Published : 06 Jan 2026, 01:34 AM
ঢাকার টিকাটুলিতে ‘রাজধানী মার্কেটে’ সেলাই মেশিনে জামাকাপড় ‘ফিটিংয়ের’ কাজ করেন মোবারক হোসেন।
আয় কমে যাওয়ায় এই দর্জি এখন দু-চার টাকা সাশ্রয় করতে সংসারের অনেক কেনাকাটা সারেন ফুটপাতের দোকানে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “শীতের শুরুতে আমাদের কাজের চাপ বেশি থাকে। এই সময়ে সবাই জামা ও প্যান্ট কেনেন। শীতের শেষ দিকে চাপ কমে যায়।
‘‘এবার কাজ তেমন নাই; প্রায় অর্ধেক কমে গেছে; এখন চলতে কষ্ট হয়। ডাল-ভাত দিয়া আল্লাহ খাওয়ায়; মানুষ তো খাইতে দেয় না। পেঁয়াজ আর তেলের দাম বাড়াইয়া দিল তো মানুষই। কোনোরকম চলতাছি, খরচ সামাল দিতে পারতাছি না। কলা, দুধ, মাংস তো চাইলেও খাইতে পারি না।’’
আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মোবারকের মতো স্বল্প আয়ের মানুষের সংসার চলছে কাটছাঁট করে।
মূল্যস্ফীতির তুলনায় মানুষের মজুরি না বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে সরকারি প্রতিবেদনেও।
ঘাটতি থাকছে আমিষের
দাম কম পড়ায় মোবারকের মতো অনেকেই শাকসবজি কেনেন সন্ধ্যার পরে।
মোবারক বলেন, ‘‘সকালে যে সবজির দাম ৪০ টাকা; বিকাল বা সন্ধ্যার পর তা ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজিতে পাওয়া যায়। তাই বাসায় ফেরার পথে কিনি।”
মোবারক হোসেনের কথার সুর ধরে পাশের আরেক দর্জি সোলাইমান হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘দাম তো বাড়ব, বাড়লে কী আর করুম। সমস্যা হইলো, ইনকাম তো বাড়ে না। চাইলেই তো বেশি চার্জ (মজুরি) রাখা যায় না, কাস্টমার নষ্ট হইবো। আগে মানুষ না চাইলেও খুশি হইয়া, কাজ দেইখা ১০-২০ টাকা বেশি দিত, এখন আর দেয় না।’’

এমদাদুল হক স্বপনের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মীও নিত্যপণ্যের তালিকায় কাটছাট করেছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে স্বপন বলেন, ‘‘এখন মাছ কেনা পড়ে সপ্তাহে এক দিন। বেতন পাওয়ার সপ্তাহে মাংস কিনি একবার। মেহমান ছাড়া বাসায় গরুর মাংস কেনা হয় না, মুরগি দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছি।’’
তিনি বলেন, ‘‘সংসার চালাতে নতুন নতুন উপায় বের করতে হয়। চার জনের সংসারে এবার বড়দের জন্য শীতের কাপড় কিনি নাই। পুরনোগুলো দিয়েই চালাব।
‘‘কিন্তু ছেলে-মেয়েদের বেলায় পারিনি। পুরনোগুলো ফিট হয় না তাদের। সেখানে খরচ করেছি, এখন কোনো না কোনো জায়গায় কেচি চালাতে হবে।’’
অফিস থেকে বের হয়ে এক বেলা নাস্তা করার অভ্যাস রয়েছে স্বপনের, সেটাও এখন বাদ দেওয়ার চিন্তা করছেন তিনি।

বাড়ছে খরচ
শীত এলে ঢাকার বাসায় প্লাস্টিকের স্যান্ডেল (চপ্পল) বিক্রি বেড়ে যায়। বিশেষ করে স্বল্প ও নির্ধারিত আয়ের ব্যক্তিরা তুলনামূলক সাশ্রয়ী এ পণ্যটির ক্রেতা। এবার শীত শুরু হলেও ক্রেতা আগেরবারের চেয়ে কম পাচ্ছেন ভ্যানে ফেরি করে চপ্পল বিক্রি করা জসিম উদ্দিন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘সকাল ১০-১১টার দিকে ভ্যান নিয়ে বের হই। আগে রাত ৮-৯টা পর্যন্ত থাকতাম। অফিস থেকে যাওয়ার সময়ে মানুষ কিনে নিয়ে যাইত। এখন বেচা-বিক্রি কম, তাই রাইত ১২টা পর্যন্ত থাকি কাস্টমার ধরতে।’’
জসিম বলেন, আগের শীতে দৈনিক পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা বিক্রি হলেও এখন তা চার-সাড়ে চার হাজারে নেমেছে।
মতিঝিলে মধুমিতা সিনেমা হলের এক পাশে ভ্যান গাড়িতে পরোটা, সবজি ও হালুয়া ওজন করে বেচেন মাসুম হাওলাদার। সর্বনিম্ন ১৫ টাকায় পাওয়া যায় এ তিন পদ।
রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও সেগুন বাগিচার রিকশা চালক, ফেরিওয়ালাসহ খেটে খাওয়া মানুষজন দুপুর ও বিকালের নাস্তা খেতে তার কাছে যান।
সিএনজি চালক মোহাম্মদ রিফাত বলেন, হোটেলে বসে এ খাবার খেলেই কমপক্ষে ৫০ টাকা লাগবে। সেখানে ২০-৩০টাকায় সেরে নেওয়া যায়।
মাসুম হাওয়লাদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘দিনে ৩০ থেকে ৩৫ কেজির ময়াদার পরোটা বিক্রি করি। এহন ২০ থেকে ২৫ কেজি বিক্রি হয় ডেইলি। মানুষ খায় কম। প্যাডেল রিক্সাওয়ালারা খায় বেশি, এহনতো ব্যটারি রিকশা বেশি, তারা খায় কম।’’
