গান যখন বিদ্বেষ ছড়ানোর হাতিয়ার

ভারতে ইউটিউবসহ সোশাল মিডিয়ায় মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর মতো গান চলছে দেদারসে।

গ্লিটজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 August 2022, 05:06 AM
Updated : 13 August 2022, 05:06 AM

সন্দীপ চতুর্বেদী প্রস্তুতি নিচ্ছেন তার নতুন একটি গান রেকর্ডের। ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা শহরে নিজের বানানো স্টুডিওতে রেকর্ড হবে সেই গান।

২৬ বছর বয়সী এই যুবকের এই গান একটি মসজিদকে নিয়ে, হিন্দুরা সেখানে প্রার্থনার অধিকার দাবি করার পর যেটি উঠে এসেছিল আলোচনার কেন্দ্রে। এই গানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচ্ছন্ন উস্কানি রয়েছে, কিন্তু এই গানের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক সাফল্যে ফিরে আসার পথ দেখছেন চতুর্বেদী।

ভারতে ইউটিউব আর অন্যান্য সোশাল মিডিয়ায় কট্টর হিন্দুদের মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর যে চল দেখা যাচ্ছে, চতুর্বেদীর গান তার একটি উদাহরণ মাত্র।

এসব গানের কথায় রয়েছে অবমাননা অথবা হুমকি। হিন্দুরা শত শত বছর মুসলমানদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, এখন তার বদলা নেওয়ার পালা- এমন বক্তব্যই গানগুলোর উপজীব্য।

অর্থ উপার্জন করা যাচ্ছে বলে শিল্পীরা এখন এ ধরনের গান করছেন বলে মনে করছেন লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়; যদিও তার মতে, এগুলো আদতে কোনো গানই নয়।

তিনি বলেন, “এসব মূলত যুদ্ধের হুংকার। যুদ্ধে জেতার জন্য গানের ব্যবহার। তবে গানের অপব্যবহারই এসব; যা চলে আসছে অনেক বছর ধরেই।”

চতুর্বেদীর ক্যারিয়ারের শুরু হয়েছিল ভক্তিমূলক গান দিয়েই; সে প্রায় ১০ বছর আগের কথা। এরপর তিনি পরিকল্পনা বদলান, সিদ্ধান্ত নেন যে গান লিখবেন ‘হিন্দুত্ববাদ ও জাতীয়তাবাদ’ নিয়ে। নিজের পরিচিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতেই এসব করছিলেন বলে জানালেন তিনি।

২০১৬ সালে চতুর্বেদীর নির্মিত একটি মিউজিক ভিডিও রাতারাতি সাফল্য এনে দিয়েছিল তাকে। কারণ হিন্দু জাতীয়বাদীদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল তার ওই মিউজিক ভিডিও।

সেই গানের কথা ছিল বেশ উস্কানিমূলক। যদি হিন্দু জাতীয়তাবাদ উঠে দাঁড়ায় তবে মুসলমানদের কী হবে, সেই হুমকি সরাসরিই উঠে এসেছিল সেই গানে।

ইউটিউবে চতুর্বেদীর চ্যানেলে সেই মিউজিক ভিডিও দেখেছিলেন লাখ লাখ মানুষ। তবে এরপর হাজার হাজার অভিযোগে ইউটিউব চ্যানেলটি খোয়াতে হয়েছে তাকে। চতুর্বেদী অবশ্য মুসলমানদেরই দায়ী করছেন তার মিউজিক ভিডিও নিয়ে ‘রিপোর্ট’ করার জন্য।

ইউটিউব চ্যানেলের লাখ লাখ সাবস্ক্রাইবার হারিয়ে আক্ষেপও করলেন তিনি; যদিও ইউটিউব চ্যানেল থেকে তার কত আয় হত, সে কথা খোলাসা করেননি তিনি।

একটি মিউজিক ভিডিও বানাতে ২০ হাজার রুপির মতো খরচ হয় বলে জনালেন চতুর্বেদী।

“আমি ইউটিউব থেকে খুব বেশি আয় করতে পারিনি। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে আমি জাতীয়তাবাদী-বিপ্লবী গায়ক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলাম।”

আগেরটি হারানোর পর চতুর্বেদী নতুন একটি চ্যানেল খোলেন ইউটিউবে। তবে নতুন চ্যানেলে তোলা গানে এখনও আশাব্যঞ্জক ‘ভিউ’ তিনি পাননি। তবে আশা করছেন, নতুন গান তোলার পর এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।

মুসলমানদের উদ্দেশে গান বানানো নিয়ে অনেক অভিযোগ থাকলেও তা নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই চতুর্বেদীর।

তিনি বলেন, “আমার অধিকার ফিরে পেতে আমি যদি দুই হাত জুড়ে অনুনয় করি, তবে কি কেউ দেবে? নিশ্চয়ই না। সুতরাং আমাদের ছিনিয়ে নিতে হবে, তাই না?”

