১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

অর্কিড প্লাজায় আগুন: ক্লান্ত কর্মীরা ঘুমাচ্ছিলেন, চালু ছিল আয়রন বক্স

“অনেক সময় সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ভবনে এভাবে কাচ লাগানো হয়; কিন্তু ভেন্টিলেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই।”

মিঠুন চৌধুরী মিঠুন চৌধুরী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 Mar 2026, 07:11 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:12 PM

চট্টগ্রামের টেরিবাজারে কে বি অর্কিড প্লাজায় যে দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত, সেখানে কর্মীরা সারারাত কাজ করে ভোরের দিকে ঘুমিয়েছিলেন। দোকানটিতে আয়রন বক্স চালু থাকায় আগুন ধরে যায় বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। 

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ‘আয়রন বক্স’ চালু থাকা ও ‘বৈদ্যুতিক গোলযোগ’ থেকে আগুনের সূত্রপাত্র বলে ধারণা করছেন। 

বৃহস্পতিবার বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন চৌধুরীও এমন তথ্য তুলে ধরেছেন।

টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতারাও বলছেন, তারা জানতে পেরেছেন ভোরে ওই দোকানের কর্মীরা ঘুমানোর সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। এর আগে তারা কাজ করছিলেন। কর্মীরা ঘুমিয়ে পড়ার পর সকালে বিদ্যুৎ আসে। পরে সেখানে আগুন লাগে। 

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে নগরীর টেরিবাজারের বক্সির বিটের কাছে কে বি অর্কিড প্লাজা নামে ১২তলা ওই ভবনের চতুর্থ তলায় একটি দোকানে আগুন লাগে। 

পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখান থেকে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া তিনজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

বেলা পৌনে ১২টার দিকে সেখানে দুজনের মৃত্যু হয় বলে মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই নুরুল আলম আশেক জানান।

মৃত দুজন হলেন—মোহাম্মদ ইউনূস (৫২) ও মুনতাসির সোলায়মান (২৭)। আহত একজনের নাম মো. মামুন। 

তাদের মধ্যে সোলায়মান ওই মার্কেটের নিচ তলার মিলানো সুজ নামে একটি দোকানে চাকরি করতেন আর ইউনূস ছিলেন পাকিজা টেইলারিং কারখানার দর্জি। 

নিহত সোলায়মানের বাড়ি পটিয়া উপজেলার চরকানাই এলাকায়, আর ইউনূসের বাড়ি একই উপজেলার শান্তির হাটে। 

বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “এখানে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরেজমিন দেখলাম, এটা খুবই অমানবিক ঘটনা। 

“ঈদের ঠিক একদিন আগে, যারা মানুষকে ঈদের খুশি দিতে রাতদিন পরিশ্রম করে, তারা অনেকটা সাফোকেটেড হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। 

“এটা অসাবধানতাবশত একটা দুর্ঘটনা। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে তারা ঘুমিয়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল, কিন্তু আয়রন বক্সের পাওয়ার বন্ধ করেনি। বিদ্যুৎ আসার পর সেটা কনটিনিউ জ্বলছিল। সেকারণে হয়ত দুর্ঘটনা ঘটেছে।”

ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওয়েস্টার্ন টেইলার্স নামের একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। সেখানে কর্মীরা সারারাত সেলাই করেছে ও আয়রন করেছে। 

“ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তারা ঘুমাতে যায়। কিন্তু আয়রন অন ছিল। পরে বিদ্যুৎ আসলেও সেটা জ্বলছিল। ওটা থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি।” 

আগুনে ভবনের চতুর্থ তলায় ওয়েস্টার্ন টেইলার্সসহ মোট সাতটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পঞ্চম তলায় কোনো প্রতিষ্ঠানে খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রামের বিভাগের উপ-পরিচালক মো. জসিম উদ্দীন। 

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। আমরা শুনেছি, আয়রন বক্স অন ছিল। আগুন নির্বাপণে গিয়ে আমরা চারজনকে উদ্ধার করি। তাদের মধ্যে একজন ছয় তলায় মসজিদে ছিলেন। 