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত নভেম্বরে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ডিসেম্বরে তা বেড়ে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ হয়েছে।
অর্থাৎ, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যে খাদ্যপণ্য কিনতে ১০০ টাকা খরচ হয়েছে, সেই পণ্য গেল ডিসেম্বরে কিনতে খরচ পড়েছে ১০৭ টাকা ৭১ পয়সা।
নভেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ডিসেম্বরে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ হয়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার যেখানে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, সেখানে ডিসেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ।
খাতভিত্তিক হিসেবে কৃষিতে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, শিল্পে ৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ও সেবাখাতে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।
আগের বছরের ডিসেম্বরে যা ছিল কৃষিতে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, শিল্পে ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ ও সেবাখাতে ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
শুধু আগের বছরই নয়, গত ৪৬ মাস ধরে মজুর বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির অনেক নিচে রয়েছে।
এর অর্থ হল, জীবযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না। তাতে দিন শেষে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানো হলো। আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাবে, কেজিতে ৯ থেকে ১০টা বেড়েছে। কিন্তু অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনেক বেশি। সব শ্রেণির মানুষই তার জায়গা থেকে দাম বাড়িয়ে দিবে।
‘‘সেবা খাতে, যেমন রিক্সা ভাড়া, চালের দাম, হোটেলের খাবার দাম, যে যার মত কিন্তু বাড়ানোর চেষ্টাটা করবে। তেল ও পেঁয়াজের যে দামটা হঠাৎ করে বাড়ল, এর অর্থনৈতিক কোনো ব্যখ্যা আছে? না, নেই। এটা পুরোটাই বাজার কাঠামো বা ব্যবস্থাপনার বিষয়, সেখানে সরকারের অনেক করণীয় বাকি আছে।’’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপটা দরিদ্র, হত দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের উপর দিয়েই যায়।
“দরিদ্ররা কখনো কখনো মাথা তুলে অবস্থান ধরে রাখতে পারে, আবার খাবি খেয়ে হত দরিদ্রর কাতারে চলে যায়।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “মধ্যবিত্ত ও নির্ধারিত আয়ের (বেতনভোগি) মানুষ বাজেটে কাঁটছাট করে চলে। অনেক সময় তারা চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে না পেরে দীর্ঘ সময় ভুগতে থাকেন।’’
মানুষকে স্বস্তি দিতে খাদ্যমূল্য ও চিকিৎসার দায়িত্ব পুরোটাই সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরামর্শ মোস্তফা কে মুজেরীর।
প্রবৃদ্ধির সুফল ধনীর পকেটে
গত দেড় দশকে বাংলাদেশে দরিদ্রের হার অনেকটা কমলেও গড়ে সাড়ে ৬ শতাংশের যে প্রবদ্ধি হয়েছিল, তার সুফল দরিদ্রর তুলনায় ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্তরা পেয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক।

গত নভেম্বরে প্রকাশিত 'বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫' প্রতিবেদনে বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও অতি দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নেমেছে গত ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে।
এই সময়ে জীবনমান বেড়েছে বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন ও শিক্ষা সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ার উপর ভর করে । তবে ২০১৬ সালের পর দারিদ্র্য কমে যাওয়ার হার ধীর হয়েছে।
শিল্পায়নের হার কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান হয়েছে গ্রামীণ কৃষি ও প্রবাসী আয়ের উপর ভর করে।