দিল্লির কাছে দাদরি থেকে একই ধরনের গান করছেন উপেন্দ্র রানা।

তার লক্ষ্য ইতিহাস ‘শোধরানো’। উপেন্দ্র রানার গানে হিন্দুযোদ্ধাদের বিজয়ের কথা বলা আছে। মুসলিম শাসকরা সেখানে রয়েছে খলনায়কের ভূমিকায়।

স্কুলজীবনে যে ইতিহাস পড়ানো হত, সেসব নিয়ে উপেন্দ্র রানা বলেন, “অনেক কিছু সত্যি হলে তা আমাদের থেকে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। আর মিথ্যার ঝুলি আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”

ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করে ভালোই আয় হয় রানার। “আমরা ভারতে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসছি। ইউটিউব ডলারে অর্থ দিচ্ছে।”

দেয়ালে ঝোলানো ইউটিউব থেকে পাওয়া সিলভার প্লে বাটন দেখালেন রানা। এর পাশে রয়েছে হিন্দুত্ববাদ সমর্থকদের সঙ্গে অনেক ছবি।

‘ঐতিহাসিক’ ছাপ ধরে রেখে রানা এখন ভক্তিমূলক ও রোমান্টিক গান নিয়ে কাজ করছেন। দাদরিতে তিনি বেশ জনপ্রিয়ও হয়ে উঠেছেন।

ইউটিউবে চার লাখের কাছাকাছি সাবস্ক্রাইবার আছে তার। তার অনেক গানেই রয়েছে লাখ লাখ ভিউ।

রানা বললেন, একটি মিউজিক ভিডিও বানাতে ৮ হাজার রুপি খরচ হয় তার। তার নিজেরই রেকর্ড ও এডিট করার ব্যবস্থা রয়েছে। ক্যামেরাম্যান ও একজন এডিটর নিয়ে একটি টিমও রয়েছে তার।

নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, সংগীতকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার অতীতেও হয়েছিল।

১৯৮৯ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অযোধ্যায় রামমন্দিরের ভিত্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির কথা মনে করিয়ে দেন তিনি, যার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে।

“ওই ঘটনার ঠিক আগে আগে অডিও টেপের ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাতে ধর্মীয় গান ছিল এবং ছিল উস্কানিমূলক স্লোগান। সেসব স্লোগানে রামের জন্মভূমি নিয়ে বলা হত (হিন্দুরা বিশ্বাস করে অযোধ্যা রামের জন্মস্থান)। এসব টেপ চালিয়ে মানুষকে জড়ো করা হত।”

তিন দশক ধরে এসব ‍কণ্ঠ আরও চড়া হয়ে উঠেছে।

‘যদি ভারতে থাকতে চাও তবে বন্দে মাতরম বলা শিখে নাও’, ‘নিজের সীমার মধ্যে চলা শিখে নাও’ অথবা ‘হিন্দুদের দুর্বল ভাবা শত্রুদের প্রধান ভুল’- এমন কথা কাদের উদ্দেশে, তা বুঝতে কারও অনুবিধা হওয়ার কথা নয়।

এ ধরনের গান ডান রাজনীতিকদের সমর্থক গোষ্ঠীকে একাট্টা করতেও কাজে দিচ্ছে।

ডানপন্থি হিন্দু রক্ষা দলের প্রধান পিংকি চৌধুরী মনে করেন, “তরুণরা এসব গান পছন্দ করে। কারণ এসব তাদের উৎসাহ ও মনোবল বাড়ায়।”

পিংকি চৌধুরীর ভাষ্যে, এ ধরনের গান তরুণদের মধ্যে ‘সচেতনতা’ গড়ে তোলে।

“এমন গান শোনার সময় আমার ভেতরে আমি প্রচণ্ড শক্তি অনুভব করি। এগুলো মনে করিয়ে দেয়, এক সময় আমরা কতকিছুর শিকার হয়েছিলাম আর এখন আমরা কোথায় আছি”, বললেন বিজয় যাদব।

২৩ বছর বয়সী যাদব পড়ছেন ভারতের জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ললিতকলা একাডেমিতে, চিত্রশিল্পে।

এপ্রিলে হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবের সময় যখন বিভিন্ন রাজ্যে সংঘর্ষ দেখা দিয়েছিল, তখনই সম্ভবত যাদবের এই কথা প্রচার পেয়েছিল।

ওই সময়ের সংঘর্ষে মুসলমান অধ্যুষিত এলাকার দিকে হিন্দুদের অগ্রসর হওয়ার সময় লাইডস্পিকারে উস্কানিমূলক গান বাজানো হত।

চতুর্বেদীসহ আরও অনেকের উত্তেজক গান সংঘাতের আগুনে ঘি ঢেলেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

যদিও চতুর্বেদী তা শিকার করতে নারাজ।

তিনি বলেন, “আমি তো গানের মধ্যে দিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে চাইছি। ভালোবাসা দিয়ে কিছু আসে না। আমাদের যুদ্ধ করতে হবে, যা আমাদের তা ছিনিয়ে নিতে হবে।”

[বিবিসির প্রতিবেদন অবলম্বনে]

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক