Published : 30 May 2025, 01:33 AM
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে ‘দেশের সবার জন্য একটি আদর্শ বাজেট’ দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার সুযোগ দেখছেন অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী।
তবে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আহত অর্থনীতিতে শক্তি ফেরাতে হলে বিগত সময়ে গড়ে ওঠা ‘রাজনীতির অশুভ আঁতাত’ থেকে দেশকে মুক্ত রাখার কোনো বিকল্প দেখছেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ।
তার ভাষায়, “বিগত সময়ে মূল সমস্যা যেটা দাঁড়িয়েছিল, সেটা হচ্ছে যে, আমাদের ব্যবসায়ীরা রাজনীতিক হয়ে গেছেন।”
মোস্তফা কে মুজেরী বলছেন, রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ‘অশুভ চক্র’ এক দিকে ব্যাংক লুটেপুটে খেয়েছে, তাতে অর্থনীতি হয়েছে বিপর্যস্ত।
আবার রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘অশুভ আঁতাতে’ ব্যবসার সুস্থ পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে; তাতে জনগণ ছাড়া আর সবাই লাভবান হয়েছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোচনা অনুষ্ঠান ইনসাইড আউটে অতিথি হয়ে এসে আসন্ন নতুন বাজে নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা বলেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুজেরী।
সেই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলোর ওপর তিনি আলো ফেলেছেন; বলেছেন এসব সমস্যার সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকারের কী করা উচিত, আর কী উচিত নয়।
তার বিচারে, কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। সেজন্য ব্যবসার সুস্থ পরিবেশ যেমন গড়ে তুলতে হবে, তেমনি দরকার হবে পণ্যভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনা।
মুজেরীর পরামর্শ, পাচার হওয়া টাকা উদ্ধার করা অনেক কঠিন হবে, তার বদলে ভবিষ্যতে টাকা পাচারের পথ বন্ধ করতে বরং মনোযোগী হওয়া দরকার। কর্মসংস্থান তৈরির জন্য অর্থনীতিকে সচল করতে হবে। সেজন্য রাজনৈতিক পরিবেশটাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ফেইসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।

‘আদর্শ’ বাজেটের প্রত্যাশা
মোস্তফা কে মুজেরীর বিশ্বাস, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো ‘রাজনৈতিক অভিলাষ’ নেই। অরাজনৈতিক সরকার হওয়ায় একটি আদর্শ বাজেট দিতে পারার সুযোগ তাদের আছে।
“ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার ও দেশের জনগণের জন্য একটি মডেল দৃষ্টান্ত হতে পারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বাজেট।”
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বাজেটের অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয়ের একটি বড় অংশ দুর্নীতি ও অপচয় হয়। অরাজনৈতিক সরকার এই খাতে নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে, অনুন্নয়ন ব্যয় যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে পারে, প্রকল্পের দুর্নীতি বন্ধ করতে পারে।
সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পণ্যভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনা চালু করা, আর্থিক খাতের ক্ষমতাশালী দুষ্টচক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে শাস্তির আওতায় আনা, কর্মসংস্থান তৈরি করে দারিদ্র্যের হার কমানো, ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং ঘাটতি বাজেট কমিয়ে এনে রাজস্ব প্রবাহ বৃদ্ধি করার কৌশলগুলো নিয়ে সাজানো বাজেটকে তিনি বলছেন ‘আদর্শ বাজেট’।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, “বর্তমান সরকারের যে বাজেটটা আসছে, তা যেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ একটা বাজেট হয়। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী উপকৃত হতে পারে।”
একটি ‘আদর্শ’ বাজেট সামনের দিনে সব রাজনৈতিক সরকারকে ‘অনেক দূর এগিয়ে যেতে’ সহায়তা করবে বলে মনে করেন মুজেরী।
তিনি বলেন, “এই সরকার যেহেতু কোনো পলিটিক্যাল সরকার নয়। এই সরকারের একটা লক্ষ্য হওয়া উচিত, এই বাজেটটা একটা আদর্শ বাজেট হিসেবে তৈরি করা। ভবিষ্যতে যারা রাজনৈতিক সরকার আসবে, তাদেরকে আমরা বলতে পারব যে ওই একটা আদর্শ বাজেট ছিল।”