২০১০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) গড় প্রবৃদ্ধি এসেছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, এই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির তুলনায় দারিদ্র্য কমার হার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম হয়েছে।
প্রবৃদ্ধির তুলনায় বাংলাদেশে দরিদ্র কমেছে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় গড় মান ছিল এক দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির এই সুফল দরিদ্রের তুলনায় মধ্য ও উচ্চ আয়ের মনুষ বেশি পেয়েছে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্মক্ষম ৩০ লাখ মানুষ শ্রম বাজারের বাইরে রয়েছেন, যার মধ্যে ২৪ লাখ নারী।
চাকরি বাজারে বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ কমে ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে।
২০১০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে দেশে চরম দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে অর্ধেকে, অর্থাৎ ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। এর ফলে ৯০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে যায়।
আর মাঝারি দারিদ্র্য ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে হয় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এই সময়ে দুই কোটি ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমা থেকে বেরিয়ে যায়।
বহুমাত্রিক দারিদ্র্য ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২১ দশমিক ৩ শতাংশ হয় বলে প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে ছয় কোটি
দেশের মোট জনবলের এক তৃতীয়ংশ পুনরায় দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে বিশ্ব ব্যাংক।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। এ হিসাবে ছয় কোটির বেশি মানুষ পুনরায় দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সার্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মুখে থাকায় ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর শেষে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে।
গত জুন মাসে অর্থবছর শেষ হলেও হালনাগদ তথ্য এখনও প্রকাশ পায়নি।
আরেক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে আরো ১২ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রত্যাশিত হারে কমছে না মূল্যস্ফীতি
কোভিড মহামারীর পর হঠাৎ করেই বাড়তি আমদানির চাপে পড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমতে শুরু করলে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এক লাফে দুই অঙ্কে গিয়ে ঠেকে।
এর আগে ২০২০ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী আহম মোস্তফা কামাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে ব্যাংক ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ৯ শতাংশে নামিয়ে আনেন। তখন ঋণ সুদহার ছিল ১৮ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত।
এর পর টানা দুই অঙ্কের ঘরে থাকা মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে।
ওই মাস থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পরের মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পরিণত হলে ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়াতে শুরু করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ঋণ চুক্তিতে যাওয়া বাংলাদেশ।
অন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেওয়া হলে ২০২৪ সালের অগাস্টে মূল্যস্ফীতি কমে আসতে শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় গত জুনে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে আসে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। চলতি বছরের গত অক্টেবারে তা ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ, যা ৩৯ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। কিন্তু এখন তা আবার বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়ানোর সময়ে বলেছিল, মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নেমে না আসা পর্যন্ত নীতিসুদ হারে কড়াকড়ি চলতে থাকবে। ব্যাংক ঋণের সুদহার গড়ে সাড়ে ১২ শতাংশের ঘরে রয়েছে।

