Published : 24 Jan 2026, 12:54 PM
সাধারণত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে হরর ঘরানার সিনেমাগুলো খুব একটা সাফল্য পায় না, এমন প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিয়েছে হলিউডের হরর সিনেমা ‘সিনার্স’।
চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরস্কার ২৪টি বিভাগের মধ্যে সেরা চলচ্চিত্রসহ ১৬টিতে মনোনয়ন পেয়ে অস্কারে রেকর্ড গড়েছে সিনেমাটি। বলা হচ্ছে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু উপহার দিয়েছেন ‘সিনার্স’ এর পরিচালক রায়ান কুগলার।
বিবিসি লিখেছে, এর আগে ১৯৫১ সালে 'অল অ্যাবাউট ইভ', ১৯৯৮ সালে 'টাইটানিক' এবং ২০১৮ সালে 'লা লা ল্যান্ড'-এই তিনটি সিনেমা অস্কারে ১৪টি করে মনোনয়ন পেয়েছিল। সেই রেকর্ড এবার ভেঙে দিল 'সিনার্স'।
এই হরর সিনেমার পটভূমি জিম ক্রো যুগের দক্ষিণ আমেরিকা। অভিনয়শিল্পীদের বড় অংশই কৃষ্ণাঙ্গ। ১৯৩০-এর দশকে মিসিসিপিতে ফিরে এসে একটি 'জুক জয়েন্ট' চালু করা দুই যমজ ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করে সেরা অভিনেতা বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছেন মাইকেল বি জর্ডান। সিনেমার গল্পে দেখা যায়, তাদের সেই 'জয়েন্ট'-এ হানা দেয় রক্তচোষা ভ্যাম্পায়াররা।
'সিনার্স'-এর অন্যান্য অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে ব্রিটিশ-নাইজেরিয়ান অভিনেত্রী উনমি মোসাকু এবং লন্ডনে বেড়ে ওঠা ডেলরয় লিন্ডোও মনোনয়ন পেয়েছেন। অভিনয় শাখায় পুরস্কার জয়ের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের আশা জাগিয়েছে এই জুটি।
পরিচালনা, চিত্রনাট্য ও প্রযোজন-গুরুত্বপূর্ণ এই তিন শাখায় মনোনয়ন পেয়েছেন সিনেমাটির পরিচালক রায়ান কুগলার। পাশাপাশি অস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ 'সেরা চলচ্চিত্র' শাখায় জায়গা করে নিয়েছে 'সিনার্স'।
পরিচালক কুগলার বলেন, “আমার বাবা মনোনয়ন অনুষ্ঠানে আমার পাশে বসেছিলেন। ঘোষণা শুরু হলে আঙুলে তিনি ক্যাটাগরির সংখ্যা গুণছিলেন। যখন তিনি ১৬ গুণে থামলেন, পাশ থেকে আমি বলেছি, ‘হতেই পারে না, সম্ভাবনা নেই’।
“বাবা বললেন, ‘আমার উপরে বিশ্বাস রাখো’।”
২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে ‘সিনার্স’ আলোচনায় আসে দ্রুত। চিত্রনাট্যটি যেন অলৌকিকভাবে পুর্নজন্ম ঘটনায়। খুব দ্রুতই বিশ্বজুড়ে ৩৬৮ মিলিয়ন ডলার আয় করে ফেলে। এর মধ্য দিয়ে ‘সিনার্স’ গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে সফল মৌলিক (অরিজিনাল) সিনেমা হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দশম সর্বোচ্চ আয় করা আর-রেটেড চলচ্চিত্র হয় ‘সিনার্স’। আর এই তালিকায় ‘টার্মিনেটর ২’ কিংবা ‘হ্যাংওভারস’ সিনেমাকেও টপকে গিয়েছে ‘সিনার্স’।
‘দ্য গার্ডিয়ান’ লিখেছে ‘সিনার্স’ একদিকে এটি যেমন হরর সিনেমা, অন্যদিকে ব্লুজ সংগীতনির্ভর মিউজিক্যাল, আবার একই সঙ্গে গ্যাংস্টার থ্রিলার। অর্থাৎ ত্রিশের দশকের মিসিসিপিকে কেন্দ্র করে নির্মিত গভীর গবেষণাভিত্তিক ঐতিহাসিক ড্রামা হল ‘সিনার্স’।
যে সময় কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস ও সংস্কৃতি ফের রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়েছে, সেই সময় ‘সিনার্স’ নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস, সংস্কৃতি মুছে ফেলা এবং বিনোদন শিল্পের রাজনীতি।
