ফারুকের স্মৃতিতে হুমায়ূন আহমেদকে প্রথম ও শেষ দেখা

হুমায়ূন আহমেদের নাটকের চেনামুখ ছিলেন ফারুক আহমেদ।

মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Nov 2022, 05:44 PM
Updated : 13 Nov 2022, 05:44 PM

হুমায়ূন আহমেদের প্রায় সব নাটকেই থাকতেন ফারুখ আহমেদ। কখনও দারোয়ান, কখনও কেয়ারটেকার, কখনও ভবঘুরে- আপাত দৃষ্টিতে গুরুত্বহীন এই চরিত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত চিত্রনাট্য আর অভিনয় গুণে।

হুমায়ুন আহমেদের জন্মবার্ষিকীতে প্রয়াত এক এই লেখক-নাট্যকার-চলচ্চিত্রকার আসছেন ফারুকের স্মরণে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, হুমায়ূন আহমেদকে প্রথম ও শেষ দেখার স্মৃতি।

১৯৪৮ সালের ১১ নভেম্বর হুমায়ূন আহমেদের জন্ম নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে। ক্যান্সারে ভুগে তিনি চিরবিদায় নেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। বেঁচে থাকলে এখন তার বয়স হত ৭৪ বছর।

প্রথম দেখার গল্প বলতে গিয়ে ফারুক বলেন, “হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ১৯৭৩ সালে। তখন আমি মোহাম্মদপুর গভর্নমেন্ট স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি। হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই আহসান হাবীব আমাদের ক্লাসে ভর্তি হলেন। তার ডাকমান ছিল শাহীন। শাহীন যে হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই, আমরা জানতাম না।

“ততদিনে হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে প্রকাশিত হয়েছে। আমি পড়েছি। পড়ে খুবই মুগ্ধ হয়েছিলাম। হঠাৎ একদিন শুনলাম, আহসান হাবীব হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই। একথা শোনার পর আহসান হাবীবের সঙ্গে খাতির জমাতে শুরু করলাম। অল্পতেই খাতির জমে গেল। একদিন বললাম, তোমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদকে আমি দেখব। আহসান হাবীব বললেন, ‘ঠিক আছে নিয়ে যাব’।”

ফারুক বলেন, “আমাদের বাসা পাশাপাশিই ছিল। বাবর রোড আর হুমায়ূন রোড। আহসান হাবীব একদিন রোববার ছুটির দিনে আমাকে নিয়ে গেল তাদের বাসায়। নন্দিত নরকের লেখক হুমায়ূন আহমেদকে দেখব, এটা ভেবে খুব উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। আমার বুক কাঁপছে!

“হুমায়ূন আহমেদ ড্রইংরুমে বসে বই পড়ছিলেন। আমি গিয়ে সালাম দিলাম। আমার দিকে তাকালেন। সালামের উত্তর নিলেন। নাম জিজ্ঞেস করলেন। বললেন, ‘তুমি শাহীনের সাথে পড়?’ বললাম, ‘জি’। তিনি বললেন, ‘গুড, যাও ওর সাথে গল্প করো।’ বলেই তিনি বই পড়া শুরু করলেন। আমি চলে এলাম। এটাই ছিল প্রথম পরিচয়, প্রথম দেখা। একজন লেখকের সঙ্গে দেখা করলাম এটা ভেবে আমার পুলক আর থামে না।”

এরপর হুমায়ূন আহমেদের বই নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে। তিনি জনপ্রিয় লেখকে পরিণত হন। বিদেশ যান লেখাপড়া করতে। ফিরে এসে নাটক লেখা শুরু করেন। এরপর নাটক নির্মাণের চিন্তা করতেই ডাক পড়ে ফারুক আহমেদের। ফারুক আহমেদ ততদিনে থিয়েটার ও বিটিভিতে নাটক করে মোটামুটি পরিচিত মুখ।
হুমায়ূন আহমেদ একের পর এক নাটক বানান। সব নাটকে অত্যাবশ্যকীয় মুখে পরিণত হন ফারুক আহমেদ। কাজের সুবাদে তাদের সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ় হয়।

শেষ দেখার স্মৃতি জানতে চাইলে ফারুখ বলেন, “শেষ দেখা হয় স্যার যখন আমেরিকায় কেমোথেরাপি চলা অবস্থায় পাগলের মতো ১৫ দিনের জন্য বাংলাদেশে ছুটে আসেন তখন। ডাক্তাররা নিষেধ করেছিলেন। তারপরও তিনি ‘আমাকে নুহাশপল্লীতে যেতে হবে’ বলে চলে এলেন।

“স্যারের আসার খবর শুনে পরেরদিনই নুহাশপল্লীতে গেলাম। গিয়ে দেখি স্যার খুবই স্বাভাবিক। তিনি যে ক্যান্সারের রোগী বোঝাই যাচ্ছিল না। সেখানে শাওন, শাওনের আম্মা-আব্বাসহ আরও কয়জন কাছের মানুষ মিলে গল্প করছিলেন। আমরা একসঙ্গে নাস্তা করলাম। নাস্তা শেষে গল্প করছিলাম। তখন আমাকে বললেন, ‘তোমার তো কাজ আছে’। বললাম, কী কাজ? বললেন, ‘নতুন নাটক। আমি লিখে দিচ্ছি। কাজটা দ্রুত শেষ করো’। এটা ছিল হুমায়ূন আহমেদের শেষ নাটক ‘পিপীলিকা’। আমি ঢাকায় ফিরে এলাম। এরপর নাটকের কাজে গেলাম। হুমায়ূন ভাই পিপীলিকার ডিরেকশন পুরোপুরি দিতে পারেন নাই। মাঝে মাঝে গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন। তখন শরীর কিছুটা দুর্বল ছিল।”

ফারুক বললেন, “শুটিং শেষ করে ঢাকায় ফিরব। গাড়িতে ওঠার আগে স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। এর পরেরদিন আমেরিকায় চলে যাবেন স্যার। স্যারের রুমে গিয়ে দেখি অনেক মানুষ তার বেডরুমের ফ্লোরে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। স্যার বসতে বললেন। শুটিং কেমন হয়েছে জানতে চাইলেন। আমি বললাম, ‘ভালোই হয়েছে’।”

একটা বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করে ফারুক আহমেদ বলেন, “এসময় স্যার সবার উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা এখন চুপ করো, আমি একটা ঘটনা বলব’। আমি খুব টেনশনে পড়ে গেলাম। স্যার নানা কথা বলে মজা করতেন। ভাবছিলাম আবার বুঝি আমাকে পচাবেন।

“স্যার শুরু করলেন- ‘শোনো, একবার নিষাদের জন্মদিন অনুষ্ঠান করেছিলাম গুলশানের একটা রেস্টুরেন্টে। কিন্তু ভুল বশত ফারুককে দাওয়াত দেওয়া হয় নাই। আমি দিই নাই, শাওনও দেয় নাই, আমার অ্যাসিসটেন্টরাও দেয় নাই। জন্মদিনের দিন দেখি সবাই আসছে, ফারুক আসে নাই। তখন আমার খারাপ লাগল। কেবলই ভাবছি, এত বড় ভুল হয়ে গেল! এরপর দেখি ফারুক গিফট নিয়ে এসে হাজির। তখন মনে হল, আমি হয়ত ভুলে গেছি। অন্য কেউ দাওয়াত দিয়েছে। কিন্তু ফারুক সোজা আমার সামনে এসে বলল, ‘আপনি তো ভুলে গেছেন, আমাকে দাওয়াত দেন নাই। দাওয়াত দেন নাই তো কী হয়েছে, আমি ঠিকই চলে এসেছি। আপনার ছেলের জন্মদিন আমি আসব না, এটা তো হতে পারে না।

“গল্পটা শেষ করে হুমায়ূন ভাই উপস্থিত সবাইকে বললেন, ‘এটা হচ্ছে প্রকৃত ভালোবাসা। দাওয়াত দিতে হবে কি না, সেটা বড় কথা না। ফারুক মনে করেছে হুমায়ূন ভাইয়ের ছেলের জন্মদিন, আমাকে যেতে হবে। সে দাওয়াতের অপেক্ষায় না থেকে চলে এসেছে। অভিমান করে নাই। কারণ, সে আমাকে ভালোবাসে। এটাই প্রকৃত ভালোবাসা’। কথা শেষে দেখলাম হুমায়ূন ভাইয়ের চোখে পানি টলমল করছে। আমার দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘গুড বাই ফারুক।’ আমিও ভারাক্রান্ত ছিলাম। আর কিচ্ছু বলিনি। মাথা নিচু করে চলে এলাম। এই ছিল শেষ দেখা।”

স্মৃতিতে হারিয়ে কেমন যেন আনমনা হয়ে যান ফারুক আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের কোন বিষয়টা সবচেয়ে বেশি মিস করেন- প্রশ্ন করলে কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভারী গলায় উত্তর দেন, “ভালোবাসাটা মিস করি।”    

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক