Published : 25 Jul 2025, 04:30 PM
ঢাকার মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহীম মিলনায়তনের মঞ্চ যেন ছোট্ট একটি বনাঞ্চল। জলাশয়, গাছ-লতাপাতা, ফুল দিয়ে তৈরি মঞ্চে ছোট শিশুরা দৌড়ঝাঁপ করছে। কেউ সেজেছে খরগোশ, কেউ বা মৌমাছি হয়ে উড়ছে। কাউকে কাউকে আবার শাখামৃগের মত লাফঝাঁপ দিতেও দেখা গেল।
এভাবেই চলছিল মঞ্চ নাটক 'বনের ধারে নদী' নাটকের অনুশীলন।

শিশু-কিশোরদের নিয়ে অভিনেত্রী-নির্দেশক আফসানা মিমির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান 'ইচ্ছেতলা' মঞ্চে আনছে তাদের প্রথম প্রযোজনা, নাটক ‘বনের ধারে নদী’। যে প্রতিষ্ঠান মিমি গড়ে তুলেছেন কেবল শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করার জন্য।
শুক্রবার মহিলা সমিতি মিলনায়তনে নাটকটি মঞ্চস্থ হতে চলেছে। নাটকের দুইটি শো রাখা হয়েছে; একটি বিকেল সাড়ে ৫টায়, দ্বিতীয়টি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়।
'বনের ধারে নদী' নাটকে অভিনয় করেছে প্রায় ৪০ জন শিশু-কিশোর; যাদের বয়স ৪ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে।
মহিলা সমিতিতে এক বিকেলে নাটকের অনুশীলন চলার সময় সেখানে উপস্থিত হয় গ্লিটজ টিম। মিলনায়তনে প্রবেশ করেই চোখ পড়ে মঞ্চের এক পাশে বসে শিশু-কিশোরদের অভিনয় নিয়ে কথা বলছেন আফসানা মিমি। যিনি তার অভিনয় শিল্পী বাহিনীর কাছে পরিচিত ‘খালামণি’ নামে। আর কিছু শিশু তখন দর্শক সারিতে বসাও ছিল। সবার চোখ খালামণি মিমির দিকে। কখন কার ডাক পড়ে এই অপেক্ষায় ছিল তারা।
মিমি ডাক দিলেন “আমার খরগোশ দুইটা কই? আয় তো দেখি"
ডাক শুনে মঞ্চে ছুটে আসে আনন্দ আর আইজা নামের দুই ক্ষুদে শিল্পী। তারা খালামণির সামনে অভিনয় করে দেখাল খরগোশ কীভাবে চলে।
তা দেখে মিমি বলেন, "আমার খরগোশ বাচ্চা দুইটা তো অনেক সুন্দর করে খরগোশ হয়ে দেখাল।"

মিমি গ্লিটজকে বলেন "এবার একটু দেখি মৌমাছি কীভাবে বেড়ায়? সাথে সাথেই মঞ্চে উঠে মৌমাছির উড়ে বেড়ানো দেখাল বাহিজাহ্ নামের পাঁচ বছরের এক শিশু।"
বাকি শিশুশিল্পরাও একটু পরপর জিজ্ঞেস করছে খালামণি আমি কখন মঞ্চে যাব, ফিরে তাকিয়ে মিমি আশ্বাস দিয়ে বলেন, 'তোরাও যাবি। অপেক্ষা কর।'
একে একে মঞ্চে উঠে শিশুরা ফুল, প্রজাপতি, বানর, পাখি, ব্যাঙ, মাকড়সা, নেকড়ে, হাতি চরিত্রের রূপ নেয়। এরপর শুরু হয় নাটকের মূল অনুশীলন। মঞ্চ ছেড়ে দর্শক সারিতে বসেন মিমি। ক্ষুদে অভিনয় শিল্পীরা তখন পুরো নাটকটা অভিনয় করে দেখায়।
অনুশীলনে কেবল শিশু-কিশোরদের অভিনয়ের দিকটাই মিমি দেখিয়ে দিচ্ছিলেন তা নয়। কে পানি খাবে, কার কি প্রয়োজন, সিড়িটা বাঁকা হয়ে তাদের চলাচলে সমস্যা করছে কি না, সবকিছুতে চোখ রাখছিলেন তিনি।

শিশুদের এত প্রশ্ন, এত আবদার সামলাচ্ছেন কীভাবে প্রশ্নে এক গাল হাসি দিয়ে মিমি বলেন, "বাচ্চাদের মধ্যে এমন জাদু আছে যা দিয়ে তারা মন জয় করে নেয়। তারা কিন্তু আমার বকুনিও খায় আবার আহ্লাদও পায়। তাদের প্রতিটা ইচ্ছা, চাওয়াকে আমি সম্মান করি, এই আবদার করতে করতেই তারা দুর্দান্তভাবে এই নাটকটা নিজেদের মধ্যে তুলে নিবে।"
ইচ্ছেতলা প্রতিষ্ঠানের বয়স প্রায় এক দশক ছুঁতে চলেছে। কিন্তু প্রযোজনায় এতটা দেরি কেন জানতে চাইলে মিমি বলেন, "আমরা শুরু করেছিলাম ২০১৬ সালে। আমরা যখন পাঁচ বা ছয় বছরে পা দিলাম, সব কিছু গুছিয়ে উঠতে শিখলাম তখন কোভিড মহামারী চলে আসে। তারপর তো সব স্বাভাবিক হতে দুই তিন বছর লেগে যায়।
"আমরা আবার একত্রিত হই, নাটকটি অনুশীলন করে মঞ্চে তুলি। কিন্তু সেখানে কেবল তাদের পরিবার উপস্থিত ছিল। এরপর যখন নাটকটি দর্শকের সামনে নিয়ে আসার ইচ্ছা হল তখন আমার বাবার অসুস্থতা, মৃত্যু সব মিলিয়ে এই দশ বছর সময় পার হয়ে গেল। এখন মনে হল নাটকটি যদি সবাইকে এখন দেখানো না যায় তাহলে বাচ্চারা বড় হয়ে যাবে আর দেখানো হবে না।"

এই নাটকটি কেবল মঞ্চে আটকে থাকবে না। চ্যানেল আইয়ের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আইস্ক্রিনের জন্যও নির্মাণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন মিমি। নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার পর শিগগিরই এটার দৃশ্যধারণ করে ওটিটিতে দেওয়া হবে।
‘বনের ধারে নদী’ নাটকের গল্প নিয়ে মিমি বলেন, "নাটকের গল্প একটা বন ও নদী নিয়ে। যেখানে পশুপাখির বসবাস। মানুষের বন দখল, নদী দখল করে সেটা দূষিত করা সেটা নিয়েই এক বার্তা দেওয়া হবে।
মিমি বলেন, "বাচ্চারা বড় হয় এই জগৎ সংসার দেখতে দেখতে, বুঝতে বুঝতে বড় হয়। নদী দূষণ করা যাবে না, চারপাশ নোংরা করা যাবে না, বনের পশুটা তার মত করে বনে থাকবে, মানুষ হয়েছি বলে সব কিছু দখল করে নিতে হবে-এই শিক্ষাটা যেন তারা না পায় বরং তারা যেন বুঝতে শিখে এই পৃথিবীটা সকলের। প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্বটা যেন তারা নিতে পারে সেই বার্তা দিতেই এই নাটকটি করা।"

‘বনের ধারে নদী’ নাটকে শিশু-কিশোররা কেমন কাজ করেছে, ওদের মধ্যে কোনো ভয় কাজ করেছে কী?
জবাবে মিমি বলেন, "না, ভয় কাজ করছে না। বাচ্চারা আনন্দ নিয়ে নাটকটি তুলেছে, এই আনন্দটা তারা দর্শকের সামনেও তুলে ধরবে। ইচ্ছেতলা কখনো পারফেকশন নিয়ে মাথা ঘামায় না, ওরা যা করবে তাই সুন্দর। "
নাটকে হাতি চরিত্রে অভিনয় করা মোহাম্মদ আনাস উল্লাহ জানিয়েছে, এই চরিত্রে অভিনয় করতে তার খুবই ভালো লাগছে।
“সামনাসামনি কয়েকবার হাতি দেখেছি, তাদের শুড় দিয়ে পানি খাওয়া দেখতে খুব ভালো লাগে। আমার চরিত্রটি হল ক্ষমতা থাকলেই সেটার অপব্যবহার করা যাবে না, এই দিকটি তুলে ধরছে”
জারিরা শফিক বাহিজাহর কথায়, "আমার মৌমাছি হতে পেরে বেশ ভালো লাগছে।"
নাটকে 'দেবী' চরিত্রে অভিনয় করেছেন ১৪ বছর বয়সী নুসাবা মুনযারিন যারা।
চরিত্রটি নিয়ে যারা বলেন,"নাটকে সবাইকে শান্তির বার্তা দিচ্ছি। আমি নিজে যেমন প্রকৃতি নিয়ে সচেতন থাকি , পশু-পাখিদের প্রতি মায়া রাখি তেমন যেন সবাই এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয় সেটাই করার চেষ্টা করেছি।

