Published : 25 Jul 2025, 01:30 AM
রাজধানীর উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে বাড়িভিত্তিক শুটিং কার্যক্রম বন্ধ করতে বাড়ি মালিকদের ‘অনুরোধ’ জানিয়েছে স্থানীয় কল্যাণ সমিতি।
সম্প্রতি উত্তরা কল্যাণ সমিতি সেক্টর চারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে শুটিং হাউজ পরিচালনা ‘নীতিমালার পরিপন্থি’ এবং তা এলাকাবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ‘ব্যাহত’ করছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, শুটিং চলাকালে রাস্তায় জনসমাগম তৈরি হচ্ছে, যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং আশপাশের বাসিন্দারা ‘বিরক্তি ও নিরাপত্তাহীনতায়’ ভুগছেন। এ ছাড়া ‘পরিবেশের শান্তি ও সুনিশ্চিত নিরাপত্তা’ ব্যাহত হচ্ছে।
কল্যাণ সমিতি চিঠিতে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিকদের উদ্দেশে লিখেছে, “সেক্টরবাসীর ক্রমবর্ধমান অভিযোগ ও সবার নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় এনে শুটিং কার্যক্রম অনতিবিলম্বে বন্ধ রাখা প্রয়োজন। এটি বন্ধে বাড়ির মালিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি।”
সেক্টর-৪ এলাকায় বর্তমানে তিনটি শুটিং হাউস রয়েছে—লাবণী-৪, লাবণী-৫ ও আপনঘর-২।
উত্তরায় বহু বছর ধরেই শুটিং হচ্ছে, এখন হঠাৎ শুটিং বন্ধের নোটিস কেন দেওয়া হল, তা জানতে চাইলে সমিতির প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী গ্লিটজকে বলেন, “আমাদের এটা আবাসিক এলাকা। বেশ কিছুদিন ধরে স্থায়ী বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন।
“শুটিংয়ের সময় বিভিন্ন মানুষের সমাগম হয়, গাড়ি চলে, এতে সমস্যা হয়। অনেক রাত পর্যন্ত শুটিং করা হয়, এমন সব ঘটনা ঘটে মানুষকে আতংকিত করে তোলে। অসুবিধা বাড়ছে বলেই চিঠি দেওয়া হয়েছে, যেন শুটিং স্পটগুলো বাইরে নেওয়া হয়।”
শুটিং হাউজ বন্ধের চিঠির বিষয়ে প্রশ্ন করলে লাবণী চার শুটিং হাউজের মালিক আসলাম হোসেন গ্লিটজকে বলেন, “আমরা চিঠি পেয়েছি। আমার বাড়িটি ১২ নম্বর রোডে। কিছু দিন আগে একজন পরিচালক রাতের বেলা মশাল নিয়ে একটি মিছিলের দৃশ্য শুট করছিলেন।
“রাতের বেলায় মশাল জ্বালানোর ঘটনাটি দেখে আশপাশের মানুষ কিছুটা আতংকিত ও বিস্মিত হয়। তারা বুঝতে পারেনি এটি শুটিং। কেউ কেউ ভিডিও করে সেটি কল্যাণ সমিতিকে জানায়।"

সেই ঘটনার পর সমিতি থেকে শুটিং হাউজ মালিকদের ডাকা হয় জানিয়ে আসলাম বলেন, "কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে আমাদের ফোন করে অফিসে ডাকা হয়। কিন্তু আমি তখন বাড়িতে ছিলাম, পরে তারা চিঠি দিয়ে জানায়, রাস্তায় দিনে হোক বা রাতে শুটিং করা যাবে না।"
আসলাম জানান, ওই চিঠি পাওয়ার পর আপনঘর শুটিং হাউজের মালিক খলিল সমিতিকে চিঠির জবাব দেন। মশাল মিছিলের দৃশ্যধারণের জন্য ‘ভুল স্বীকার’ করেন।
"খলিল ভাই সেই চিঠিতে বিষয়টিকে একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে বর্ণনা করেন। ভবিষ্যতে এমন কিছু আর ঘটবে না, সেই প্রতিশ্রুতি ও দেন।"
গভীর রাত পর্যন্ত শুটিং হয়––এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। শুটিংয়ের সময়সীমা মানা হয় না কেন––এ প্রশ্নে আসলাম বলেন, "আমরা ৯ টা পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছি। কিন্তু নাটকের কাজ শেষ করতে সময় লেগে যায়। যারা কম বাজেটে কাজ করেন, তারা এক বা দুই দিনের জন্য সময় নেন, এতে করে ৯টার মধ্যে শুট শেষ করা সম্ভব হয় না। তখন ২-৩টা পর্যন্ত গড়ায় শুটিং।”
