Published : 30 Aug 2025, 09:30 AM
ডাকসু ভবনের সংগ্রহশালার লম্বা কাষ্ঠফলক দেখে ভ্রূ কুঁচকে যেতে পারে অনেকের; সেই ষাটের দশকের উত্তাল সময়ে জ্বলজ্বল করছে তিন নারীর নাম- জাহানারা আখতার, মতিয়া চৌধুরী আর মাহফুজা খানম।
ডাকসুতে নেতৃত্ব দেওয়া এই শিক্ষার্থীরা নাম লিখিয়েছিলেন তখনকার বৃহৎ ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের শত বছরের ইতিহাসে- শীর্ষ নেতৃত্বে আর কোনো নারীর নাম জানা যায় না।
ডাকসু নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে গত ১২ অগাস্ট মাহফুজা খানমের মৃত্যু হয়। ছয় দশক আগেই ছাত্র সংসদে নারীরা যে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেই এগিয়ে যাওয়ার কথা সামনে আসে এই শিক্ষকের বিদায়ে।
তিন নারী নেতার মধ্যে দুজনের বিষয়ে জানা গেলেও প্রথম নারী ভিপি (সহ-সভাপতি) জাহানারা সম্পর্কে জানা যাচ্ছে কমই। ডাকসুর সংগ্রহশালার ফলকে নাম থাকলেও আর কিছু সেখানে নেই। ডাকসুর সাবেক নেতা বা গবেষকরাও তেমন কিছু বলতে পারছেন না।

সংগ্রহশালায় ভিপি ও জিএসের (সাধারণ সম্পাদক) যে তালিকা রয়েছে, তাতে উল্লেখ করা আছে- বেগম জাহানারা আখতার ১৯৬০-৬১ শিক্ষাবর্ষে ভিপি হন। দুই বছর বাদে (১৯৬৩-৬৪) প্রথম নারী জিএসও পায় ডাকসু। ‘অগ্নিকন্যা’ হিসেবে পরিচিত মতিয়া চৌধুরী এ রেকর্ড গড়ার আগে ছাত্ররাজনীতিতে নাম লেখান। ১৯৬১-৬২ সালে ইডেন কলেজে ভিপি হয়েছিলেন তিনি।
আর মাহফুজা খানম ডাকসুর ভিপি ছিলেন ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান স্নাতকোত্তর শেষে তিনি লন্ডনের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পেলেও রাজনৈতিক কারণে তখন তাকে পাসপোর্ট দেয়নি পাকিস্তান সরকার। সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের স্ত্রী মাহফুজা শিক্ষায় বিশেষ অবদান রাখায় ২০২১ সালে একুশে পদক পান।

মাহফুজার মৃত্যুর পর তাকে প্রথম ও একমাত্র নারী ভিপি হিসেবে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পরে জানা যায়, তারও আগে জাহানারা আখতারের নেতৃত্বের কথা।
জাহানারার খোঁজে
জাহানারা আখতারের বিষয়ে জানতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কথা বলেছে ডাকসুর প্রবীণ কর্মী, সাবেক নেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি-বিষয়ক গবেষকদের সঙ্গে।
স্বাধীন বাংলাদেশে ডাকসুর প্রথম ভিপি হয়েছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার সঙ্গে জাহানারা আখতারের কখনোই সামনাসামনি দেখা হয়নি। তবে ক্যাম্পাসে থাকাকালীন তার নাম শুনেছি। খুব বেশি কিছু এখন মনেও নেই।”
স্মৃতি হাতড়ে সেলিম বলছিলেন, “ষাটের দশকের শুরুর দিকে যখন শিক্ষা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে, তখন জাহানারা আখতার খুবই সক্রিয় ছিলেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওই সময়টাতে তো ছাত্র ইউনিয়নের একটা জোয়ার ছিল। তার ব্যাপারে খুব বেশি এখন মনে নেই।”

মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই ডাকসু ও মধুর ক্যান্টিনে কাজ করা একজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি ওনাকে (জাহানারা) সামনাসামনি কখনো দেখি নাই। তবে উনার ব্যাপারে জানতাম। তিনি বাম ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন।”
সংবাদমাধ্যমে তিনি নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বাবারে আমার এখন বয়স হইছে, সামনে ডাকসু নির্বাচন। অহন কোন কথা থেকে আবার কী হয়!
“আপনার কাছে অনুরোধ- আমার নাম ব্যবহার করে কোনো কিছু লিখেন না।”
কবে ডাকসুতে যুক্ত হয়েছিলেন, জানতে চাইলে তিনি বললেন, “আমি মধুর ক্যান্টিনে কাজ করতাম। ’৬৯ বা ’৭০ সাল থেকে ডাকসুতে কাজ করি। তখনো তো ছোটই ছিলাম।
“মাখন (আবদুল কুদ্দুস মাখন) ভাই আমারে ডাকসুতে নিয়ে আসছিল। ডাকসুর অনেক ছবি আমার তোলা, যেগুলো পত্রিকাতেও ব্যবহার হইছে।”

স্বাধীন বাংলাদেশে ডাকসুর প্রথম সাহিত্য সম্পাদক হয়েছিলেন অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী। পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ভাষাবিদ, আবৃত্তি ও নাট্য প্রশিক্ষক হিসেবে সুনাম রয়েছে এ অধ্যাপকের।
নিরঞ্জন অধিকারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি ’৬৭ সালে ক্যাম্পাসে আসি। পরে তো ডাকসুতে নির্বাচন করে সাহিত্য সম্পাদকও হয়েছি।
“জাহানারা আখতারের নাম শুনেছি বলে এই মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারছি না, অবশ্য বয়সের কারণেও এখন স্মৃতি ভুলে গিয়েছি।”
নাগরিক ঐক্যর সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ১৯৭৯-৮০ ও ১৯৮০-৮১ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুর ভিপি ছিলেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা যখন ক্যাম্পাসে ছিলাম; এই নামটি শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।
“ডাকসুর তালিকায় যখন নামটা আছে, তাহলে তো অবশ্যই তিনি ভিপি ছিলেন।”

১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুতে জিএস হয়েছিলেন মুশতাক হোসেন, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য। মুশতাক হোসেনও জাহানারাকে নিয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের কাছে জাহানারা আখতার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনেকের ব্যাপারে হুট করেই বলে দেওয়া যায়। কিন্তু জাহানারা আখতারকে নিয়ে তেমন কোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় না।
“তিনি ডাকসুর প্রথম নারী ভিপি ছিলেন। এই তথ্যটা ঠিক আছে। কিন্তু উনার সম্পর্কে বিস্তারিত আমারও জানা নেই। আমি ছাত্রাবস্থায় নাম শুনেছি বলে মনে করতে পারছি না।”
জাহানারা আখতারকে নিয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেননি ‘বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস’ গ্রন্থের রচয়িতা ড. মোহাম্মদ হাননানও।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাহানারা আখতার ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। ছাত্র ইউনিয়ন থেকেই তিনি ভিপি হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তো তার কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আর দেখা যায়নি।
“উনার সমসাময়িকদের বেশির ভাগই এখন বেঁচে নেই। হায়দার আকবর খান রনো হয়তো উনার ব্যাপারে বলতে পারতেন। তিনি তো বেঁচে নেই। গবেষক আহমদ রফিকও হয়তো বলতে পারবেন। কিন্তু তিনি তো কথা বলার মতো শারীরিক অবস্থায় নেই।”
ইতিহাসের পাতায়
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে, জাহানারা আখতার সম্পর্কে জানতে তারা ১৯৬১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক মর্নিং নিউজ, পাকিস্তান অবজারভারের প্রতিবেদন দেখেছে।