নাটকটি রচনা করেছেন সৌমিত্র বসু, নির্দেশনা দিয়েছেন মো. ফরহাদ আহমেদ। মঞ্চ ও আলোক নির্দেশনায় সাইফুল ইসলাম, সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন দেবাশীষ দেব, যন্ত্র সঙ্গীতে জিয়াউর রহমান ও তনুশ্রী বিশ্বাস।
দুই ক্যাটাগরিতে পাওয়া যাচ্ছে টিকেট, মূল্য ধরা হয়েছে ৫০০ টাকা ও ১০০০ টাকা।
নাটকটি নিয়ে নির্দেশক ফরহাদ বলেন,"বাচ্চাদের মাধ্যমে বর্তমান সমাজের অবক্ষয়, দেশটা ,পৃথিবীটা সুন্দর রাখার বার্তা আমরা নাটকে দিচ্ছি।"
‘ইচ্ছেতলা’ কী?
‘ইচ্ছেতলার’ কর্ণধার আফসানা মিমি বলেন, "ইচ্ছেতলা হচ্ছে শিশু কিশোরদের জন্য তৈরি একটি প্রতিষ্ঠান। যেখানে ৫০ জন শিশু রয়েছে। উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে এই প্রতিষ্ঠান। এটা বাচ্চাদের ইচ্ছেতলা, এটা কোনোভাবেই আমরা জোরতলা হিসেবে কাজ করিনি। এখানে কোনো বাচ্চা আসলে তাদেরকে প্রথমেই ভর্তি নেওয়া হয় না। এক দুই সপ্তাহ তারা আসে যায়, বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে। যদি তাদের ভালো লাগে তাহলে তারা থেকে যায়।
"ইচ্ছেতলা নামটি রেখেছেন বিপ্লব বালা, এখানের বাচ্চাদের বলা হয় 'ইচ্ছাবতী', এই প্রতিষ্ঠানের লগো ডিজাইন করেছেন সব্যসাচী হাজরা।"

‘ইচ্ছেতলার’ কার্যক্রম নিয়ে মিমি বলেন, “চার বছর থেকে ১৫/১৬ বছর পর্যন্ত বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের কার্যক্রম। ইচ্ছেতলা শিশু কিশোরদের এক মুক্ত পৃথিবী। যেখানে ওরা আনন্দে নাচে, গলা ছেড়ে গান করে, মনের রং দিয়ে ছবি আঁকে, চারপাশের জীবন ও জগতকে দেখতে শেখে। অর্থাৎ গান, নাচ, ছবি আঁকা, নাটক শেখানো বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের যোগসূত্র তৈরি করা হয়। এখানে প্রায় দশ জনের মত শিক্ষক আছে। শুক্রবার ও শনিবার দুইদিন তারা আমাদের কাছে শিখে।”
‘ইচ্ছেতলায়’ ভর্তি হতে হলে একটা শর্ত আছে জানিয়ে মিমি বলেন, “সেটা হল এখানে সব বাচ্চাদের বাংলা ভাষায় কথা বলতে হবে এবং সবার সঙ্গে মিশতে হবে, বন্ধুত্ব করতে হবে।”
‘ইচ্ছেতলার’ কয়েক শিশুশিল্পী দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসে বিমান বিধ্বস্তে হতাহতের ঘটনাটি তাদের উপরে মারাত্মক ভীতিকর প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছে মিমি।
মিমি বলেন,"আমাদের কয়েকজন বাচ্চা মাইলস্টোনে পড়ে, কিন্তু তারা অন্য ক্যাম্পাসে। তাদের ভাই বোন আবার দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার ক্যাম্পাসে পড়ে। সরাসরি কেউ আহত হয়নি, কিন্তু এই ঘটনায় পুরো ইচ্ছেতলা, আমার সব বাচ্চারা, অভিভাবকরা ট্রমাটাইজ।”
প্রাণ হারানো বা দুর্ঘটনা কাম্য নয় মন্তব্য করে মিমি বলেন, শিশুদের ওপরে কোনো দুর্ঘটনাই মেনে নেওয়া যায় না।