Published : 13 Jul 2025, 12:10 AM
জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় ‘উপেক্ষিত বা অবহেলিত নন’ বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক আব্দুস সেলিম।
তিনি বলেছেন, “স্বাধীন বাংলাদেশে পনেরোটির মত ব্রেখটের নাটকের অনুবাদ ও রূপান্তর মঞ্চস্থ হয়েছে; শেক্সপিয়রের পরেই যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হতে পারে।”
শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার জাতীয় নাট্যশালার স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তনে আরণ্যক নাট্যদল আয়োজিত ‘মান্নান হীরা স্মারক বক্তৃতা’র আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
অধ্যাপক সেলিম বলেন, “একটা সময় ছিল যখন মৌলিক নাটক কম ছিল; তখন বাংলাদেশে বিদেশি নাটক হত। এখন হয়ত ততটা প্রয়োজন হয় না। কারণ দেশেই অনেক নাট্যকার নাটক লিখছেন।”
একজন শিল্পী হিসেবে ব্রেখটকে ‘অনেক উঁচুমাপের’ হিসেবে বর্ণনা করে আব্দুস সেলিম বলেন, “তাকে শুধু নাট্যকার বা অন্য কোনো একক পরিচয়ের ছকে বাঁধা ঠিক হবে না।”
ব্রেখট বিশ্বজুড়ে ‘এপিক থিয়েটারের’ প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত; তার নাটকে সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। তিনি প্রচলিত নাট্যরীতি থেকে বেরিয়ে নীরিক্ষা করেছেন। ব্রেখট কেবল নাট্যকারই ছিলেন না, একজন কবি ও নাট্যপরিচালকও ছিলেন।

বাংলাদেশের প্রয়াত নাট্যকার মান্নান হীরার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার চতুর্থবারে মত ‘স্মারক বক্তৃতা’ ও নাটকের প্রদর্শনীর আয়োজন করে আরণ্যক নাট্যদল। মান্নান হীরা নাট্যদলটির শুরু থেকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
মান্নান হীরার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় অনুষ্ঠানের। পরে ‘বাংলাদেশে ব্রেখট চর্চা: আলোচনা, পর্যালোচনা ও অপূর্ণতা’ বিষয়ে স্মারক বক্তৃতা উপস্থাপন করেন নাট্যগবেষক বাবুল বিশ্বাস।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ব্রেখটের নাটকের বেশিরভাগ নির্দেশকগণ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং চেতনাপ্রসূত যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের দগদগে ক্ষত এবং যুদ্ধ পরবর্তী বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের সাথে ব্রেখটের নাটকের মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক সহমিল তারা খুঁজে পেয়েছেন। এই সহমিল তৎকালীন সময়ে যুদ্ধ ফেরত প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিচর্চাকারীদের কাছে ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ।”

“ফলে তাদের নির্দেশনায় নাটকের মূল সুরটুকু মূলত ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাশ্রিত একটি নতুন সাম্যবাদী গণমুখি আদর্শ। অন্যদিকে ব্রেখট তাদের কাছে ছিল অথবা তারা ব্রেখটকে দেখছিলেন একটি বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটনির্ভর সাম্যবাদী সামাজিক-আদর্শিক রূপে।”
তরুণ প্রজন্মকেও ব্রেখটের নাটক প্রযোজনায় আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান বাবুল বিশ্বাস। তিনি বলেন, “আদর্শ আর তত্ত্বকে নির্ভেজাল ধর্মগ্রন্থ না ভেবে সামাজিক বাস্তবতাকে তুলনামূলক বিচার বিবেচনায় রেখে তারা ব্রেখটের নাটক উপস্থাপন করুক।”
নাট্যনির্দেশক ও অভিনয়শিল্পী ত্রপা মজুমদার বলেন, “ব্রেখটের নাম উচ্চারণের সাথে সাথে একটা তত্ত্ব আমাদের সামনে চলে আসে। এসব তত্ত্ব ছাপিয়ে ব্রেখট যে একজন নাট্যকার; আমরা তা ভুলে যাই। তাই ব্রেখটের নাটক করতে হলে এই তত্ত্বকে পাশ কাটিয়েই আমাদের করতে হবে।”
বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় ব্রেখট ‘উপেক্ষিত নয়’ মন্তব্য করে ত্রপা মজুমদার বলেন, “ব্রেখটের নাটক করতে গিয়ে বরং আমরা ভীত। এই ভীতি ভাঙতে হবে।”

সভাপতির বক্তব্যে আরণ্যক নাট্যদলের প্রধান সম্পাদক হারুন রশীদ বলেন, “নাট্যকারের আগেও ব্রেখট একজন কবি। নাটকের মত কবিতাতেও তিনি একই ধরনের মেসেজ দিয়েছেন। কবিতা পড়তে গিয়ে আমাদের যদি তত্ত্ব বাধা না দেয় তবে নাটকেও দেবে না।”
স্মারক বক্তৃতার পর রাত সাড়ে ৮টায় আরণ্যক নাট্যদল মঞ্চস্থ করে মান্নান হীরা রচিত ও নির্দেশিত নাটক ‘মূর্খ লোকের মূর্খ কথা’।
মান্নান হীরা ১৯৫৭ সালের ৭ জুলাই সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে তার নাট্যযাত্রা শুরু করেন।
তিনি একাধারে নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা ও সংগঠক ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে পথনাটক চর্চার পথিকৃৎ গণ্য করা হয় তাকে। ১৯৯৯ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
আরণ্যক নাট্যদলের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন একাধিকবার। নাটক ক্যাটাগরিতে ২০০৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়া বাংলা একাডেমি থেকে শহীদ আকন্দ পদক, নাট্যদল থিয়েটার প্রবর্তিত জাকারিয়া স্মৃতি পদকসহ অসংখ্য পদকে ভূষিত হয়েছেন।
মান্নান হীরা ২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।