Published : 13 Jan 2026, 06:09 PM
অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদন পাওয়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫-এর খসড়াতে বিভাগের সংখ্যা বাড়লেও, বাদ পড়েছে আবৃত্তি এবং প্রশিক্ষণ বিভাগের নাম।
এতে করে এই দুই বিভাগের কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংস্কৃতিকর্মীদের কেউ কেউ।
গত বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় একাডেমির ‘(সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫' অনুমোদন করা হয়। ফলে শিল্পকলা একাডেমিতে বিভাগের সংখ্যা ৬টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৯টিতে বর্ধিত করা হয়েছে। যা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে শিল্পকলা একাডেমি।
আবৃত্তি এবং প্রশিক্ষণ বিভাগ বাতিলের প্রতিক্রিয়ায় ‘বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের’ সাংগঠনিক সম্পাদক মো.মনির হোসেন ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ঢাকা এবং বিভিন্ন জেলা শহরের আবৃত্তি শিল্পীদেরও অনেকে আবৃত্তি বিভাগ বাদ দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে সরব হয়েছেন সোশাল মিডিয়ায়।
তবে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, শিল্পকলা থেকে কোনো বিভাগের কার্যক্রমই ‘বাদ দেওয়া হয়নি’। বিভাগগুলোর নামকরণে পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এই সংশোধনের ফলে শিল্পকলার কার্যক্রম আরো বিস্মৃত হয়েছে বলেও মনে করেন মহাপরিচালক।
শিল্পকলা একাডেমির একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’। প্রশিক্ষণ বিভাগ একাডেমির প্রাণ। দেশের জেলা ও উপজেলা শিল্পকলাগুলো সচল থাকে মূলত প্রশিক্ষণ কাযক্রমকে ঘিরে। আর এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা হয় প্রশিক্ষণ বিভাগ থেকে। অথচ সংশোধনে প্রশিক্ষণ বিভাগকে বাদ দেওয়া হয়েছে।”
এতে শিল্পকলার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের যে গতি তৈরি হয়েছে, তা ‘ব্যাহত হবে’ বলেও মনে করেন এই কর্মকর্তা।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির একাধিক কালচারাল অফিসার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, প্রশিক্ষণ বিভাগের অধীনে এতদিন ধরে যে প্রশিক্ষণ কর্মযজ্ঞ চলে আসছে, তা এখন কিভাবে পরিচালিত হবে- তাদের কাছে এটি স্পষ্ট নয়।
জেলা শিল্পকলা একাডেমিগুলোতে সংগীত, নাটক, আবৃত্তি, বাদ্যযন্ত্র, চারুকলা শাখায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কোনো কোনো জেলা শিল্পকলায় ২/৩ হাজার শিক্ষার্থীও প্রশিক্ষণ বিভাগের অধীনে নানা কার্যক্রমে অংশ নেন।
এমন বৃহৎ কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ বিভাগ ‘স্বতন্ত্র্য’ হিসেবেই থাকা উচিত বলে জেলা শিল্পকলার কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন।
প্রশিক্ষণ বিভাগ এখন কিভাবে পরিচালিত হবে, জানতে চাইলে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) বলেন, “কোনো কার্যক্রমই কিন্তু বাদ দেওয়া হয়নি। যে ধরণের কার্যক্রম আগে পরিচালনা হত, তা চলবে। নাটক বিষয়ক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করবে থিয়েটার বিভাগ। সংগীত বা চারুকলা প্রশিক্ষণ পরিচালনা করবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। কোনো বিভাগের কার্যক্রমই তো বন্ধ হয়নি।”
শিল্পকলায় এর আগে যে ৬টি বিভাগ ছিল, সেগুলো হল- ক) নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র, খ) সংগীত নৃত্য ও আবৃত্তি গ) গবেষণা ও প্রকাশনা, ঘ) প্রযোজনা, ঙ) প্রশিক্ষণ এবং চ) চারুকলা বিভাগ।
নতুন অধ্যাদেশে ৯টি বিভাগের মধ্যে রয়েছে- ক) প্রশাসন ও অর্থ, খ) থিয়েটার, গ) চলচ্চিত্র, ঘ) আলোকচিত্র, ঙ) নৃত্য ও পারফর্মিং আর্টস, চ) গবেষণা, প্রকাশনা ও নিউ মিডিয়া, ছ) সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ডিং, উৎসব ও প্রযোজনা, জ) সংগীত এবং ঝ) চারুকলা বিভাগ।
এর আগে নাট্যকলা বিভাগের সঙ্গে চলচ্চিত্র থাকলেও নতুন বিন্যাসে চলচ্চিত্রকে ‘স্বতন্ত্র্য’ বিভাগ হিসেবে রাখা হয়েছে। আর নাট্যকলা বিভাগের নামকরণ করা হয়েছে ‘থিয়েটার’।
স্বতন্ত্র্য বিভাগ হিসেবে যুক্ত হয়েছে আলোকচিত্র, সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ডিং, উৎসব ও প্রযোজনা।
সংগীত নৃত্য ও আবৃত্তি একসঙ্গে একটি বিভাগ থাকলেও নতুন অধ্যাদেশে সংগীতকে রাখা হয়েছে ‘স্বতন্ত্র্য’ বিভাগ হিসেবে। গবেষণা, প্রকাশনা বিভাগে যুক্ত করা হয়েছে ‘নিউ মিডিয়া’।
শিল্পকলা একাডেমির একজন উর্দ্বতন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, বর্তমানে প্রশাসন বিভাগের অধীনে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সেল’ এবং ‘মিলনায়তন ও মঞ্চ ব্যবস্থাপনা শাখা’ রয়েছে। এই দুটি শাখা এখন কোথায় যাবে- তা স্পষ্ট নয়।
নৃত্য বিভাগের সাথে ‘পারফরমেন্স আর্ট’ রাখা হয়েছে, তবে ‘পারফরমেন্স আর্ট’ বিষয়টি নাট্যকলার সাথে অধিকতর সংগতিপূর্ণ বলেও মনে করেন এই কর্মকর্তা।
‘নিউ মিডিয়া’, ‘কালচারাল ব্রান্ডিং’ এবং ‘উৎসব প্রযোজনা’ বিভাগগুলোর কাজ কি হবে, তাও স্পষ্ট নয় বলে জানান তিনি।
শিল্পকলা একাডেমি বলছে, “শিল্পকলা একাডেমি অধ্যাদেশ (সংশোধন) ২০২৫ এর আলোকে বিভাগের পুনর্গঠন এবং চলচ্চিত্র, আলোকচিত্রের মত নতুন নতুন বিভাগ একাডেমির কাজের ক্ষেত্রকে আরও সংগঠিত ও গতিশীল করবে। পাশাপাশি, শিল্পকলা একাডেমি পর্ষদের গঠন সম্পর্কিত নতুন অধ্যাদেশের ফলে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরো বেশি জনবান্ধন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।”
শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনা পরিষদে আগে শুধু শিল্পকলার তিনটি বিভাগের প্রতিনিধি থাকার নিয়ম ছিল। সংশোধিত অধ্যাদেশে শিল্পকলার আটটি শাখা থেকে আটজন প্রতিনিধি নির্বাচনের বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী থেকে একজন প্রতিনিধি নির্বাচন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একাডেমির কর্মপরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্পকলা একাডেমি।