Published : 27 May 2026, 01:57 PM
বলিউডে ‘ব্যান’ হওয়ার পরে চামুণ্ডেশ্বরী মন্দিরে পুজা দিয়েছেন অভিনেতা রাণবীর সিং।
পুরোহিতের সঙ্গে মাটিতে বসে অভিনেতার পূজা দেওয়ার ভিডিও সামনে এসেছে।
ফারহান আখতারের ‘ডন ৩’ থেকে রাণবীর হঠাৎ সরে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে ‘ফেডারেশন অফ ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনে এমপ্লয়িজ’ (এফডব্লিউআইসিই) এর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার পর মন্দিরে প্রার্থনায় পাওয়া গেল এই অভিনেতাকে। তবে রাণবীরের মুখ থেকে বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো আসেনি।
এনডিটিভি লিখেছে, চামুণ্ডেশ্বরী মন্দিরে তার সফর গোপন রাখা হয়েছিল, কিন্তু আলোকচিত্রীদের ক্যামেরার লেন্স থেকে বেঁচে যাওয়া কঠিন ব্যাপার।
‘এফডব্লিউআইসিইয়ের’ পক্ষ থেকে মঙ্গলবার রাণবীরের বিরুদ্ধে ‘নন-কো-অপারেশন’ নির্দেশিকা জারি করেছে। অর্থাৎ, সংগঠনের সদস্যদের রাণবীরের সঙ্গে কাজ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এফডব্লিউআইসিই জানিয়েছে, ‘ডন’ সিনেমা নিয়ে উপস্থিত হয়ে কথা বলার জন্য রাণবীরকে একাধিকবার চিঠি পাঠানো সত্ত্বেও অভিনেতা সংস্থার সামনে হাজির হননি।
কিন্তু রাণবীর বলেছিলেন ‘ডন-৩’ নিয়ে বিতর্ক মূলত চুক্তিগত এবং তা মেটানোর জন্য ‘এফডব্লিউআইসিই’ সঠিক জায়গা নয়।
এফডব্লিউআইসিইয়ের সদস্য কারা
ভারতের চলচ্চিত্র ও ছোটপর্দার জগতে কর্মী ও টেকনিশিয়ানদের নিয়ে ভারতের অন্যতম বড় সংগঠন হল ‘ফেডারেশন অফ ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনে এমপ্লয়িজ’ (এফডব্লিউআইসিই)। এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা পায় ১৯৫৮ সালে। এর প্রধান কার্যালয় মুম্বাইয়ে।
এই সংগঠনে রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখের বেশি কর্মী। এই সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন স্পটবয়, প্রসাধনী শিল্পী, জুনিয়র আর্টিস্ট, নৃত্যশিল্পী, স্টান্ট পারফর্মার, সম্পাদক, লাইটম্যান, চিত্রগ্রাহক, পোশাকশিল্পী, লেখক, সহকারী পরিচালক-সহ অন্য কলাকুশলীরাও।
চলচ্চিত্রজগতের কর্মীদের অধিকার, পারিশ্রমিক এবং কাজের পরিবেশ রক্ষা করার কাজ করে এফডব্লিউআইসিই। এই সংগঠন কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা যেমন পারিশ্রমিক দিতে কালক্ষেপণ করা, চুক্তিভঙ্গ এবং শিল্পী-প্রযোজকদের মধ্যে তৈরি হওয়া নানা সমস্যা সমাধানের জন্য হস্তক্ষেপ করে। এফডব্লিউআইসিইয়ে আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে বলা আছে, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে আইন এনে চলচ্চিত্রজগতের লোকজনের অধিকার সুরক্ষিত করাও তাদের কাজ।
তবে বলিউডের বেশিরভাগ অভিনেতা সরাসরি এফডব্লিউআইসিইয়ের সদস্য নন। যদিও এই সংগঠন মূলত সিনেমা জগতের কর্মী এবং টেকনিশিয়ানদের প্রতিনিধিত্বই করে।
আর অভিনেতাদের অন্যতম বড় সংগঠন হল ‘সিনে অ্যান্ড টিভি আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন’। অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান এবং রাণবীর সিংয়ের মতো বহু জনপ্রিয় অভিনেতা এফডব্লিউআইসিই-এর বদলে ‘সিনে অ্যান্ড টিভি আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন’ এর সঙ্গে যু্ক্ত আছেন।

এফডব্লিউআইসিইয়ের অভিযোগ হল ‘ডন ৩’ নিয়ে তৈরি হওয়া সমস্যা মিটমাট করতে রাণবীর কোনো সহযোগিতা করেননি।
‘ধুরন্ধর’ সাফল্যের পর ফারহান আখতারের ‘ডন ৩’ সিনেমা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন রাণবীর। শাহরুখ খানের জায়গায় জনপ্রিয় ফ্র্রাঞ্চাইজিতে তার অভিনয় করার কথা ছিল। সে সময়ও শাহরুখের জায়গায় রাণবীরকে আসার খবরে আলোচনা শুরু হয়। কেউ বলেছিরেন শাহরুখের ‘ডন’-কে ছাপিয়ে যাওয়া সহজ নয়। আবার অনেকে মনে করেছিলেন, নতুন প্রজন্মের জন্য চরিত্রটিকে অন্য ভাবে তুলে ধরতে পারবেন রাণবীর।