সোশাল মিডিয়ায় সিনেমার জুক-জয়েন্টের দৃশ্য নিয়ে বানানো মিম যেমন ছড়িয়ে পড়েছে। তেমনি ‘সিনার্স’ সিনেমাটি নিয়ে সমালোচনামূলক লেখাগুলোও বিশ্লেষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সংগীত ইতিহাসে এসব জায়গার অবমূল্যায়িত অবদান।
মার্ভেলের ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে খ্যাতি পাওয়া কুগলার ‘সিনার্স’ এর চিত্রনাট্য লিখেছেন মাত্র দুই মাসে। তবে এর পেছনে ছিল বহু বছরের ইতিহাস। মিসিসিপি ডেল্টার লোককথা, দাসপ্রথা-পরবর্তী সংস্কৃতি, ব্লুজ সংগীতের ইতিহাস- এসবের গভীর ছাপ রয়েছে ‘সিনার্স’ এ।
সিনেমটা শুট করা হয়েছে আইম্যাক্স ৭০ এমএম ফরম্যাটে এবং প্রায় ১০ কোটি ডলার বাজেট ছিল সিনেমা বানানোর জন্য। শুরুতে বহু মানুষ সংশয় প্রকাশ করেন ‘সিনার্স’ এর সাফল্য নিয়ে। কারো কারো শঙ্কা ছিল যে সিনেমাটি নাকি হলিউডকেই ‘ধ্বংস’ করে দিতে পারে।
বিনিয়োগ করায় ওয়ার্নার ব্রাদার্সকেও অনেকে ‘উন্মাদ’ বলেছিলেন। এছাড়া কুগলারকে সিনেমার ফাইনাল কাটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়ায় ও ২৫ বছর পর ছবিটির সম্পূর্ণ স্বত্ব তার হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তিও করা হয়।
এজন্য অনেকে ঘটনাটি স্টুডিও ব্যবস্থার জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত মনে করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছিলেন, এই সিনেমাই হতে পারে স্টুডিও সিস্টেমের শেষ অধ্যায়।

‘সিনার্স’ এর জন্মকথা
‘ক্রিড’ ও ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ এর সিনেমার নির্মাতা রায়ান কুগলার বরাবরই পরিচিত হলিউড ঘরানাগুলোকে নিজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে নতুন করে উপস্থাপনে।
কুগলার সম্পর্কে বলা হয়, তিনি দর্শকবান্ধব ভঙ্গিতে নতুন করে উপস্থাপন করতে পটু। তবে ‘সিনার্স’ সিনেমায় তিনি নিজেকে ভেঙেছেন।
কুগলারের প্রয়াত চাচা ছেলেবেলায় তাকে ব্লুজ সংগীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ব্লুজ সংগীতের বহু রেকর্ড ছিল কুগলারের চাচার সংগ্রহের সেখান থেকেই শুরু।
কুগলার ১৯৩০-এর দশকের আলোকচিত্র, নেটিভ আমেরিকান পৌরাণিক এবং দক্ষিণ আমেরিকায় বসবাসকারী চীনা অভিবাসীদের ইতিহাসে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। এসব নিয়ে কাজ করার নজির নেই হলিউডে।
সিনেমায় মুদি দোকানদার দম্পতির চরিত্রে অভিনয় করা মালয়েশীয় অভিনেতা ইয়াও এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমরা খুব খুশি ছিলাম, কারণ এখানে এশীয় চরিত্রগুলোকে স্টেরিওটাইপিক উচ্চারণ ছাড়াই ইংরেজিতে কথা বলতে দেওয়া হয়েছে।”
কস্টিউম ডিজাইনার রুথ ই. কার্টার, সেট ডেকোরেটর মনিক শ্যাম্পেন ও প্রযোজক হিসেবে কুগলারের স্ত্রী জিনজি-সবাই মিলে ‘সিনার্স’ এর দুনিয়া তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন।
সমালোচকদের ভাষ্য, কুগলার ইতিহাসের ভার ও ধর্মীয় প্রতীকগুলোকে সিনেমার ভেতরে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন, যাতে মূল গল্পের গতি ব্যাহত না হয়। যা তিনি করে থাকেন বরাবরের মত।
হেইলি স্টেইনফেল্ড ‘মেরি’ চরিত্রে অভিনয় করে চমক তৈরি করেছেন। এই চরিত্রটি এতটাই গভীর ছিল যে এই তিনি নিজের জাতিগত শেকড় সম্পর্কেও নতুন কিছু জানতে পারেন।
ডেলরয় লিন্ডো করেছেন ‘ডেল্টা স্লিম’ চরিত্রটি। তাকে নিয়ে বলা হচ্ছে
অতীতের সঙ্গে একধরনের অনুসন্ধানী সংযোগ তৈরি করেছেন লিন্ডো।
এই অভিনয়শিল্পীর কথায়, “সিনার্স এমন সব ইতিহাস উন্মোচন করেছে, যেগুলো এতদিন হয় মুছে ফেলা হয়েছিল, নয়তো গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছিল আমাদের কাছে।”
প্রচলিত সৌন্দর্য ধারণাকে ভেঙে দেওয়া উনমি মোসাকুর উপস্থিতি হলিউডের প্রচলিত ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসে। সেই যে ধারণা বলে আকর্ষণীয় নারীপ্রধান চরিত্র মানেই হবে তরুণ, ছিপছিপে ও ফরসা। গাঢ় ত্বকের, পরিণত বয়সী এই অভিনেত্রী প্রমাণ করেছেন, আকর্ষণ ‘একমাত্রিক হতে পারে না’।
আর মূল যমজ ভাইয়ের চরিত্রাভিনেতা মাইকেল বি. জর্ডান যেন নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন।
যদিও মাইকেলের ক্যারিয়ার দীর্ঘ পরিসরের ও সমৃদ্ধ। ‘সিনার্স’ সিনেমা দিয়ে কুগলারের সঙ্গে তৃতীয়বার জুটি বেঁধেছেন এই অভিনেতা
তবু এই ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে, স্মোকস্ট্যাক যমজ ভাই হয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন মাইকেল। শরীরী ভাষা ও কণ্ঠের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে দুই ভাইকে আলাদা করে তুলেছেন নিজের দক্ষতায়।।
গিটারবাদক মাইলস ক্যাটন বলেন, “মাইকেল যেভাবে দুই চরিত্রকে আলাদা করে গড়ে তুলেছিলেন, তাতে দুজনের সঙ্গেই আলাদা সম্পর্ক তৈরি করা আমার জন্য সহজ হয়। আমার কাজকে তিনি সহজ করে দেন বলা উচিত।”

প্রেক্ষাগৃহ বা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম-সব জায়গায় আলোচনার কেন্দ্রে ‘সিনার্স’। দর্শক প্রেক্ষাগৃহে দেখুন বা পরে এইচবিও ম্যাক্সেই দেখুন না কেন, ‘সিনার্স’ মানুষকে কথা বলিয়েছে।
বলা হয়েছে, ‘সিনার্স’ সময়কে ব্যাখ্যা করেছে, আবেগ ছুঁয়েছে। এ্বং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কৌতূহল জাগিয়েছে মনে। কুগলার সিনেমাটিকে একক প্রকল্প হিসেবে দাবি করেছেন।
কুগলার কদিন আগে এক খোলা চিঠি লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, “আমি সিনেমায় বিশ্বাস করি। প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি চলচ্চিত্র সমাজের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। ‘সিনার্স’ নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আমাকে অভিভূত করেছে এবং এই শিল্পে বিশ্বাস রাখা আরও অনেককে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।”
কে কী বলছেন
বিবিসি রেডিও ১-এর চলচ্চিত্র সমালোচক আলী প্লাম্ব বলেন, সর্বশেষ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হরর ঘরানার সিনেমা হিসেবে দ্য সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছিল।
“সে তো বহু আগের কথা। ইন্ডাস্ট্রিজুড়ে ‘সিনার্স’ টিমকে এভাবে প্রশংসিত ও সমাদৃত হতে দেখাটা সত্যিই দারুণ।”
প্লাম্ব বলেন, এটি 'কেবলই একটি হরর সিনেমার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। যদিও এখানে ভ্যাম্পায়ার রয়েছে, কিন্তু এর বাইরেও সিনেমাটিতে আরও বহু স্তর ও অর্থ আছে। ইতিহাসের গভীর বোধ তুলে এসেছেন নির্মাতা।
বিবিসির সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক কেটি রাজাল বলেন, তার দৃষ্টিতে এটি রিভেঞ্জ থ্রিলারের সঙ্গে এক অনবদ্য মিশ্রণ।
“এখানে আমেরিকার বর্ণবাদ, অশুভের বিরুদ্ধে শুভর লড়াই, সঙ্গীতের শক্তি এবং পাপমোচনের বিষয়গুলো উঠে এসেছে এক আবেদনময় মিউজিক্যাল যাত্রার মধ্য দিয়ে।”
তিনি আরও বলেন, “কে ভাবতে পেরেছিল, ভ্যাম্পায়ার, কে কে কে (বর্ণবাদী গোষ্ঠী), সাবেক গ্যাংস্টার যমজ ভাই (দুটি চরিত্রেই মাইকেল বি জর্ডান), মিসিসিপি বদ্বীপের লোককথা আর ব্লুজ সঙ্গীতের ইতিহাস, সবকিছু একসঙ্গে মিশে এমন দুর্দান্ত কিছু তৈরি হবে?”
অস্কারের মনোনয়নে রেকর্ড ভেঙেছে হরর সিনেমা 'সিনার্স'
অস্কার ২০২৬: মনোনয়নে যারা এবং যেসব সিনেমা