ঋণ সুদহার বাড়লেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত জায়গায় নামেনি। সেক্ষেত্রে ঋণ সুদহার কমানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা দরকার বলে মনে করেন মোস্তফা কে মুজেরী।
তিনি বলেন, ‘‘শুধু সুদহার দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় যে সিন্ডেকেট আছে, তাদের ধরতে না পারলে কোনো সুফল আসবে না।’’
‘‘শুধু পেঁয়াজ না, সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে দিল ব্যবসায়ীরা। সরকার বলছে, তারা সমর্থন করেনি। ভোক্তা তো বেশি দাম দিয়ে কিনছে।“
তিনি বলেন, “এই যে অরাজকতা বাজার ব্যবস্থাপনায়, তা তো থামাতে হবে। এসব দুর্বলতার সমাধান না এলে মূল্যস্ফীতি আরো কমে আসার সুযোগ নেই।’’
মূল্যস্ফীতির এই বাজারে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে কমিশন। ভোটের পরেই শুরু হবে রজমান মাস। সে ক্ষেত্রে ভোটের সময় টাকার ব্যবহারে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখছেন মোস্তফা কে মুজেরী।
তিনি বলেন, ‘‘অবকাঠামো খাতে বিশেষ করে নির্মাণ কাজ এখন কম। ফসল কাটতে শ্রমজীবী মানুষ এখন গ্রামে। তফসিল ঘোষণা হলে এই শ্রমিক শ্রেণি আর ঢাকায় আসার সম্ভবানা কম। প্রার্থীরা তাদের কাছে টেনে নিবে।
‘‘তাতে গ্রামীণ জনপদে বাড়তি ভোগ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে, তা অমূলক নয়।’’

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
দেশের অর্থর্নীতি পুরো দমে সচল না হওয়া পর্যন্ত মজুরি বৃদ্ধির কোনো সুযোগ দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মুজেরী বলেন, “অর্থনীতি তো এখনো পুরোটা সচল হয়নি। এডিপিতে থাকা প্রকল্পের সংখ্যা কমিয়ে এনেছে সরকার, তাই সরকারি খরচ কমে যাবে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত অর্থনীতির বড় সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার সুযোগ আপাতত নেই। তাহলে মজুরি বাড়বে কী করে।’’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘‘এক বছরের হিসাবে মূলস্ফীতি কমেছে। এটা অঙ্কের হিসাব। বাস্তবে তো গত বছরই বেশি দামে জিনিসটি কেনা হয়েছিল। এবার তার চেয়েও বেশি দামে কেনা হল। ম্যূস্ফীতি কমে যাওয়া মানে তো জিনিসের প্রকৃত দাম কমেনি। বলা যায়, বেশি দাম বাড়ার প্রবণতা কমেছে।‘’
বাজার কাঠামোতে স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি চড়া মূল্যস্ফীতির সময়ে খাদ্য ভর্তুকি ও সুবিধাভোগীর আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘এটা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। স্থায়ী সমাধান হল মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা ও সময়ে সময়ে মজুরি বাড়ানো।”
মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে খেটে খাওয়া, সীমিত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের জীবনে। এ শ্রেণির ব্যক্তির সাধারণত সঞ্চয় থাকে না।
ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর সংস্কারের পথে থাকা অর্থনীতি এখনো স্বাভাবিক জায়গায় যেতে পারেনি মন্তব্য করে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘অর্থনীতি এখন মজুরি বাড়ানোর মত সক্ষমতায় নেই। নির্বাচিত সরকার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগতে পারে। বিনিয়োগ না এলে, কর্মসংস্থান না বাড়লে কীভাবে মজুড়ি বাড়বে।’’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম জাহীদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘বিনিয়োগ না আসায় একটা মন্দার পূর্বমুহূর্তের মত অবস্থায় আছে অর্থনীতি। সেখানে কর্মসংস্থান ও মজুড়ি বাড়ার আশা ক্ষীণ। তাই নির্বাচিত সরকার আসার পরে বিনিয়োগ বাড়লে কিছুটা স্বস্তিতে যেতে পারে অর্থনীতি।’’