তার পর ধীরে ধীরে সিনেমাটি ঘিরে একাধিক সমস্যার খবর প্রকাশ্যে আসে। শোনা যায়, সিনেমার অ্যাকশন ও মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের জন্য অতিরিক্ত সময় চাইছিলেন রাণবীর। একই সময়ে ফারহানও ব্যস্ত ছিলেন তার অন্য সিনেমা ‘১২০ বাহাদুর’-এর কাজে। ফলে ‘ডন ৩-এর শুটিং পিছিয়ে যেতে থাকে। প্রথমে চলতি বছরে শুরুতে শুটিং শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা আর সম্ভব হয়নি। এর পর খবর আসে চিত্রনাট্য নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন রাণবীর। বিশেষ করে সংলাপের ভাষা, হিংসা এবং কিছু দৃশ্য নিয়ে তার আপত্তি ওঠে। এরপর আচমকা রাণবীর ‘ডন-৩’ থেকে সরে দাঁড়ান।
তত দিনে সিনেমা প্রি-প্রোডাকশনে বিপুল অর্থ খরচ হয়ে গিয়েছে। লোকেশন বাছাই, টেকনিক্যাল পরিকল্পনা, প্রোমো শুটসহ নানা কাজে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি রুপি খরচ হয়। অভিযোগ ওঠে রাণবীর শুরু থেকেই স্ক্রিপ্টের প্রতিটি ধাপে সম্মতি দিয়েছিলেন। ফলে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ানোয় ক্ষতির মুখে পড়তে হয় প্রযোজনা সংস্থাকে।
এর পর ফারহান দ্বারস্থ হন এফডব্লিউআইসিইয়ের কাছে। অভিযোগ জমা পড়ে ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন; বা আইএফটিডিএ-এর মাধ্যমে; যেখানে ফরহান নিজেও সদস্য। সংগঠনের পক্ষ থেকে রাণবীরকে একাধিক নোটিস পাঠানো হয়েছিল বলেও জানা যায়।
সিনেমার কাজ থেমে যাওয়ায় রাণবীর সিংয়ের থেকে ফেব্রুয়ারি মাসেই ৪৫ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলেন ফারহান আখতার এবং রীতেশ সিধওয়ানি। যদিও ‘প্রোডিউসার্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া’র বৈঠকে ‘সেই টাকা দেওয়া আমার দায় নয়’ বলে সরে গিয়েছিলেন রাণবীর।
পরে তিনি ১০ কোটি টাকা দিয়ে মিটমাট করাতে চেয়েছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মেটেনি। তাই এফডব্লিউআইসিই-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যতদিন না প্রযোজনা সংস্থাকে রণবীর ৪৫ কোটি টাকা মেটাচ্ছেন, ততদিন পর্যন্ত নিষিদ্ধ থাকবেন অভিনেতা।

রাণবীরের ক্যারিয়ারে কী প্রভাব পড়তে পারে
তবে এই নির্দেশনা আইনগতভাবে কতটা কার্যকর, আর এর ফলে রাণবীরের ক্যারিয়ারে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েই এখন জোর আলোচনা চলছে বলিউডে।
বলিউডে সিনেমা নির্মাণের বড় অংশই নির্ভর করে টেকনিশিয়ানদের উপর। তাই তারা কাজ করতে রাজি না হলে ভবিষ্যতে রাণবীরের কাজের উপর যথেষ্ট প্রভাব পড়তে পারে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা একান্তই ওই সংগঠনের তরফ থেকে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো রকমের নিষেধাজ্ঞা নেই তার উপর। তাই রাণবীর কাজ চালিয়েই যেতে পারেন। কিন্তু কলাকুশলীদের সিদ্ধান্তের উপর সবটা নির্ভর করছে বলে থমকে যেতে পারে তার আসন্ন সিনেমাগুলোর কাজ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সংগঠন মূলত মধ্যস্থতাকারী বা চাপ প্রয়োগকারী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করে। বেতন ভাতা কাজের পরিবেশ বা পেশাগত বিরোধে ভূমিকা রাখে সংগঠনটি। তবে কোটি টাকার চুক্তিভঙ্গ বা ক্ষতিপূরণের বিষয় শেষ পর্যন্ত আদালত বা সালিসি বোর্ডেই নিষ্পত্তি হয়ে থাকে।।
রাণবীরের অবস্থান আইনিভাবে শক্তিশালী হতে পারে। কারণ চুক্তিগত বিরোধে সংগঠনের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই বলে মনে করেন তিনি। অন্যদিকে সংগঠনটির দাবি, তারা কেবল ‘ডন ৩’ নয়, বরং শিল্পী হিসেবে রাণবীরের আচরণ ও আলোচনায় অংশ না নেওয়ার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাণবীরের অনুরাগীরা মনে করছেন, ‘ধুরন্ধর’-এর সাফল্যের জন্যই এই ভোগান্তি হচ্ছে অভিনেতার। আবার একদলের বক্তব্য প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরেও এভাবে সিনেমা থেকে বেরিয়ে যাওয়া যায় না।
এদিকে হংসল মেহতা প্রযোজিত ও জয় মেহতা পরিচালিত রাণবীরের নতুন পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক থ্রিলার সিনেমার শুটিং শুরু হওয়ার কথা রয়েছে অগাস্ট মাসে।