চিঠির সিদ্ধান্তকে 'অনায্য' দাবি করে শুটিং বাড়ির এই মালিক লেন, “কল্যাণ সমিতির লোকজন যেন সরকারের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে। এসবের জন্য সিটি করপোরেশন, প্রশাসন আছে। এখানে বহু বছর ধরে শুটিং করে আসছি। আমরা তো কখনো কারো অসুবিধা করিনি, বরং সবার সঙ্গে সমন্বয় করে চলেছি। আমরা পরিচালকদের সংগঠনে জানিয়েছি। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’”

ডিরেক্টরস গিল্ডের সভাপতি শহীদুজ্জামান সেলিম বলেন, “এভাবে হঠাৎ করে চিঠি দিয়ে শুটিং বন্ধ করা ঠিক হয়নি। আমরা চিঠির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাব এবং হাউস মালিকদের সঙ্গে বসে সমাধানের পথ খুঁজে বের করব।”
অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপুও এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “এটা অনাকাঙ্ক্ষিত, আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শুটিং হাউসে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই যে শুটিং হচ্ছে। আমরা নিজেরাও নয়েজ ফ্রি পরিবেশে কাজ করি। কল্যাণ সমিতির ওই দাবি ভিত্তিহীন।”
অপু বলেন, “দ্রুতই সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো আলোচনায় বসবে। ফলপ্রসূ না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
সমিতির ওই নির্দেশনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ফেইসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী।
অভিনেতা রওনক হাসান লিখেছেন, "উত্তরা সেক্টর ৪ কল্যাণ সমিতি থেকে শুটিং বন্ধের নোটিস এসেছে। আবাসিক এলাকায় নানান রকম অফিস হয়। শত শত স্কুল হয়, মাল্টিটাইপ ব্যবসা হয়। শুধু শুটিংয়ে সমস্যা! আগেও এ ধরনের চেষ্টা হয়েছে।
"সেগুলো সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো স্থানীয় সংসদ সদস্য, সিটি করপোরেশন এবং পুলিশ প্রশাসন মিলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করে সমাধান করেছেন। এবারও আশা করি তাই হবে। সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।"
নির্মাতা মাহমুদ দিদার লিখেছেন, "শুটিং হাউস বন্ধ করে দিতে বলেছে। অনেক বছর ধরে উত্তরায় শুটিং হয়! কোনো কমপ্লেইন ছিল না। এখন চলবে না এসব! ঘুমের ডিস্টার্ব হয়। আমার ধারণা, এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের যে শুটিং কালচার, এটা আর থাকবে না। এটা কেবল আলামত! উত্তরা কিংবা পুবাইল—দুঃসময় এল বলে!"
চয়নিকা চৌধুরী লিখেছেন, "কী? কেন? এটা কেমন কথা। গত ২৪ বছরে এমন কথা শুনিনি।"
এই নিষেধাজ্ঞা শিল্পসংস্কৃতির বিকাশে ‘বাধার শামিল’ বলে মনে করছেন আরেক পরিচালক তপু খান।
তিনি লিখেছেন, "আমাদের অনেকের স্মৃতিবিজড়িত শুটিং হাউস উত্তরার লাবণী ৪। এই হাউসের আসলাম ভাই আমার দেখা অন্যতম ভালো এবং নিরীহ মানুষ। সেখানে শুটিং না করার জন্য অনুরোধ করেছেন উত্তরা সেক্টর কর্তৃপক্ষ (হয়ত আরও অনেককেই বলেছেন)। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে অনুরোধ করছি জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য।"
নির্মাতা এস এ হক অলিক, অনন্য মামুন,সেতু আরিফ,সাইফ চন্দনসহ অনেকে ওই চিঠি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।