Published : 20 May 2026, 08:22 AM
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে বড় অঙ্কের অর্থায়ন পাওয়ার লক্ষ্যামাত্রা সরকার নির্ধারণ করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা পূরণ হচ্ছে না। উল্টো এ খাতে সুদ ও আসল মেটাতে হচ্ছে সরকারকে।
আগের তিন অর্থবছরের মত চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ সময়েও এ খাত থেকে বিনিয়োগ পায়নি সরকার। বিপরীতে ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে গ্রাহকদের সুদ-আসল বাবদ শোধ করতে হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ করার লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। ফলে সঞ্চয় হচ্ছে না। এছাড়া সুদের হার কমে যাওয়াসহ নানা কড়াকড়ির কারণেও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমেছে।
এছাড়া ট্রেজারি বিল, বন্ডে বেশি সুবিধার কারণে অনেকে এখন সেদিকে ঝুঁকছেন। এটাও সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ার একটি কারণ বলে মনে করছেন তারা।
এ কারণে আগের তিন অর্থবছরের (২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ ও ২৪২৪-২৫) মত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষেও সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক হওয়ার আভাসই দিচ্ছেন তারা।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সোমবার সঞ্চয়পত্র বিক্রির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ নয় মাসে যত সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে তার চেয়ে বেশি সুদ ও আসল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে নিট বা প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ ঋণাত্মক হয়েছে, যেটির পরিমাণ ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে সঞ্চয়পত্রের নিট বা প্রকৃত বিক্রির পরিমাণও ঋণাত্মক (বিক্রির চেয়ে ৮ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা কম) ছিল।
ওই অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছিল সরকার। বিক্রিতে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকায় সংশোধিত বাজেটে সেটি কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হলেও বছর শেষে তা ছিল ঋণাত্মক।
বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল গ্রাহকদের পরিশোধের পর যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটি হল নিট বিক্রি।
সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের নয় মাসের মত আগের তিন অর্থবছরেও বাজেট ঘাটতি মেটাতে অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে সরকারকে। এ কারণে গত তিন অর্থবছর থেকেই সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ছে।

এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা ছিল আরও বেশি ৪১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা ধনাত্মক।
এ খাতে বিনিয়োগ কমে আসায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমার কারণ হিসেবে সুদের হার কমে যাওয়া ও কড়াকড়ি ছাড়াও উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের সঞ্চয় কমে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “চার বছরের বেশি সময় ধরে মজুরি সূচক মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। অর্থাৎ মানুষ যা আয় করছে, তা দিয়ে সংসারই চলছে না। সঞ্চয় করবে কীভাবে; সঞ্চয়পত্র কিনবে কী দিয়ে?
“আরেকটি কারণে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমছে। সুদসহ বিভিন্ন সুবিধার কারণে বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বিল, বন্ডে আগ্রহ বেশি দেখাচ্ছেন। আবার একজন বিনিয়োগকারী সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা খাটানোর সুযোগ থাকলেও বিল ও বন্ডে কোনো সীমা নেই।
“বিল, বন্ডের বিপরীতে অর্জিত মুনাফার ওপর কোনো কর দিতে হয় না। সঞ্চয়পত্রের অনেক বেশি মেয়াদ থাকলেও এ ক্ষেত্রে ৯১ দিন মেয়াদি বিলে বিনিয়োগ করেও ১০ শতাংশের মতো সুদ পাওয়া যায়।”