ফারাজ সিনেমা ‘ভুল গল্পে’, মুক্তিতে আপত্তি অবিন্তার মায়ের

ঢাকার ঝড় তোলা গুলশান হামলা নিয়ে বলিউডে নির্মিত সিনেমাটি আগামী মাসেই মুক্তির ঘোষণা এসেছে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 19 Jan 2023, 02:49 PM
Updated : 19 Jan 2023, 02:49 PM

বাংলাদেশের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা নিয়ে বলিউডে ফারাজ নামে যে সিনেমাটি তৈরি হয়েছে, তা ভুল গল্পের উপর ভিত্তি করে নির্মিত বলে দাবি করেছেন সেদিন নিহত অবিন্তা কবিরের মা রুবা আহমেদ।

ফারাজ’র ট্রেইলার প্রকাশের তিন দিন পর বৃহস্পতিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে এসে এই দাবি করার পাশাপাশি সিনেমাটি মুক্তি না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সিনেমাটির নির্মাতারা সেই ঘটনায় নিহত হিসেবে অবিন্তার পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি বলে রুবার অভিযোগ।

ভারতে সিনেমাটির মুক্তি বন্ধ করতে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন জানিয়ে দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিনেমাটি মুক্তি না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকার শাহজাদপুরে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন হয়। ঘণ্টাব্যাপী এই সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সময় মেয়ের স্মৃতি স্মরণ করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন রুবা।

২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় যে ২২ জন নিহত হয়েছিলেন, তাদের একজন অবিন্তা। যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী অবিন্তা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার স্বদেশী সহপাঠি ফারাজ আইয়াজ হোসেন এবং তাদের ভারতীয় বন্ধু তারিশি জৈনের সঙ্গে ক্যাফেটিতে গিয়েছিলেন। কমান্ডো অভিযানে রেস্তোরাঁটি জঙ্গিমুক্ত করার পর তাদের লাশ পাওয়া যায়।

ঝড় তোলা সেই ঘটনা নিয়ে বলিউডে ‘ফারাজ’ সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন হানসাল মেহতা, টি সিরিজের ব্যানারে। গত সোমবার সিনেমা ট্রেইলার প্রকাশ হয়েছে, আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি মুক্তির তারিখও ঠিক হয়েছে।

পুরো সিনেমাটি না দেখলেও নাম ও ট্রেইলার দেখে এখানে ফারাজকে মূল চরিত্র হিসেবে দেখানো হচ্ছে বলে ধারণা হয়েছে অবিন্তার মা রুবার।

সেখানে ভুল হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, “যে ঘটনাটিকে বলা হয়েছে যে আমার মেয়ের জন্য একজন মানুষ (ফারাজ) তার জীবন দিয়েছেন, সেই হিরো … নো, দ্যাটস রং। ইটস অ্যা রং স্টেইটমেন্ট। এটা হতে পারে না। এই মুভিটা রং।

“আমি তা বিশ্বাস করি না। কারণ তার কোনো প্রমাণ নেই। ওখান থেকে কেউ বেঁচে আসেনি। যারা বেঁচে এসছে, তারা এ বিষয়ে কিচ্ছু জানে না, বলতে পারে না। এ বিষয়ে কোন এভিডেন্সও নাই যে এখানে কেউ হিরো হয়েছে। যদি কেউ হিরো হয়ে থাকে, তাহলে সেই ২২টা মানুষ, যারা চলে গেছে, তারা সবাই হিরো।”

সিনেমা নিয়ে আপত্তির বিষয়গুলো স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “আমার কয়েকটা পয়েন্ট ছিল। এক হচ্ছে: অবিন্তা কবির, তারিশি জৈন, ফারাজ হোসেন এই তিনজন বাকি ২২ জনের মতো চলে গেছে। এটাকে নিয়ে কোনো মুভি করার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। মুভিটার নাম ‘ফারাজ’, তার মানে হলো অবশ্যই একটা চরিত্রের উপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। সেই ক্যারেক্টারের উপর জোর দিতে গিয়ে আমার মেয়ের কথা চলে আসছে।

“সো আমরা একটা গল্প বানালাম, সেই গল্প বানিয়ে মুভিটা তৈরি করলাম। কিন্তু এই মুভির সাথে যে পরিবারগুলো আছে, তাদের তো অনুমতি নিতে হবে, সেটা তো নেওয়া হল না।”

রুবা বলেন,“আমার কথা হল মুভিটার নাম কেন ‘ফারাজ’ হবে? আর আমাকে কেন প্রিস্ক্রিনিং করতে দেওয়া হল না, যদি আমার মেয়েকে সেখানে নাই রাখা হবে। নিশ্চয়ই রাখা হয়েছে। অবিন্তা হয়েছে আয়েশা, ইভেন আমি আছি মুভিটাতে রাবেয়া নামে। শুধু তাই না আমার মেয়ের ছবিও দেখানো হয়েছে। তাহলে আমার মেয়ের প্রাইভেসি কোথায় থাকল? আমার প্রাইভেসি কোথায় থাকল?”

এই চলচ্চিত্রটির মুক্তি বন্ধে তিনি ভারতের আদালতেও গিয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি ঘটনাটা জানতে পারি ২০১৯ সালে। তখন থেকে চেষ্টা করেছি উকিল নোটিস দিয়ে বিভিন্নভাবে এটিকে থামানোর জন্য। তারপর মহামারী যখন শুরু হল পুরো দুনিয়া অন্য রকম হয়ে যায়। তখন আমার ধারণা হয়েছিল হয়ত মুভিটা বন্ধ হয়ে গেছে।

“২০২১ সালের ৫ অগাস্ট আমি প্রথম পোস্টারটা পাই। পোস্টারটা পাওয়ার পর মুভির নামটা জেনেছি। তখন বুঝলাম আসলে মুভিটা বন্ধ হয়নি, এতদিন তারা মুভিটা বানিয়েছে। তখন থেকেই আজকের দিন পর্যন্ত আমি ডেইলি হাই কোর্টে (দিল্লির আদালত) খোঁজ নিই। এখন পর্যন্ত আমার কেইসটা চলছে। যারা মুভিটা বানিয়েছে ভারতের সব ডিরেক্টরদের সাথে আমি ফাইট করে যাচ্ছি।”

“আমি শুধু ছয় মাস মুভিটাকে আটকে রাখতে পেরেছিলাম। কারণ আইনের ভাষায় পাবলিক ডোমেইনে থাকলে আমার না কি কিছু করার নেই। দরকার হলে আমি সুপ্রিম কোর্টে যাব। আমি জানি ফেব্রুয়ারিতে মুভিটা রিলিজ পাবে। আমি জানি হয়ত আমি কিচ্ছু করতে পারব না। কিন্তু আমি কাউকে এই সুযোগ দেব না যে আমার ইচ্ছে করেছে মুভিটা ছেড়ে দিলাম বাজারে,” বলেন তিনি।

ভারতে নির্মিত এই সিনেমাটি বাংলাদেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অবিন্তার মা বলেন, “এতে শুধু আমার মেয়ের নয়, দেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে। আমি চাই না, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এই সিনেমা আসুক।

“আমার দেশে যখন এটা আসবে, প্লিজ ওটিটিতে এটা প্রকাশ হতে দিয়েন না। দেশের মানুষের দরকার নেই এটা দেখার।”

জঙ্গি হামলায় মেয়েকে হারানো রুবা ধরা গলায় বলেন, “গত সাত বছরে আমার কিন্তু কারও সঙ্গে ওঠাবসা নেই। আমার মেয়ে চলে যাওয়ার পর আমি আমার দুনিয়াটা বন্ধ করে দিয়েছি। কারও সাথে দেখা করি না, কারও সাথে কথা বলি না।

“এটা (সিনেমা) দেখা কোনো মায়ের পক্ষে সম্ভব না। আমি মা, আমার মেয়েকে আমি হারিয়েছি। মেয়ের জীবন কীভাবে চলে গেছে সেটা বড় পর্দায় দেখাচ্ছে, অন্যরা উপভোগ করছে এবং অন্য মানুষ সেখান থেকে ব্যবসা করে পয়সা নিচ্ছে, এগুলো মা হিসেবে আমি কীভাবে চাইব।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক