দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ১.৮৫ শতাংশ, এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন
আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতসহ ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জুলাইয়ে এডিপিতে বরাদ্দের কোনো অর্থই খরচ করতে পারেনি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে, যা দুই মাসের হিসাবে এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন।
১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-অগাস্ট সময়ে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা খরচ করেছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভাগ, যা মোট এডিপির মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
সোমবার প্রকাশিত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
৩০ জুন শেষ হওয়া গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-অগাস্ট সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ; খরচ হয়েছিল ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস অগাস্টে বিভিন্ন প্রকল্পের অনুকুলে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা; যা মোট এডিপির ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। প্রথম মাস জুলাইয়ে খরচ হয়েছিল ৪ হাজার ৭০ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যা ছিল এডিপির ১ দশমিক ৭১ শতাংশ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে ১ হাজার ১৭২টি উন্নয়ন প্রকল্পে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৮৬টি, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২৩টি, কারিগরি সহায়তা ১০৯টি, উন্নয়ন সহায়তা থোক ৯টি এবং নিজস্ব অর্থায়নে ৪৫টি প্রকল্প রয়েছে।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ১৯৮টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-অগাস্টে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ, টাকার অঙ্কে ছিল ৭ হাজার ১৪৩ কোটি ৮ লাখ টাকা।
এর আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) এই দুই মাসে বাস্তবায়নের হার ছিল ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ, খরচ হয়েছিল ১০ হাজার ৫৪১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-অগাস্টে ব্যয় হয়েছিল ৯ হাজার ৮৪৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা; শতাংশ হিসাবে বাস্তবায়নের হার ছিল ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
সব আর্থিক বছরেই প্রথম দিকে এডিপি বাস্তবায়নের হার কম হয়ে থাকে। অর্থবছরের শুরুর দিকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো সাধারণত প্রস্তুতিমূলক কাজ ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এ কারণে অর্থবছরের শুরুতে অর্থব্যয় কম হয়ে থাকে। পরের মাসগুলোতে ধীরে ধীরে তা বাড়ে।
আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে শতাংশ ও টাকার হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতসহ ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জুলাইয়ে এডিপিতে বরাদ্দের কোনো অর্থই খরচ করতে পারেনি।
এই আর্থিক বছরে এডিপিতে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের জন্য ৬ হাজার ১৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ৫ হাজার ৪৯৯ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু জুলাইয়ে এ দুই বিভাগ কোনো অর্থই ব্যয় করতে পারেনি।
২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের উন্নয়ন কাজে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা এখনও অব্যাহত আছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরু থেকে আন্দোলন ও পরে অগাস্টে ক্ষমতার পালাবদলে সৃষ্টি হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি প্রশাসনে রদবদলের ধাক্কায় সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল, তা এখনও চলছে।
অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে ভোটের আগে দেশে উন্নয়ন কাজের ধুম পড়ে যায়। ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ক্ষমতাশীল সরকার সারা দেশে তড়িঘড়ি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।
সবশেষ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তেমনটি দেখা গেছে; একটার পর একটা উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু অন্তবর্তী সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তেমনটি দেখা যায়নি। সে কারণেই সরকারের উন্নয়ন কাজে বেশ মন্থরগতি দেখা যায়।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে সাত মাস পার হয়েছে। কিন্তু এডিপি বাস্তবায়নে গতি আসেনি।
১৫ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নের হার ৩.২০%
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-অগাস্ট সময়ে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রাপ্ত ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়নের হার ৩ দশমিক ২০ শতাংশ।
এই অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকার এডিপির ৫২ দশমিক ৯০ শতাংশই বরাদ্দ আছে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের।
এর মধ্যে শতাংশ হিসাবে এই দুই মাসে সবচেয়ে বেশি ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে মাধ্যমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ অর্থ খরচ স্থানীয় সরকার সম্পদ বিভাগ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ ব্যয় করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় খরচ করেছে মোট এডিপির ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ অর্থ। ৪ শতাংশ ব্যয় করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ খরচ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
এছাড়া ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ অর্থ খরচ করেছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। বিদ্যুৎ বিভাগ খরচ করেছে ২ দশমিক ১৩ শতাংশ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২ দশমিক ২৩ শতাংশ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ, রেলপথ বিভাগ শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ খরচ করেছে মোট বরাদ্দের ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ১৯৮টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এই বরাদ্দের বিপরীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকা খরচ করেছিল। বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ।