পুরনো দিনের পত্রিকার মহাফেজখানা ‘সংগ্রামের নোটবুক’ ওয়েবসাইটে দেখা যায়, পাকিস্তান অবজারভারের ১৮ ফেব্রয়ারি সংখ্যায় নবনির্বাচিত ডাকসু সদস্যদের অভিষেক অনুষ্ঠানের তিনটি প্রকাশ হয়েছে। ছবি ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় প্রকাশিত এসব ছবির ক্যাপশনে লেখা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের অভিষেক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন উপাচার্য ড. মাহমুদ হুসেন; শপথ পাঠ করেন ইউনিয়নের সহ-সভাপতি জাহানারা আখতার। আরেকটি ছবির ক্যাপশনে নৃত্য পরিবেশনের কথা বলা হয়েছে।
একইদিন দৈনিক আজাদ পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি সংবাদে জাহানারা আখতারকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী সহ-সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার আগের দিন ইংরেজি দৈনিক দ্য মর্নিং নিউজে ‘শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর আহ্বান: বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা প্রসারের ডাক ভিসির’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, “এই বছর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের কমিটি গঠনে একটি বিশেষ দিক ছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী শিক্ষার্থী সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। উইমেন্স হলের মিস জাহানারা হলেন নবনির্বাচিত সহ-সভাপতি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রোকেয়া হলের তখন নাম ছিল উইমেন্স হল।

রাজনীতিক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “’৭০ সালের আগ পর্যন্ত তো ডাকসু নির্বাচন সরাসরি ভোটে হতো না। বিভিন্ন হল সংসদ থেকে মনোনীতরা ডাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচিত করতেন।
“তখন একেকবার একেক হল থেকে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হতো। উইমেন্স হল বা রোকেয়া হল কোটায় হয়তো জাহানারা আখতার ভিপি হয়েছিলেন।”
১৯৯১ সালে ডাকসুর একটি প্রকাশনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে হলকেন্দ্রিক ছাত্র সংসদ গঠন করা হলেও একে ‘ডাকসু’ নামে ডাকা হতো না। প্রায় তিন দশক পর নামকরণ হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ বা Dhaka University Central Students' Union (DUCSU)।
“পরোক্ষ নির্বাচন-প্রথার বদলে ডাকসুতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন চালু হলো ১৯৭০ সালে।”
ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “রব ভাইয়ের সময় (আ স ম আবদুর রব) প্রথম ডাকসুতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন শুরু হয়েছে। ওই মেয়াদে সহসভাপতি হন রব ভাই এবং জিএস (সাধারণ সম্পাদক) হন আবদুল কুদ্দুস মাখন।
“স্বাধীনতার পর ডাকসুতে প্রথম ভিপি হন মুজহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস হন মাহবুব জামান।”
ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক সংবাদ পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল, ‘হত্যাকারীদের শাস্তি চাই: ছাত্র নেতৃবৃন্দের বিবৃতি’।
কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিস লুমুম্বার হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করে বিবৃতি দানকারীদের মধ্যে জাহানারা আখতারকে ডাকসুর সহ-সভানেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে জাহানারা আখতার সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন।
১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘শহীদ দিবস’ পালন করা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগের দলিলে তখনকার চিত্র ফুটে ওঠে।
ডিসমিসল্যাব লিখেছে, বইটির ৮১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক তাহেরউদ্দিন ঠাকুর বক্তৃতা দেন। এরপর একই সংগঠনের এ. কে. এম. জিয়াউদ্দিন পুলিশের গুলিতে নিহত বরকতের মা-বাবার কাছে পাঠানোর উদ্দেশ্যে লেখা একটি বার্তা পাঠ করেন। তারপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি জাহানারা আখতার একটি রেজুলেশন পাঠ করেন।
বইটির ৮২ পৃষ্ঠায় শহীদ দিবস পালনে অগ্রণী নেতৃত্ব এবং সংগঠক হিসেবে ১৩ জনের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে ৭ নম্বরে রয়েছে জাহানারা আখতার। নামের পাশে তাকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সমর্থক এবং ডাকসুর সহ-সভাপতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।