‘আয়েগা আনেওয়ালা’ থেকে 'লুকা ছুপি', মাঝে ৫৭ বছর, অথচ লতা একই নিষ্ঠায়

নামি-দামি সব নায়িকাই চাইতেন, পর্দায় তাকে যে গানটি গাইতে দেখা যাবে, তাতে যেন লতাজির কণ্ঠ থাকে।

সারাহ সাদিয়াবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 Sept 2022, 12:09 PM
Updated : 28 Sept 2022, 12:09 PM

বেঁচে থাকলে এদিন তার বয়স হত ৯৩; প্রবাদপ্রতীম শিল্পী, আইকন, নাইটিঙ্গেল, এই সব অভিধা তার সঙ্গেই যায়, তিনি লতা মঙ্গেশকর। তার কণ্ঠের জাদু ঘুচিয়ে দিয়েছিল দেশকালের সীমানা, আর ভাষার ব্যবধান। 

বলা হয়, শুধু কণ্ঠ নয়, সংগীতের প্রতি ভক্তি-অনুরাগের অসীম মাত্রাই এই কিংবদন্তি ধরে রেখেছিলেন জীবনভর, যে গুণেই দীর্ঘ সাত দশক ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতভক্তদের তিনি বেঁধে রাখেন সুরের মায়ায়।

পৃথিবীর মায়াজাল ছিড়ে এবছরেই ৬ ফেব্রুয়ারি চিরবিদায় নেন লতা, মৃত্যুর পর তার প্রথম জন্মদিন বুধবার তার বিহনেই কাটল। 

লতার জন্মদিনে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তুলে এনেছে তার বিপুল সংগীতভাণ্ডারের দুটি গানের কথা। তাতে জানা গেল সেই দুই গান নিয়ে লতাজিকে ঘিরে সঙ্গীত পরিচালকদের অভিজ্ঞতা।

একজন প্লেব্যাক সিঙ্গার লতা মঙ্গেশকরই ভারতের চলচ্চিত্রের অঙ্গন শাসন করেছেন বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। যার কারণে তিনি হয়ে ওঠেন বলিউডের ‘নাইটিঙ্গেল’। যুগে-যুগে নামি-দামি সব নায়িকাই চাইতেন, পর্দায় তাকে যে গানটি গাইতে দেখা যাবে, তার পেছনে যেন লতাজি থাকেন।

১৯৪৯ সালে ‘মহল’ সিনেমার ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি গাওয়ার ৫৭ বছর পরও ২০০৬ সালে ‘রং দে বাসন্তি’ সিনেমার ‘লুকা ছুপি’ গানটি রেকর্ডিংয়ের সময়ও দেখা গিয়েছিল তার সমান নিষ্ঠা।

‘আয়েগা আনেওয়ালা’ লতাকে এনে দেয় পরিচিতি। কিন্তু সেই খ্যাতিপ্রাপ্তির পেছনে আছে এই শিল্পীর অধ্যবসায়ের অসামান্য এক গল্প।

১৯ বছর বয়সে এই গানটি করেছিলেন লতা। সিনেমায় একটি  অপার্থিব পরিবেশের জন্য গানটির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মুশকিল হল, চল্লিশের দশকে প্রযুক্তি এতটা উন্নতা ছিল না যে শিল্পীর গলাকে সে ধরনের অপার্থিব একটি কণ্ঠে রূপান্তর করে ফেলবে।

বিষয়টি লতা ভালোই বুঝেছিলেন। তিনি নিজের মতো একটি পরিকল্পনা নেন। লতা ঠিক করেন, এমনভাবে গানটি রেকর্ড করা হবে যেন শুনে মনে হয়, অনেক দূর থেকে কোনো গান ভেসে আসছে। তিনি স্টুডিতে মাইক্রোফোনটি মাঝখানে রাখেন, আর নিজে চলে যান ঘরের কোণে।

প্রযোজক, পরিচালক ও লেখক নাসরিন মুন্নি কবীরের লেখা বইতে গানটি সৃষ্টির কথা লতার স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। লতা বলেন, “প্রথম স্তবক গাইতে গাইতে আমি ধীরে ধীরে মাইক্রোফোনের দিকে এগোলাম, যখন পৌঁছে গেলাম, তখন গানের মাঝামাঝি অংশে। বেশ কয়েকবার এভাবে গাওয়ার পর অবশেষে গানটি রেকর্ড করা হয়।”

গান রেকর্ডের এই ধরনের প্রক্রিয়া সে সময়ে একেবারেই অভিনব ছিল। ‘মহল’ সিনেমার পরিচালক কামাল আমরোহী এবং সংগীত পরিচালক খেমচাঁদ প্রকাশ বেশ দুশ্চিন্তাতেই ছিলেন। তাদের সংশয় ছিল, যেমন আবহ প্রয়োজন গানটির ক্ষেত্রে আদৌ সেটি এই পদ্ধতিতে রেকর্ডিংয়ে মিলবে কি না? পরে অবশ্য তাদের সেই দ্বিধা ভয় কেটে যায়।

লতার ভাষায়, “অসাধারণ একটি অভিজ্ঞতা ছিল। সারাদিন  লেগে যায় গান রেকর্ডে। পরিচালক কামাল আমরোহী সাহেব বুঝতে পারেন গানটিকে কীভাবে তার সিনেমায় ওই বিশেষ দৃশ্যের জন্য দৃশ্যায়ন করবেন।”

এই গানটির পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি লতাকে। ওই সিনেমাটি ১৬ বছরের মধুবালা ও ১৯ বছরের লতা, দুজনের জন্যই ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। নায়িকা ও গায়িকার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে ওই সিনেমার পর। সেই পথ ধরেই লতার কণ্ঠ হয়ে ওঠে বলিউডের ‘গোল্ডেন ভয়েস’।

