Published : 12 Apr 2026, 06:25 PM
বাংলাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার কাছে আশা ভোঁসলে কেবল একজন প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন অন্তরের স্বজন।
ভারতীয় উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত শিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করে রুনা লায়লা বলেছেন, "আশাজির মৃত্যুতে সংগীতজগতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।"
রোববার মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে মারা যান আশা ভোঁসলে; তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
রুনা লায়লা গ্লিটজকে বলেন, "উনার সঙ্গে আমার অন্তরের সম্পর্ক ছিল, পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। এমন শিল্পী আর এই পৃথিবীতে আসবে না। একে একে সবাই চলে যাচ্ছেন, পৃথিবীটাই শূন্য হয়ে যাচ্ছে।"
কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের ছোট বোন আশা ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে শনিবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। রোববার সকালে সেখানেই তার মৃত্যুর খবর আসে।
লতা ও আশা দুই বোনই ‘ভীষণ স্নেহ করতেন’ জানিয়ে রুনা লায়লা বলেন, "উনারা আমাকে মায়ের মত স্নেহ করতেন। উনাদের সঙ্গে অনেক অনেক স্মৃতি আছে। আশাজি অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ ও সহজ-সরল শিল্পী ছিলেন। উনাদের মত শিল্পী চলে গেলেন, এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।"
রুনা লায়লার সুর করা ‘চলে যাওয়া ঢেউগুলো আর ফিরে আসেনি’ গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন আশা ভোঁসলে।

একটি টেলিভিশন স্টেশনের সাক্ষাৎকারে সেই গানটির পেছনের স্মৃতি তুলে ধরেছিলেন রুনা লায়লা।
তিনি বলেছিলেন, “আমি যার গান শুনে শুনে বড় হয়েছি, তার গান অনুকরণ করতাম, তার কাজগুলো অনুসরণ করতাম—সেই মানুষকেই এবার আমি নিজের সুরে গান করাব, এটা ছিল অসাধারণ এক অনুভূতি। প্রথমে আশাজিকে ফোন করে প্রস্তাব দিতেই তিনি এক বাক্যে রাজি হয়ে যান, কোনো দ্বিধা ছিল না।”
রুনা লায়লা বলেন, "এই গানের প্রকল্পে আমি যাদেরই যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি, সবাই সানন্দে রাজি হয়েছেন। সবাই খুবই সহযোগিতাপূর্ণ ছিলেন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বড় মাপের শিল্পী হলেও কারও মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। আমি সংগীত পরিচালনা করছি, যেভাবে যাকে নির্দেশনা দিচ্ছি সেভাবেই করে দিয়েছেন। "
এক জীবনে কত গান
আট দশকের বেশি সময় ধরে ২০টি ভিন্ন ভাষায় ১১ হাজারের বেশি গান গেয়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান পাওয়া শিল্পী আশা ভোঁসলের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর।
বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের হাত ধরে সংগীতজীবনে পা রেখেছিলেন আশা ভোঁসলে। সময়টা ছিল ১৯৪৩ সাল। প্রথম প্লেব্যাক করেন মারাঠি সিনেমায়।
এরপর ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ সিনেমায় ‘খাতু আয়া’ গানের মধ্য দিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক শুরু। তিনি প্রথম এককভাবে হিন্দি গানে কণ্ঠ দেন ১৯৪৯ সালে। শাস্ত্রীয়, লোকসংগীত, পপ, গজলসহ বিভিন্ন ঘরানার গান গেয়ে ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ করেন।
আশা ভোঁসলে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শর্মিলা ঠাকুর, আশা পারেখ, রেখা, উর্মিলা মাতণ্ডকর, কারিশমা কাপুর, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন থেকে শমিতা শেঠি পর্যন্ত বহু অভিনেত্রীর জন্য গান গেয়েছেন।
এক জীবনে কত গান, কত বিচিত্র সুরেই না গেয়েছেন আশা! যে কণ্ঠে তিনি গেয়েছেন ‘ছোটাসা বালমা’, ‘মেরা মন দর্পণ’ এর মতো রাগপ্রধান গান, তেমনি গেয়েছেন ‘ভোমরা বড়া নাদান’, ‘ঝুমকা গিরা রে’, ‘পিয়া তু অব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’ এর মত আসর জমানো গান।

এসব গানে এখনো কনসার্ট মাতান শিল্পীরা। সিনেমার গানের পাশাপাশি নানা ধরনের নিরীক্ষামূলক গানেও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন আশা ভোঁসলে।
গুলাম আলীর সুরে ‘মিরাজ-ইয়ে-গজল’ সংকলন, হরিহরণের সুরে গজল সংকলন ‘অবসর-ইয়ে-গজল’, জয়দেবের সুরে ‘সুরাঞ্জলি’সহ আরও বহু গান গেয়েছেন তিনি। আশার গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবামও দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে শ্রোতামহলে। আবার নজরুলের গানও তুলে নিয়েছেন কণ্ঠে।
আশা ভোঁসলের সর্বশেষ প্লেব্যাক করেন ২০২২ সালের জ্যাকি শ্রফ অভিনীত 'লাইফ ইস গুড' সিনেমায়। 'রুত ভিগে তন' গানটি গেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া ৯১ বছর বয়সে তার প্রয়াত স্বামী সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মণকে উৎসর্গ করে 'সাইয়াঁ বিনা' নামে একটি একক গান প্রকাশ করেন।
আমৃত্যু তিনি গানের সঙ্গে ছিলেন, রেওয়াজ করতেন নিয়মতি। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে আশা বলেছিলেন, তার রেওয়াজের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকাল ৭টা থেকে, কখনো আবার ভোর ৫টা বা দুপুরবেলায়ও রেওয়াজ করতেন। ঘুম না এলে মাঝরাতেও বসতেন তানপুরা নিয়ে।
ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছেন আশা ভোঁসলে, পেয়েছেন ‘পদ্মবিভূষণ’।
এসব সম্মাননার পাশাপাশি ১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’ সিনেমার তিনি প্রথমবার জাতীয় পুরস্কার পান, দ্বিতীয় জাতীয় পুরস্কার তার ঘরে আসে ১৯৮৮ সালে ‘ইজাজত’ সিনেমার জন্য। এছাড়া ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও জিতেছেন। গ্র্যামিতে মনোনয়ন পেয়েছিলেন।
আরও পড়ুন
কণ্ঠের যে জাদু আশা ভোঁসলেকে করে তোলে প্লেব্যাক সুপারস্টার
যন্ত্রণাময় দাম্পত্য থেকে আত্মহননের চেষ্টা, আশার জীবনের এক অধ্যায়