Published : 03 Dec 2025, 11:23 PM
মগনলাল মেঘরাজের ডেরায় জটায়ুকে দাঁড় করানো হয়েছে গোল চাকতিতে পিঠ ঠেকিয়ে। উল্টো দিকে ছোরা হাতে দাঁড়িয়ে মগনলাল বৃদ্ধ শাগরেদ ‘অর্জুন’ কামু। অর্জুনের হাতের ছোরা একে একে গিয়ে বিঁধছে জটায়ুর আশপাশে। অথবা ট্রেনের কামরায়, ফেলুদা আর তোপসের সঙ্গে হিন্দি বলার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জটায়ু।
এই দুই দৃশ্যের সিনেমা ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথে’ সত্যজিৎ রায় যাকে কিংবদন্তিতুল্য করেছেন, তিনি সন্তোষ দত্ত। তার জন্মশত বার্ষিকী গেছে মঙ্গলবার। সত্যজিৎ যাকে গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্রে সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন।

ফেলুদার দুই ছায়াসঙ্গী একজন জটায়ুর চরিত্রে রূপদানকারী সন্তোষ দত্ত ছিলেন বহুমাত্রিক এক অভিনেতা। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’ লিখেছে, তার জন্ম ১৯২৫ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকায়। মারণব্যধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এই পৃথিবী তিনি ছাড়েন ১৯৮৮ সালের ৫ মার্চ।
প্রথম জীবনে ব্যাংকের চাকরি করেছেন টানা ১৪ বছর। উরিষ্যায় বদলির আদেশ হলে চাকরিই ছেড়ে দেন। ওকালতি নিয়ে পড়াশোনা থাকায়, ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে আইনজীবী হয়ে যান।
সন্তোষ দত্তের জন্মশত বার্ষিকী উপযাপনে আয়োজনে স্বপ্লতা রয়েছে বলে আফসোস করেছেন অভিনেতা অনির্বাণ।

কলকাতার পরিচালক সৃজিত মুখার্জি পরিচালিত ফেলুদার সিনেমায় ‘জটায়ু’ চরিত্রে অভিনয় করা অনির্বাণ চক্রবর্তী বলেন, সন্তোষ দত্তের অভিনয়ের প্রতি তিনি মুগ্ধ ছিলেন ছোটবেলা থেকে।
তার কথায়, “সন্তোষ দত্তকে নিয়ে আমরা একটু কম উদযাপন করি। এ ক্ষেত্রে আমার একটা বিষয় মনে হয়। কৌতুক চরিত্রে যারা অভিনয় করেন, তাদের নিয়ে একটু কম ভাবা হয়। সিরিয়াস অভিনেতাদের যে ভাবে দেখা হয়, কৌতুক চরিত্রাভিনেতাদের নিয়ে সেই তুলনায় চর্চা কম হয়।

“সন্তোষ দত্তকে কিন্তু কোনও ভাবেই কৌতুকাভিনেতা বলা যাবে না। কিন্তু তিনি যেহেতু জটায়ু চরিত্রে জনপ্রিয়, তাই তাকে ওই গোত্রেই ফেলা হয়। তাঁদের প্রতি আমাদের মূল্যায়নটাও একটু বদলে যায়। সন্তোষ দত্তের জন্মশতবর্ষ অথচ সে ভাবে কোনও উদযাপন নেই, সেটাই তার প্রমাণ।”
অনির্বাণ বলেন, “যে চরিত্রটির জন্য সন্তোষ দত্ত অমর হয়ে রয়েছেন, সেই একই চরিত্রে আমি অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছি। এ আমার পরম পাওয়া। নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান বলে মনে হয়।”
তিনি বলেন, “সৃজিত মুখোপাধ্যায় যখন প্রথম এই চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ দিলেন, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম আদৌ পারব কি না। তবে এটা মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম, যেমনই অভিনয় করি না কেন সন্তোষ দত্তকে নকল করব না। সৃজিতের সঙ্গে বসে সেটা নিয়ে বহুবার আলোচনাও করেছি।

“উনি যেভাবে চরিত্রটিকে অমর করে দিয়েছেন, ফলে নকল করতে গেলে খুব ব্যর্থ একটা প্রয়াস হত। তার চেয়ে আমি আমার মত করে করার চেষ্টা করেছি।”
সন্তোষ দত্ত অভিনীত সেরা চরিত্রগুলোর মধ্যে ওপরের দিকে ভাবা হয় সত্যজিতের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার গবেষক চরিত্রটি। সত্যজিতের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমা হাল্লার রাজা তিনি। আবার শুণ্ডির রাজাও তিনিই।

তবে সন্তোষ দত্তের প্রতিভা যে কেবল সত্যজিৎ রায়ের সীমায় আটকে ছিল না! পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘মালঞ্চ’, অমল শূরের ‘গোপাল ভাঁড়’, পীযূষ বসুর ‘সিস্টার, ব্রজবুলি’, তরুণ মজুমদারের ‘গণদেবতা’, সলিল দত্তের ‘ওগো বধূ সুন্দরী’, উমানাথ ভট্টাচার্যের ‘নবীন মাস্টার’, ‘চারমূর্তি’, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘ঘটকালি, ‘হুলস্থুলু’, বা ‘সুবর্ণলতা’ বহু সিনেমা জনপ্রিয় হওয়ার পেছেনে সন্তোষ দত্তের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেছেন সিনেমার বিশ্লেষকরা।