এই ঘটনার প্রায় ছয় দশক পর ২০০৬ সালে বলিউডের পরিচালক রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা বড় পর্দার জন্য আনেন ‘রং দে বাসন্তি’। ওই সিনেমায় সংগীত পরিচালক এ আর রেহমানের ‘লুকা ছুপি’ গানটি গেয়ে যথারীতি মাত করেন লতা। হৃদয়স্পশী কথা ও সুরের গানটি যখন রেকর্ড করেন লতা, তখন তিনি বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কিন্তু গানের প্রতি নিষ্ঠা ও একাগ্রতায় ঘাটতি দেখা যায়নি একবিন্দুও।

রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা বলেন, রং দে বাসন্তির জন্য লতাজি যখন গাইতে আসলেন, তারও বহু বহু বছর আগে থেকেই তার খ্যাতি বিশ্বজোড়া।

“রেকর্ডের আগে রির্হাসেলের জন্য লতাজি সময় দিয়েছিলেন চার দিন। এত উঁচু দরের একজন শিল্পী ঠিক সময়ে স্টুডিওতে আসছেন এবং মহড়ায় অংশ নিচ্ছেন, বিষয়টি আমার জন্য ভীষণ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। রেকর্ডের দিন স্টুডিওতে তার জন্য ফুল, পানি ও চেয়ারের ব্যবস্থা রাখি। কিন্তু লতাজি ঠায় চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে গানটি রেকর্ড করেন।”

গীতিকার গুলজার বলেন, “আমার মনে আছে আমি লতাজিকে বলেছিলাম, আপনি যখন অটোগ্রাফ দেবেন তখন ‘মেরি আওয়াজ হি পেহচান হ্যায়’ (গানের কলি) ব্যবহার করতে পারেন। আমি ভাবতে পারিনি, আসলে গানের এই কলিটি তার আজীবনের পরিচয় হয়ে উঠবে।”

স্মরণে লতা

১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গুজরাটি মা আর মারাঠি বাবার ঘরে ভারতের ইন্দোরে জন্মেছিলেন লতা। তার নাম রাখা হয়েছিল হেমা। তবে মৃত বড় বোনের নাম লতিকা হওয়ায় তার নাম হয়ে যায় লতা।

লতার বাবা দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন মারাঠি থিয়েটারের অন্যতম পুরোধা একজন ‘ক্লাসিক্যাল’ শিল্পী। তার কাছেই লতা মঙ্গেশকরের গান শেখার শুরু।

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে লতা ছিলেন সবার বড়। তিন বোন আশা ভোঁসলে, ঊষা মঙ্গেশকর, মীনা মঙ্গেশকর আর ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরও পরে সংগীত জগতে নাম কুড়িয়েছেন।

৪০ এর দশকের শুরুতে সেই সময় চলচ্চিত্রে গান খুব বেশি ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরা লতা জীবিকার জন্য অভিনয়ও শুরু করেন। আটটি মারাঠি এবং হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করেন।

পাশপাশি ওস্তাদ আমান আলী খানের কাছে ক্লাসিকাল শিখতেন লতা। ১৯৪৩ সালে মারাঠি সিনেমা গাজাভাউতে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে তার সংগীত শিল্পী হিসেবে।

Also Read: লতা মঙ্গেশকর: একজন প্রবাদপ্রতিম শিল্পী, একজন আইকন

পরের দশকগুলোয় পাকিজা, মজবুর, আওয়ারা, মুঘল ই আজম, শ্রী ৪২০, আরাধনার মতো চলচ্চিত্রগুলোতে জনপ্রিয় সব গান গেয়েছেন তিনি। চল্লিশের দশকের মধুবালা থেকে ১৯৯০ সালের কাজল পর্যন্ত সব শীর্ষ নায়িকাদের জন্য গান করেছেন লতা। মহম্মদ রফি ও কিশোর কুমারসহ বহু পুরুষ গায়কদের সঙ্গে তার ডুয়েট রয়েছে।

রাজ কাপুর ও গুরু দত্ত থেকে শুরু করে মণি রত্নম, গুলজার ও করণ জোহর পর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় প্রত্যেক বলিউড পরিচালক কাজ করেছেন এই গুণী শিল্পীর সঙ্গে।

নিজের বোন আশা ভোঁসলের সঙ্গেও প্লেব্যাকে গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। একটা পর্যায়ে তাদের ক্যারিয়ার চলেছে প্রায় সমান্তরালে। তবে তাদের মধ্যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে লতার ঝুলিতে জমেছে ৩৬ ভাষায় অসংখ্য ঘরানার অন্তত ৩০ হাজার গান। কণ্ঠ দিয়েছেন এক হাজারের বেশি সিনেমায়।  বাংলা সিনেমাতেও প্রায় ২০০ গান রয়েছে লতার। ভারতে সবচেয়ে দামি শিল্পীও ছিলেন তিনি।

সংসারে না জড়িয়ে একাকী কাটিয়ে দেওয়া লতা তার ক্যারিয়ারে যত পুরস্কার আর সম্মানে ভূষিত হয়েছে, তার কেবল শুরু আছে শেষ নেই। ২০০১ সালে লতা মঙ্গেশকর ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ভারতরত্ন অর্জন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান।

সবচেয়ে বেশি গানে কণ্ঠ দেওয়ার সুবাদে ১৯৭৪ সালে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও তার নাম ওঠে।

২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জাগতিক ভ্রমণ শেষ করেন এই শিল্পী। কোভিডে আক্রান্ত হয়ে প্রায় চার সপ্তাহ মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসায় ছিলেন শিল্পী। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে আর তার ঘরে ফেরা হয়নি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক