Published : 19 Jul 2026, 08:57 AM
যেন দুই শিল্পীর লড়াই। যেখানে উত্তাপের ঝাঁঝে রাগ সঙ্গীতের আবহ। পাসগুলোতে থাকবে তাল-লয়ের নিবিড় ঝংকার। ছন্দ যেখানে ফুটবে ফুটবলের সুর হয়ে। সবকিছুতে এমন মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকার পূর্বাভাস। বিশ্বকাপের ফাইনালের মহারণে যে মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় আর্জেন্টিনা ও স্পেন।
দুই দলের দেখা হতে পারত গত মার্চেই। ফিনালিস্সিমায়। কাতারে মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপের সেরা স্পেনের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা করে বসায় নিরাপত্তার অভাবে ম্যাচটি দেখেনি আলোর মুখ।
ফুটবলপ্রেমীদের সেই অপেক্ষা এবার ফুরানোর পালা, আরও বড় মঞ্চে। সোনালি ট্রফিটি আবারও জিততে মুখোমুখি হচ্ছে শৈল্পিক ফুটবলের দুই প্রতিনিধি। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় ২০ জুলাই ১টায় (এএম) শুরু হবে ম্যাচটি।

বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে নামবে আর্জেন্টিনা। ২০১০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতিতে জমে পড়া সময়ের ধুলো ঝেড়ে স্পেন উদ্ভাসিত হতে চাইবে উন্মুখ নতুন আলোয়।
এই ফাইনাল ঘিরে চারদিকে অন্যরকম দোলুনি। আর্জেন্টিনার পথচলা ছিল কণ্টকাকীর্ণ; শ্বাপদ সংকুল। নকআউট পর্বে এসে তাদের ধুঁকতে হয়েছে ভীষণ। সমর্থকদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে, লিওনেল মেসির চওড়া কাঁধে সওয়ার হয়ে এতদূর আসা আলবিসেলেস্তেদের। অন্যদিকে, স্পেন শান্ত, বলের নিয়ন্ত্রণে ধীরস্থীর, আক্রমণে ধারাল এবং নিখুঁত একটি দল। প্রতিটি বাঁধা যেন তারা পেরিয়েছে নিঃশব্দে।
দক্ষিণ আমেরিকা বনাম ইউরোপের পুরান দ্বৈরথের ঝনঝনানিও আছে এই ম্যাচের পরতে পরতে। আবেগ বনাম নিখুঁত কৌশল যে ম্যাচের দুই ডানা। ডাগআউট থেকে লা মাজিয়া পর্যন্ত যেখানে আছে আত্মীক সম্পর্কের ইতিহাস, টানাপোড়েনও। বার্সেলোনার সাবেক ও বহু সাফল্যের কাণ্ডারি এবং বর্তমান তারকা মুখোমুখি এ ম্যাচে। হ্যাঁ, লিওনেল মেসি বনাম লামিন ইয়ামাল। একজনের শুরু, অন্যজনের বলতে গেলে শেষের অপেক্ষা।
মেসির ‘শেষ’ টেনে দেওয়ার দুঃসাহস কিংবা বোকামি এখন আর করতে চান না অনেকে। শিক্ষা তো আর কম হয়নি অতীতে! চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে ফ্রান্সকে ধরাশায়ী করেছিল আর্জেন্টিনা। ঘুচিয়েছিল ৩৬ বছরের ধরা। মেসি তখন ছিলেন ৩৫ বছরের। অনেকেই হয়তো ধরে নিয়েছিলেন ওটাই শেষ।

কিন্তু কে জানত, আবারও বিশ্বকাপে ছড়ি ঘোরাবেন তিনি এবং সেটাও এমন দাপটের সঙ্গে। আসর চলার মাঝেই তিনি পূরণ করেছেন ৩৯; সেই বয়সকে স্রেফ সংখ্যা বানিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার ও সব শঙ্কাকে তিনি পরাস্ত করে চলেছেন অনুক্ষণ।
যদিও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ যাত্রা এবার মসৃণ ছিল না মোটেও। তীর্থযাত্রার বাঁকে বাঁকে বরং ছিল বন্ধুর পথ, কষ্ট-যন্ত্রণা সয়ে ছুটে চলার গল্প। ২৬ জনের দলের ১৭ জনই ২০২২ সালের বিশ্বজয়ী দলের অংশ, অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হওয়ায় চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে লিওনেল স্কালোনির দল উঠে এসেছে ফাইনালের মঞ্চে। কিন্তু স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে অতিরিক্ত সময়ে গড়া কেইপ ভার্ড ম্যাচ, হারের শঙ্কার এড়ানো মিশর ম্যাচ, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই পাড়ি দিতে হয়েছে তাদের।
পথটা তাদের এমনভাবে পাড়ি দিতে হয়েছে, ম্যাচগুলো তাদের এমনভাবে খেলতে হয়েছে, যেন এই বুঝি শেষ হয়ে গেল সব-এই শঙ্কা নিয়ে। দুঃসময়ে নিশ্চিতভাবে শক্তি জুগিয়েছে মেসির গোল, অ্যাসিস্ট ও জাদুকরী ঝলক। এই মহাতারকার পদচারনার প্রতিটি মুহূর্তে উচ্চকিত হয়েছে- তিনি নাকি কিংবদন্তি পেলে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ, এই অন্তহীন বিতর্কও।

কখনও মেসি, কখনও আলভারেস-মার্তিনেসদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, বক্সিং নিয়ে রকি বালবোয়া সিনেমার মতো টলতে টলতে এক একটি রাউন্ড পেরিয়ে এসেছে আর্জেন্টিনা। সেখানে স্পেন আরও ঠাণ্ডা মাথার, পাকা খেলোয়াড়। আটকে গেলে অনায়াসে বেরিয়ে আসার পথটা ভালোভাবে জানা লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের।
যে কাজটি তারা করে চলেছে গত ৩৭টি ম্যাচ অপরাজিত থেকে। ২০১৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত টানা অপরাজিত থাকার ইতালির গড়া রেকর্ড এখন নিজেদের করে নেওয়ার হাতছানি স্পেনের সামনে।
গত ইউরো জয়ের পর, স্পেন সবার চোখে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের ‘ফেভারিট’ হয়ে ওঠে। এবারের আসরে প্রতি ম্যাচে তারা দেখিয়েছে, কেন তাদের শিরোপার দাবিদার ভাবা হচ্ছে। কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে তাদের শুরুর ওই ড্র পরে হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্ন ঘটনা!
চাপকে দলটি বিপদ হিসেবে দেখছে না মোটেও। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালের আগ পর্যন্ত তাদের সবকিছুই যেন ছিল পরিকল্পিত ও সতর্ক পথচলার অংশ। দলটির কোচ দে লা ফুয়েন্তে নিপুন কৌশল সাজিয়ে আগ্রাসী ফরাসিদের স্রেফ বোতলবন্দী করে রেখে, ২-০ গোলে জিতে দেখিয়ে দিলেন তার ছকের কার্যকারিতা।
স্পেনের যুব দলে দে লা ফুয়েন্তে কাজ করার সুবাদে বর্তমান দলের অনেকের কৈশরের ভিত তার হাতে গড়া। ফলে, কোচ, দলের মধ্যে এমন দৃঢ় বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে যে, দলটি চাইলে প্রতিপক্ষকে কপাটহীন ঘরে আটকে দমবন্ধ করে দিতে পারে। এই অনুভূতিটা সবচেয়ে ভালো বুঝেছে ফ্রান্স।

স্পেনের পাসিং ফুটবল, পজিশনাল প্লেও প্রতিপক্ষের দমবন্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এর গহীনেও তাদের আছে গতিময় আক্রমণের ভরপুর রসদ, যার বেশিরভাগ আসে ইয়ামালের কাছ থেকে। তরুণ এই উইঙ্গার মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে মুগ্ধতা ছড়ান। রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েছেন বিস্ময় ছড়িয়ে। এবার তিনি মেসির মুখোমুখি, যাকে ধরা হয়, বার্সেলোনার লা মাজিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিভা।
ফাইনালের আগে, দুই প্রজন্মের সেই ছবিটি ফের উঠে এসেছে আলোচনায়। বার্সেলোনার একটি সামাজিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শিশু ইয়ামালকে গোসল করাচ্ছেন মেসি। শিশু ইয়ামাল সেসময়ের তরুণ মেসির কোলে। কৌতুহলী চিত্রনাট্যকারদের কাছে যে ছবিটি এখন গল্প লেখার অনুসঙ্গ।
কেউ কেউ মিথ টেনে প্রশ্ন করে বসেন ‘মিদাস টাচে’র মতো সেদিন কী মেসির প্রতিভা সঞ্চারিত হয়েছিল ইয়ামালের ভেতর? ইয়ামালের বাবা অবশ্য উত্তর দিয়েছিলেন আরও কৌতুহলী সুরে, “কে বলতে পারে, ব্যাপারটা উল্টো ছিল কিনা? যদি তার এই উত্তর সত্যি হয়ে যায়, তাহলে স্পেনের জন্য লক্ষণ অশুভ!