চাই পণ্যভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনা
পণ্য বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অব্যবস্থাপনাকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির একটি বড় কারণ হিসেবে দেখেন অর্থনীতিবিদরা। অন্তর্বর্তী সরকারের নানামুখী চেষ্টায় মূল্যস্ফীতির হার সামান্যই কমেছে। আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় থাকতে পারে বলে মনে করছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
মোস্তফা কে মুজেরী বলছেন, মূল্যস্ফীতির লাগাম কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে টেকসই বাজার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। সড়ক ও হাটে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে; পণ্যভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কিছু পণ্যর সরবরাহ বেশি থাকে। পরের মৌসুম আসার আগে কিছুটা কমে যায়। কৃষিসহ ভোগ্যপণ্যগুলোর সরবরাহ এভাবে উৎপাদন ও ভোক্তার চাহিদার ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত হয়।
বাজারে কখনো কখনো একটি পণ্যর দাম খুব বেড়ে যায়। ওই সময়ে অন্য পণ্যের দাম তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক থাকলেও সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে কষ্টে পড়ে স্বল্প আয়ের মানুষ।
সেজন্য বছরের কোন সময়ে একটি পণ্যের চাহিদা কেমন থাকে, দাম কীভাবে ওঠানামা করে, সে বিষয়ে গবেষণা করে পণ্যভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন মুজেরি।
তিনি বলেন, “এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাজার ব্যবস্থায় একটা অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে চলমান। বাজার ব্যবস্থার কাজের মধ্যে সমস্যাগুলা কোথায় কোথায় সৃষ্টি হয় তা চিহ্নিত করতে হবে।
“উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে ট্রিগার করছে কতগুলো কমোডিটি দিয়ে। বাজার ব্যবস্থা তখন অস্থিতিশীল হয়ে যায়। একটা পণ্যের মূল্যে এই যে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, এটা কেন ঘটে? সেটা তো আমাদেরকে আগে বুঝতে হবে।”

মুজেরী বলেন, “বিদেশি পণ্যই হোক বা দেশি, তা উৎপাদনকারী থেকে ভোক্তা পর্যন্ত আসে একটা সাপ্লাই চেইন দিয়ে। ধান কৃষক উৎপাদন করছে, তারা হয়ত লোকাল বাজারে বিক্রি করছে, এটা আবার ফড়িয়া, বড় পাইকার তারপরে ধানের মিল ঘুরে আড়তদার হয়ে দোকানে আসছে।
“যদি এই চেইনের একজন অস্বাভাবিকভাবে তার ক্ষমতা ব্যবহার করে, বাজার দরকে ম্যানিপুলেট করে, তার নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে, তিনি অস্বাভাবিক মুনাফা করতে পারেন।”
এই ধরনের লোকদের ‘নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না’ মন্তব্য করে অর্থনীতির এই গবেষক বলেন, “সমস্যাটা ওখানটাই যে, প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে এই ধরনের কিছু দুর্বল জায়গা আছে। এই দুর্বল জায়গাগুলো কোথায়, কারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আলু যেখানে হয়, কিংবা টমেটো, সেখানে কৃষক কয়েক টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কিন্তু শহরে মানুষকে কিনতে হয় অনেক বেশি দামে।
বাজার ব্যবস্থার এই দুর্বলতাগুলোই ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় বাধা’ বলে মন্তব্য করেন বিআইডিএস এর সাবেক মহাপরিচালক।
তিনি বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা বাজার ব্যবস্থাপনায় কারওয়ান বাজার এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের জরিমানা করে ‘সমস্যার সমাধান হবে না’।
“সমস্যাটা সৃষ্টি হচ্ছে এক জায়গায়, যেখানে অস্বাভাবিক ক্ষমতাধর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে আঘাত করতে হবে। তাদেরকে কন্ট্রোল করতে হবে, যাতে তারা এই ব্যবস্থাটাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।"
উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পণ্য আসতে পদে পদে চাঁদাবাজি খবর যে গণমাধ্যমে আসে, সে বিষয়টি তুলে ধরে মুজেরি বলেন, "ওই সমস্যাটার সমাধান কিন্তু এখনও হয়নি। হয়ত চাঁদাবাজি যারা করছেন, তাদের গ্রুপটা পরিবর্তন হয়েছে।"