“মূলত ধোঁয়ার কারণে তারা আহত-নিহত হয়েছেন। ভবনটির ওই অংশ কাচ ঘেরা থাকায় আগুন লাগার পর ধোঁয়া বের হতে পারেনি। অনেক সময় সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ভবনে এভাবে কাচ লাগানো হয়। কিন্তু ভেন্টিলেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। সেক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে অক্সিজেনের সংকটও দেখা দেয়। পরে আমরা ওই কাচ ভেঙে ফেলি।” 

অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে। আয়রন বক্স অন ছিল। ওই টেইলার্সের কর্মীরা সারারাত কাজ করে ভোরের দিকে ঘুমিয়েছিল।” 

আগুনে দুজন নিহত এবং দুজন আহত হন জানিয়ে আবদুল মান্নান বলেন, “নিহতদের দাফন এবং আহতদের চিকিৎসার বিষয়ে আমরা খোঁজ রাখছি। আহতদের মধ্যে একজন জেনারেল হাসপাতালে ও অন্যজন চট্টগ্রাম মেডিকেলে আছেন।” 

বিকালে পরিদর্শনে গিয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “এখানে ভবন মালিক এবং টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আছেন। সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করব নিহত ও আহতদের বিষয়ে কী করা যায়। 

“নিহতদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা উচিত। পরিবারগুলো যাতে ক্ষতিপূরণ পায় তা অবশ্যই দেখতে হবে। পরিবারগুলো ঈদে আনন্দ করার কথা ছিল তা আজ বিষাদে পরিণত হয়েছে।” 

এর আগে দুপুরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান বহুতল ওই ভবনটি কাচ ঘেরা হওয়ায় আগুন লাগার পর ধোঁয়া বের হতে পারেনি। আর একারণেই ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে দু’জন নিহত হয়। 

১২ তলা বহুতল এ ভবনের পঞ্চম তলা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের দোকান ও কারখানা। ষষ্ঠ তলায় মসজিদ এবং তার উপরে আবাসিক। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের বিভাগীয় উপ-পরিচালক মো. জসিম উদ্দীন বলেন, “বিষয়টি আমরা পরে খতিয়ে দেখব।” 

ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, আগুনে ওই ভবনের চতুর্থ তলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। 

টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, “আজ ওয়েস্টার্ন টেইলার্সের কর্মীদের বেতন দেয়ার কথা ছিল। আগুন লাগার পর সেখানে গিয়ে সাত লাখ টাকা বেশি নগদ টাকা পেয়েছি। এরমধ্যে অল্প কিছু টাকা পুড়েছে। পুরো টাকা প্রতিষ্ঠান মালিক মো. শওকতের বাবার হাতের আমি বুঝিয়ে দিয়েছি।”  

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, “টেরিবাজারে অগ্নি দুর্ঘটনায় দু’জনকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। এদের শরীরের বাইরের অংশে কোনো বার্ন নেই। কিন্তু তাদের শ্বাসনালী পুরোটা পুড়ে গেছে। 

“আরেকজন আহত অবস্থায় এসেছেন। তিনি বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন।”

আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়, আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর তাদের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে বেলা ১১টার দিকে আগুন নেভায়। আগুনে অর্কিড প্লাজার চতুর্থ তলার টেইলারিং শপ, কাপড়ের দোকানসহ মোট সাতটি দোকান পুড়ে গেছে।

ওই বহুতল ভবনের বিভিন্ন তলায় ব্যাংকের শাখা, তৈরি পোশাকের দোকান, টেইলারিং শপ, কাপড়ের দোকানসহ বিভিন্ন দোকান রয়েছে।

টেরিবাজারে বাণিজ্যিক ভবনে আগুনধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে দুজনের মৃত্যু

অর্কিড প্লাজায় ২ মৃত্যুকাচ ঘেরা ভবন থেকে 'ধোঁয়া বের হতে পারেনি'