ডাগআউটেও আছে ভিন্ন শিহরণ। এক দশক আগে, স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের কোচের কোর্স যখন করেছিলেন স্কালোনি, তার শিক্ষক ছিলেন দে লা ফুয়েন্তে। অর্থাৎ, এক দিক থেকে ম্যাচটি গুরু-শিষ্যের লড়াইও।
ভিন্ন অনুসঙ্গও আছে আলোচনায়। নিউ জার্সির মাঠ বল দখলে রাখার জন্য তেমন একটা সহায়ক নয়। এ মাঠের পিচের মান নিয়ে টুর্নামেন্ট চলাকালীন কোচ, খেলোয়াড়েরা তুলেছেন প্রশ্ন। এই পিচ স্পেনের চিরায়ত খেলার ধরনকে কঠিন ও জটিল করে তুলতে পারে। আর এটাই কোনো কারণে বিপদে পড়ে যাওয়া আর্জেন্টিনাকে আবেগের লড়াইয়ে ফেরার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। যে আবেগ, উচ্ছ্বাস তাদের উপভোগ করতে দেখা গেছে, নকআউট পর্বের বিগত ম্যাচগুলোতে।
নিউ ইয়র্কের আবহাওয়ার দুর্ভাবনার কারণও দুই দলের জন্য। ধারনা করা হচ্ছে, এদিনের তাপমাত্রা থাকবে প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আসরে এটি খোলা আকাশের নিচে স্পেনের খেলা দ্বিতীয় ম্যাচ। কানাডার দাবানলের ধোঁয়াও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু অংশে বিপজ্জনকভাবে ঢেকে দিয়েছে। ফাইনালে ৮০ হাজারের বেশি দর্শকের উপস্থিতি নিয়ে তাতে বেড়েছে উদ্বেগ।
এতকিছুর মধ্যেও স্পেনের মূল কাজ হলো, ম্যাচটি পরিচ্ছন্ন ও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। নিজেদের ধরণ অনুযায়ী খেলা। আর্জেন্টিনা দায়িত্ব অস্বস্তিকে আবারও নাটকীয় ফলে রূপ দেওয়া। যেটা তারা নকআউট পর্বে প্রায় প্রতিটি ম্যাচে করে এসেছে।
আর্জেন্টিনার সব পরিকল্পনার কেন্দ্রে একজনই, তিনি মেসি। অনুক্ষণ যিনি চেষ্টা করে চলেছেন, রোববারের ফাইনালটি যেন কেবলই তার বিদায়ী উপলক্ষ্য হিসেবে নয়, বরং দক্ষতার, জাদু ছড়ানোর চূড়ান্ত এক প্রদর্শনী হয়ে ওঠে। নিশ্চিতভাবে ১৯ বছর বয়সী ইয়ামাল চাইবেন, ঝলক দেখিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ রাঙিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের পথে পা বাড়াতে।
ফাইনাল, অথচ যুদ্ধের ডামাডোল নেই। রণহুঙ্কার নেই। আছে কেবল, এক ঝাঁক ফুটবল শিল্পী নিয়ে গড়া দুই শৈল্পিক দলের উপভোগ্য লড়াইয়ের অপেক্ষা।