‘কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুজেরী মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদ হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে চেষ্টা করছে, তার দরকার আছে।
“কিন্তু এটা এককভাবে আমাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে না।"
রাজস্ব নীতি, বাজারে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা মিলিয়ে সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
আগের সরকারের সময়ে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সুবিধা পেয়েছে। আরেক অংশ এখন সক্রিয় হয়েছে বিভিন্ন দাবি নিয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য কী থাকা দরকার, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল ইনসাইড আউটে।
জবাবে মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “একটা দেশে ব্যবসায়ী বা উৎপাদনকারী থাকতে হবে। তাদের ছাড়া রাষ্ট্রটা চলতে পারে না। মুনাফা যদি না করতে পারে, তাহলে কেউ ব্যবসা করবে না।
“মূল কথাটা হচ্ছে, আমাদের এখানটায় সত্যিকার অর্থে যারা ব্যবসায়ী, তাদের তো ব্যবসার নিয়মনীতি মানতে হবে। বিগত সময়ে মূল সমস্যা যেটা দাঁড়িয়েছিল, সেটা হচ্ছে যে, আমাদের ব্যবসায়ীরা রাজনীতিক হয়ে গেছেন।”
তিনি বলেন, “রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে অশুভ একটা আঁতাত সৃষ্টি হয়েছিল, যার জন্য এই দুর্নামগুলা হচ্ছে। অশুভ আঁতাত করে তারা সকলেই লাভবান হয়েছে, কিন্তু জনগণ সাফার করেছে। এখন সেই অবস্থা আমরা কাটিয়ে উঠছি।"
সরকার যেন ‘সত্যিকারের ব্যবসায়ীদের’ ব্যবসা করার সুযোগ করে দেয়, সেই পরামর্শ রেখে মুজেরী বলেন, "ব্যবসায়ীদের যে সাপোর্টটা দরকার, তাদের যে ঋণ দরকার, সেটা তাদেরকে দিতে হবে ব্যবসাটা করতে। ব্যবসাটা না করলে আমাদের অর্থনীতি চলমান থাকবে না।"

কর্মসংস্থান তৈরিতে দরকার ‘সচল অর্থনীতি’
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিবিএস এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। অন্যদিকে দারিদ্রের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে বাজেটে আত্ম কর্মসংস্থান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার পরামর্শ দেন মোস্তফা কে মুজেরী।
কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লে তাতে যে দারিদ্র্য বিমোচনও হবে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলে আয় বৃদ্ধি পাবে। তাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে। দারিদ্র্য সীমা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবে।"
“কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হল একটা সচল অর্থনীতি” মন্তব্য করে মুজেরী বলেন, "এমন অর্থনীতি লাগবে, যে অর্থনীতি দ্রুত গতিতে বাড়ছে। কারণ যত বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে, তত আপনার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।"
অর্থনীতি সচল রাখে বিনিয়োগ। তা বাড়াতে রাষ্ট্র অনেক সুযোগ দিতে পারে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
তিনি বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরকে আকৃষ্ট করতে আমরা তো অনেক প্রণোদনা দিচ্ছি, তাদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করেছি, স্পেশাল ইকোনমিক জোন করা হয়েছে।"
তবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবেশও যে জরুরি, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে মুজেরী বলেন, “বিদেশিদের সামনে তো অনেকগুলো অপশন খালি আছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য তারা তো বসে নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করতে পারে। কাজেই তারা সবসময় দেখবে যে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করাটা তার জন্য সর্বাধিক লাভজনক হবে কি না।"
তিনি বলেন, “সত্যিকার অর্থে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন বাংলাদেশের। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় আগামী দিনের সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এসব বিবেচনায় নেবেন বিনিয়োগকারীরা।”

‘কালো টাকা সাদা করাও দুর্নীতি’
প্রতিবারই বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রেখেছে রাজনৈতিক সরকারগুলো। এবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও তা রাখার কথা জানিয়েছে।
মোস্তফা কে মুজেরীর ভাষায়, কালো টাকা সাদা করার এই সুযোগ একটি ‘অন্যায্য সংস্কৃতি’।
“কালো টাকা মানে, যে টাকাটার আপনার আইনত গ্রহণযোগ্যতা নাই। তাই আইনত এই টাকাটা আপনার কাছে থাকার কথা না। আপনি যেভাবেই হোক না কেন, টাকাটা করেছেন। এই সিস্টেমটা আমাদের কর ব্যবস্থার মধ্যে থাকাই উচিত না।"
নৈতিকতাকে বিসর্জন দিলে ‘অনৈতিকতাকে উৎসাহিত করা হবে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, "একটা ক্ষেত্রে যদি আপনি উৎসাহিত করেন, সমাজের সর্বত্র অনৈতিকতা ঘিরে ধরবে। সরকারিভাবে অনৈতিকতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, তখন কি বড় মুখ করে আপনি বলতে পারেন যে দুর্নীতি করা যাবে না? কালো টাকাকে সাদা করাটাও একটা দুর্নীতি।"

বন্ধ করতে হবে টাকা পাচারের পথ
আগের সরকারের মেয়াদে বিদেশে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার চেষ্টার কথা বলছে অন্তর্বর্তী সরকার।দীর্ঘ এ প্রক্রিয়ার সফলতার সম্ভাবনা কতটুকু, আর রাজনৈতিক সরকারের সময়ে এ চেষ্টা কতটা অব্যাহত থাকবে, সে বিষয়ে মোস্তফা কে মুজেরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল ইনসাইড আউটে।
জবাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, “বিদেশে যাওয়া টাকাটা ফিরিয়ে আনা খুবই একটা কমপ্লেক্স সিস্টেম এবং এটা সময়সাপেক্ষ।’’
তিনি বলেন, “একটা সীমিত পর্যায়ে এটাকে পৃথিবীর সব দেশ থেকেই, বিশেষ করে আমাদের মত দেশগুলো থেকে এরকম টাকা পাচার হয়। কিন্তু আমাদের দেশে যেটা হয়েছিল, এটা একটা বিরাট আকার ধারণ করেছিল।
“কাজেই সবকিছু মিলিয়ে আমার মনে হয়, যেটা আমাদের করা উচিত, সেটা হচ্ছে, ভবিষ্যতে যাতে কোনোভাবেই টাকা পাচার করতে না পারে। সেটাকে হয়ত একেবারে বন্ধ করা যাবে না। পাশাপাশি চলমান আইনগত প্রচেষ্টা বা অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক উদ্যোগও থাকতে হবে।”

ব্যাংকের দুর্বলতায় ‘রাজনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়’
বাজেট ঘাটতি মেটাতে এবং দ্রুত অর্থ সংগ্রহ করতে সরকার ব্যাংক খাতের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। কিন্তু দুই ডজনের মত ব্যাংক এখন তারল্য সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
বাকিগুলোর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ব্যাংক নিজেরা চলতে পারলেও অন্যদের ধার দেওয়ার সক্ষমতায় নেই।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে খেলাপির প্রকৃত চিত্র দেখানোর সিদ্ধান্তের পর ব্যাংকগুলো আরো সমস্যায় পড়েছে। সমস্যার টেকসই সমাধানে এখন ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার ভাবনায় আছে সরকার।
ব্যাংক খাতের এই দুর্বলতার জন্য ‘রাজনৈতিক দুষ্টচক্রকে’ দায়ী করছেন মোস্তফা কে মুজেরী।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক সরকার থেকে আরম্ভ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু সংশ্লিষ্টতা মিলে অশুভ চক্র গড়ে উঠেছিল, যারা সার্বিকভাবে এই ব্যাংকগুলোকে লুটপাট করে গেছে। তাদের শাস্তি দিতে হবে, কিছু শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের পদক্ষেপ না নিতে পারে।”
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে অনেক ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায় চলতে না পারলে। এখানে তা নেই। এখন সরকারকে ব্যাংকগুলো টেনে তুলতে হবে বেসরকারি খাতে অর্থায়নের প্রয়োজনে। ব্যাংক ঠিক করতে না পারলে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হবে।”
সরকার এবারও ঘাটতি বাজেটে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বলেছে ঘাটতি কমাতে। অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয় থেকে অপচয় ও দুর্নীতি কমাতে পারলে ঘাটতি মেটাতে সরকারের ধার নেওয়ার পরিমাণটা কমবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “আমাদের অনুন্নয়ন খরচ তো অনেক বাড়ছে। দ্রুত গতিতে বাড়ছে, এখনো বাড়ছে। সরকার মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা করছে। বর্ধিত ব্যয়টাকে কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না।
“উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে প্রচুর টাকা নষ্ট হয় দুর্নীতির কারণে। এটা কমাতে পারলে সাশ্রয় সম্ভব।”