতিবার ইউরোস্টারে প্যারিস পৌঁছাবেন। তিনি তৌফিক ভাইয়ের ট্রেনের টিকেটের ছবিও আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তখনো কি জানতাম, এই মানুষটির জীবনের শেষ কয়েকটি দিনের নীরব সাক্ষী হতে যাচ্ছি আমি! জানলে হয়তো প্রতিটি মুহূর্তের স্মৃতিগুলোকে অন্য কোনো অনুভূতির আবরণে সাজিয়ে রাখতাম।

২৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার: প্যারিসে আগমন ও স্মৃতির লা দিফঁস

গার দো নর্দ স্টেশনের ঘড়িতে তখন বিকেল ৫টা ৫৭ মিনিট। লন্ডন থেকে ইউরোস্টারে প্যারিসে এসে পৌঁছালেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী, সঙ্গে তার বোনের মেয়ে জয়িতা। সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে তিনি স্টেশন থেকে বাইরে বের হলেন। আমি এবং আমার সাংবাদিক সহকর্মী অধ্যাপক অপু আলম, আবু তাহের রাজু ও হাফিজুর রহমান জাবেদ তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানালাম।

দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি তার চোখেমুখে ছিল না। কুশল বিনিময়ের পর জানালেন, লা দিফঁসে তার স্মৃতিবিজড়িত ‘নভোটেল’ হোটেলে রুম বুক করা আছে। আমার পরিচিত ট্যাক্সিচালক আবু বক্করের ট্যাক্সিতে চেপে আমরা রওনা হলাম। ব্যস্ত প্যারিসের যানজট ঠেলে প্রায় ৪৫ মিনিট পর হোটেলে পৌঁছে তার বইভর্তি ভারী স্যুটকেসটি কক্ষে নামিয়ে রাখা হলো। কিন্তু হোটেলে বিশ্রাম নেওয়ার বদলে তিনি বলে উঠলেন, “চলো, আগে একটু লা দিফঁস ঘুরে দেখি।”

ত্রিশ বছর আগের প্যারিস যেন মুহূর্তেই তার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। ছাত্রজীবনে যখন প্যারিসে পড়তেন, তখন এখানকার উঁচু একটি ভবনের ১৪ তলায় থাকতেন। লা দিফঁসের প্রতিটি পথ, প্রতিটি স্থাপত্যে তার কত স্মৃতি! আমরা হাঁটতে শুরু করলাম—এক মাথা থেকে অন্য মাথায়। মনে হচ্ছিল, আমি বর্তমানের কোনো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে নয়, অতীতের আবেগপ্রবণ এক তরুণকে অনুসরণ করছি।

Image

আমি এবং আমার সাংবাদিক সহকর্মী অধ্যাপক অপু আলম, আবু তাহের রাজু ও হাফিজুর রহমান জাবেদ তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানালাম।

একেকটি ভবন দেখে থেমে গিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসছিলেন তৌফিক ভাই। চোখেমুখে শিশুসুলভ আনন্দ। এই হাঁটার ফাঁকেই পরম মমতায় আমার খোঁজখবর নিলেন—প্যারিসে কত বছর আছি, দেশে কোন কোন গণমাধ্যমে কাজ করেছি, কীভাবে সাংবাদিকতায় এলাম। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব না রেখে খুব অল্প সময়েই অদ্ভুত মায়ায় আমাকে আপন করে নিলেন।

মার্কেটের একটি ফাস্টফুডের দোকানে বসে খাওয়া শেষে তিনি তার প্যারিস সফরের কর্মসূচির কথা জানালেন। শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে আমি ‘গ্র্যান্ড মসজিদ দ্য প্যারিস’-এর ঠিকানা ও যাতায়াতের বিবরণ তার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিলাম। গভীর রাতে মেট্রো ১ ও ৬ ধরে আমরা পৌঁছলাম নৈশালোকে উদ্ভাসিত আইফেল টাওয়ারের সামনে। রাত প্রায় ১১টা পর্যন্ত সেখানে ঘুরে টুকাডেরো মেট্রো স্টেশনে ফিরলাম। আমি হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে না করে দিলেন। রাতে তিনি নিজে মেসেজ পাঠিয়ে হোটেলে পৌঁছানোর খবর নিশ্চিত করলেন।

২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার: বই, বার্তা ও সংযোগ

শুক্রবার দিনটি তিনি তার মতো করে কাটালেন। রাতের দিকে তার সঙ্গে আবার কথা হলো। জানালেন, সব কাজ সুন্দরভাবে এগোচ্ছে। ঢাকা থেকে সঙ্গে করে আনা সেই বিশাল স্যুটকেসটিতে মূলত ছিল প্যারিসের সাংবাদিক বন্ধুদের জন্য উপহার—‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ গ্রন্থের তিন খণ্ড। সংবাদের গণ্ডি পেরিয়ে একজন সম্পাদক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন বই, স্মৃতি এবং প্যারিসের প্রতি টান।

