Published : 05 Mar 2026, 10:18 PM
‘অনেক সাধের ময়না আমার’, ‘আমাকে পোড়াতে যদি এত লাগে ভালো’, ‘আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে’, ‘যারে যাবি যদি যা'সহ বহু কালজয়ী গানের শিল্পী ও সুরকার বশির আহমেদ এবছর পাচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’।
এই সম্মাননা প্রাপ্তির খবরের প্রতিক্রিয়া জানতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কথা হয় শিল্পীর মেয়ে হোমায়রা বশির ও ছেলে রাজা বশিরের সঙ্গে।
হোমায়রা দেশে থাকেন, ছেলে রাজা অস্ট্রেলিয়ায়। হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় দুইজনের সঙ্গে। দুজনই বাবা বশির আহমেদ ও মা মীনা বশিরের পথ ধরে সংগীতাঙ্গনে এসেছেন। বাবার কাছেই তাদের হাতেখড়ি ও গান শেখা। সেটা ধরে রেখে নিয়মিত গান করে যাচ্ছেন তারা।

বাবা স্বাধীনতা পদক পাচ্ছেন খবরটি শুনে কেমন অনুভূতি হচ্ছে প্রশ্নে হোমায়রা বলেন, “আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া, আলহামদুলিল্লাহ। সবই আল্লাহর ইচ্ছে। এই সম্মাননার উপরে তো আর কিছু হতে পারে না। অসম্ভব খুশি হয়েছি। আবার একইভাবে আম্মি ও পাপাকে খুব মনে পড়ছে, সবাই একসঙ্গে থাকলে এই খুশির মাত্রাটা অনেক অনেক বেশি হত।”
ছেলে রাজা বশির বলেন, “পুরো বাংলাদেশের প্রতি, সরকারের প্রতি, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, শিল্পী সমাজ বাবাকে এই সম্মাননা ও ভালোবাসা দেওয়ার জন্য আমাদের বশীর আহমেদ পরিবার সত্যিই খুব কৃতজ্ঞ।”
দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার ও হৃদরোগে ভোগার পর ২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল ৭৪ বছর বয়সে মারা যান বশির আহমেদ। দেশের সংগীতশিল্পী হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ অবদানের জন্য ২০০৫ সালে একুশে পদক পান তিনি।
বাবার একুশে পদক গ্রহণের স্মৃতি তুলে ধরে রাজা বশির বলেন, “পাপা যখন একুশে পদক পেলেন, এমন দিনেই হঠাৎ করে উনার কাছে খবরটা আসল, আব্বা একুশে পদক পাচ্ছেন। সেদিন সবথেকে বেশি আম্মা খুশি হয়েছিলেন।
“আজকে আমরা ওই বিষয়টাই মিস করছি। আজকে যদি উনারা বেঁচে থাকতেন সেই বিষয়টাই পুনরাবৃত্তি হত।”

আবেগপ্রবণ হয়ে হোমায়ারা বলেন, “আব্বার খুশির চেহারাটা যদি দেখতে পেতাম, হয়ত এই পুরস্কারটা নেওয়ার সময় আব্বা নিজের হাতেও নিতেন না, আম্মার হাত দিয়ে পুরস্কারটা নিতেন। আমরাও আবদার করতাম, আজকে বাইরে খেতে যাব। আব্বা আমাদের সবথেকে সুন্দর জায়গায় নিয়ে যেতেন। আনন্দ হচ্ছে কিন্তু আব্বাকে ধরতে পারছি না, জড়িয়ে ধরে উল্লাস করতে পারছি না। আমি কিন্তু একই বাসায় বসা, শুধু আব্বা-আম্মা নেই।”
বশির আহমদের পরিবার শিল্পী পরিবার। স্ত্রী মীনা বশিরও ছিলেন কণ্ঠশিল্পী। বশিরের মৃত্যুর চার মাসের মাথায় তিনিও পরপারে চলে যান।
বাবা স্বাধীনতা পদক পেতে পারেন এমন কোনো প্রত্যাশা ছিল কি না প্রশ্নে হোমায়রা বলেন, “না এরকম ভাবনা আমাদের ছিল না। আব্বা সবসময় বলতেন, ভক্তদের কাছ থেকে তিনি যে ভালোবাসা, যে আন্তরিকতা তিনি পেয়েছেন, এটাই ছিল বাবার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তির জায়গা। কখনো পুরস্কার নিয়ে ইচ্ছে প্রকাশ করতে আমরা দেখিনি। কখনো আমাদের বলেননি, ‘আমি এটা পেলে খুব ভালো লাগত’। তবে আম্মা সবসময় আব্বাকে নিয়ে গর্ব করতেন। উনার হয়ত বিশ্বাস ছিল, আব্বার এমন অর্জন হবে।”

বশির আহমেদ সম্মাননা পদক
বাবার সংগীত সাধনাকে আজীবন অম্লান রাখতে ২০১৯ সাল থেকে তাদের পরিবার ‘বশির আহমেদ সম্মাননা পদক’ দিচ্ছে।
পদকটি মোট সাত থেকে আটটি ক্যাটাগরিতে দেওয়া হয়, যার মধ্যে সুরকার, গীতিকার, শিল্পী, সাংবাদিক, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, প্রবাসী বাঙালি এবং যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী অন্তর্ভুক্ত।
হোমায়রা বলেন, “এই সম্মাননার প্রথম পদকটি আমরা শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের হাতে তুলে দিতে পেরেছিলেন, এটা আমাদের পরিবারের জন্য একটি বড় সাফল্য ছিল। ফেরদৌসী রহমান নিজেও এই সম্মাননা পেয়ে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। আমাদের এই উদ্যোগকে সম্মান জানিয়েছেন।”
হুমায়রা ও রাজা দুজনেই বাবার রেখে যাওয়া ‘সারগাম মিউজিক্যাল একাডেমি’ এবং ‘সারগাম সাউন্ড স্টেশন’ এর মাধ্যমে বশির আহমেদের সংগীতকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ করছেন।
সারগাম মিউজিক্যাল একাডেমি বশির আহমেদের প্রতিষ্ঠিত সংগীত স্কুল, যেখানে হুমায়রা ও রাজা দুইজনেই সংগীতের শিক্ষা দিচ্ছেন। সারগাম সাউন্ড স্টেশন একটি মিউজিক চ্যানেল ও স্টুডিও, যা বাংলাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে পরিচালিত হচ্ছে।
বাবার স্বাধীনতা সম্মান গ্রহণ করতে চলতি মাসেই দেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন রাজা।
বশির আহমেদের জন্ম কলকাতার খিদিরপুরে। সওদাগর পরিবারে। ১৯৩৯ সালে। উর্দু ছিল তার পরিবারের ভাষা। গানের হাতেখড়ি ওস্তাদ বেলায়েত হোসেন খানের কাছে। গানের জন্য চোদ্দ-পনেরো বছর বয়সে পাড়ি জমান বোম্বে (মুম্বাই)।
১৯৯৭ সালে লিয়াকত হোসেন খোকনকে এক সাক্ষাৎকারে বশির আহমেদ বলেছিলেন, “সে বয়সে গান ছাড়া আর কিছুই বুঝতাম না। গান আমাকে পেয়ে বসেছিল। রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল গান। বাবা-মাকে না বলেই এক অর্থে পালিয়ে চলে গেলাম। বোম্বে গিয়ে উঠলাম গীতিকার রাজা মেহেদীর বাসায়। তিনি আমাকে ছেলের মতো জানতেন। সুরকার নওশাদের সহকারী ছিলেন মোহাম্মদ শফি। তাঁর সঙ্গেও আমার পরিচয় ঘটল। তিনিই আমাকে গান গাওয়ার সুযোগ করে দিলেন। বোম্বেতে থাকাকালীন সেই ১৯৫৪-৫৫ সালে গীতা দত্ত, আশা ভোঁসলের সঙ্গে ডুয়েট গান গাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তালাত মাহমুদের সঙ্গে সে সময় আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।”
মুম্বাইতে বড়ে গোলাম আলী খাঁর কাছেও তালিম নেওয়ার সুযোগ ঘটে তার।
১৯৬০ সালে তালাত মাহমুদের সঙ্গে ঢাকা আসেন গান গাওয়ার জন্যে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তারা একসঙ্গে স্টেজে গান করেন। তারপর ফিরে গেলেও গানের টানেই কিছুদিন পরপর ঢাকা আসতেন বশির আহমেদ। এই আসা-যাওয়ার মধ্যে এখানে উর্দু চলচ্চিত্র ‘তালাশ’-এ (১৯৬৩) গান গাওয়ার সুযোগ পান।
এদেশে তৎকালীন সময়ে উর্দু চলচ্চিত্র নির্মিত হত নিয়মিত। আর উর্দু ছবির গানের প্রয়োজনেই কদর বাড়তে শুরু করল বশির আহমেদের। তার কণ্ঠটিও ছিল উর্দু গানের। ‘তালাশ’ ছবিতে নায়ক রহমানের ঠোঁটের সবগুলো গান গেয়েছিলেন তিনি। একটি গান ছিল-‘কুছ আপনি কাহিয়ে, কুছ মেরি সুনিয়ে’। এরপর জহির রায়হানের উর্দু ছবি ‘সঙ্গম’ (১৯৬৪)-এ গান করেন।

বশির আহমেদ উর্দুভাষার গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পীও। উর্দু চলচ্চিত্র ‘কারওয়াঁ’ (১৯৬৪)-তে তার নিজের লেখা ও সুরে ‘যব তুম আকেলে হোগে হাম ইয়াদ আয়েঙ্গে’ জনপ্রিয় হয়। অন্য আরও উর্দু চলচ্চিত্রে কাজ করলেও ‘দরশন’ (১৯৬৭) তাকে নিয়ে যায় খ্যাতির শীর্ষে। এই চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন তিনি। বাংলা চলচ্চিত্রেও সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন তারপরেই।
‘ময়নামতি’ (১৯৬৯) চলচ্চিত্রে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘ডেকো না আমারে তুমি কাছে ডেকো না’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’। ‘মধুমিলন’ (১৯৭০) চলচ্চিত্রে শহীদুল ইসলামের লেখা ও ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া ‘কথা বলো না বলো ওগো বন্ধু/ছায়া হয়ে তবু পাশে রইব’- গানগুলো সুরস্রষ্টা বশির আহমদের উচ্চমানতার নিদর্শন।
২০০৩ সালে তিনি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন।
বশির আহমেদের সুরে গান করেছেন ফেরদৌসী রহমান, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন থেকে শুরু করে তরুণ অনেক শিল্পী। একইভাবে আবদুল আহাদ, খান আতাউর রহমান, খন্দকার নুরুল আলম, সুবল দাস, রবীন ঘোষ, সত্য সাহা, আজাদ রহমান থেকে শুরু করে ইমন সাহার মত তরুণ সুরকারের গানও করেছেন বশির আহমেদ।