২৬ সেপ্টেম্বর, শনিবার: পুরনো বন্ধুদের সান্নিধ্য

শনিবার দুপুরে প্যারিসের একটি রেস্তোরাঁয় সাংবাদিকদের সম্মানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন তৌফিক ভাই। সেখানে তার পুরনো বহুদিনের বন্ধুরা উপস্থিত ছিলেন। মূলত এই পুনর্মিলনীর উদ্দেশ্যেই তার প্যারিস সফর। রাতে টেলিফোনে আমাকে জানালেন, অনুষ্ঠানটি চমৎকার হয়েছে। অনেক দিন পর পুরোনো সহকর্মীদের কাছে পেয়ে সময়টা ভীষণ উপভোগ করেছেন।

কথা প্রসঙ্গে বললেন, রোববার দুপুরে সুইজারল্যান্ড থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক সহকর্মী অমি রহমান পিয়াল তার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন, তাই বিকেলে আমার সঙ্গে আবার দেখা হবে। আর রাতে ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত খন্দকার মোহাম্মদ তালহার বাসভবনে নৈশভোজের নিমন্ত্রণ রয়েছে।

Image

তৌফিক ভাই ও তার বোনের মেয়ে জয়িতা। ছবিটি আমিই তুলে দিয়েছি।

২৭ সেপ্টেম্বর, রোববার: শেষ বিকেলের স্মৃতি ও প্রস্থান

রোববার বিকেল ৪টার দিকে খালিদী ভাই ফোন করে আমাকে হোটেলে ডাকলেন। ৫টার দিকে নভোটেল হোটেলের লবিতে বসে কফির কাপের ধোঁয়া ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো আমাদের দীর্ঘ আলাপ। ফ্রান্সে বাংলাদেশের সামগ্রিক কল্যাণে প্রবাসীদের অবদান, দেশের রাজনীতি এবং সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা নিয়ে তিনি তার চিন্তাভাবনা প্রকাশ করলেন। প্রবাসীদের অবদানের সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় তার কণ্ঠে ক্ষোভ ছিল, তবে সে ক্ষোভের অন্তরালে ঢাকা ছিল দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

রাত সাড়ে ৮টায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত খন্দকার মোহাম্মদ তালহা তাকে নিতে এলেন। খালিদী ভাই রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “সোহেল। বিডিনিউজের ফ্রান্স করেসপন্ডেন্ট।” রাত ৯টার দিকে রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে বিদায়বেলায় স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, “সোহেল, দেশে গেলে অফিসে এসো। প্যারিসের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি জড়িত, আবার আসব। নিয়মিত নিউজ পাঠাবে, দরকার হলে ফোন কোরো।” কত সাধারণ ছিল এই কথাগুলো! অথচ আজ মনে হয়, প্রতিটি শব্দের খাঁজে লুকিয়ে ছিল অনিবার্য এক বিদায়ের করুণ সুর।

২৮ সেপ্টেম্বর, সোমবার: শেষ ফোনালাপ ও অন্তিম বার্তা

সোমবার বিকেল ৩টার দিকে তাকে পর পর দুবার ফোন করলাম। প্যারিসের বিকেলের যানজটের কথা ভেবে গার দো নর্দ থেকে সন্ধ্যা ৭টা ২৪ মিনিটের ইউরোস্টার ধরার জন্য তাকে একটু আগেই বের হওয়ার তাগিদ দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তিনি ফোন ধরতে পারলেন না। সন্ধ্যা ৭টার দিকে নিজেই ফোন করে জানালেন, রাস্তায় প্রচণ্ড যানজটে আটকে আছেন। ট্রেন মিস হওয়ার আশঙ্কার কথা জানালে বললেন, “দেখি কী হয়।” এটিই ছিল তার সাথে আমার শেষ ফোনালাপ। পরবর্তীতে রাত ১২টা ২৭ মিনিটে তার সংক্ষিপ্ত বার্তা এলো—“Arrived in London. Thank you for everything.” আমি বুঝতেই পারিনি, এটাই আমাদের সম্পর্কের শেষ লিখিত বাক্য হতে যাচ্ছে।

শেষের কয়েক দিন: কিংবদন্তির চিরবিদায়

তারপরের কয়েকটা দিন মাত্র। যার সঙ্গে প্যারিসের রাজপথে হাঁটলাম, কফি খেলাম, দেশের রাজনীতি ও সাংবাদিকতা নিয়ে কথা বললাম, আইফেল টাওয়ারের রূপ দেখলাম—তিনি আর নেই। কত দ্রুত, কত অপ্রস্তুতভাবে এবং কত নিঃশব্দে চলে গেলেন! লন্ডনে ফিরে যাওয়ার দুইদিন পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সেইন্ট বার্থোলোমিউজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে ২ অক্টোবর স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাস ও অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অবদান চিরস্মরণীয়। তিনি কেবল একটি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করেননি, পুরো দেশের সংবাদপাঠের অভ্যাসে যুগান্তকারী বিপ্লব এনেছিলেন। ডিজিটাল সাংবাদিকতাকে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি।

প্যারিসের রাতগুলো আজও আগের মতো আলো ঝলমলে। লা দিফঁসে আলো জ্বলে, গার দো নর্দে ট্রেন আসে-যায়, টুকাডেরোর পথগুলো একই রকম আছে। কেবল নেই সেই মানুষটি, যিনি বলেছিলেন, “আবার আসব।” তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে রয়ে যাবে সেই শেষ ৫ দিনের স্মৃতি। আল্লাহ, তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে ক্ষমা করুন, তার কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।