Published : 09 Sep 2025, 05:34 PM
এক বছরে দেশের শতাধিক মাজার ও খানকায় হামলা, ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় না আনায় এই ‘ধংসযজ্ঞ’ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা’আত এর নেতারা।
মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আহলে সুন্নাতের এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মাজার ও খানকায় হামলার এসব ঘটনা ‘কথিত তৌহিদী জনতা, ঈমান সংরক্ষণ কমিটি ও সাধারণ মুসল্লি’ নাম দিয়ে হলেও হামলাকারীরা মূলত ‘উগ্রবাদী’।
দেশব্যাপী জশনে জুলুছ, বিভিন্ন মসজিদ, শতাধিক মাজার ও খানকাহ শরীফে ‘হামলা, ভাংচুর, লুঠতরাজ ও অগ্নিসংযোগের’ প্রতিবাদে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা’আত এর চেয়ারম্যান কাজী মঈনুদ্দিন আশরাফি বলেন, “দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আমাদের সকলের একান্ত কাম্য। কিন্তু ৫ অগাস্টের পট পরিবর্তনের পর দেশব্যাপী পীর-আউলিয়া কেরামের মাজার শরীফসমূহে কথিত তৌহিদি জনতা, ঈমান সংরক্ষণ কমিটি ও সাধারণ মুসল্লিদের নাম ব্যবহার করে উগ্রবাদীদের ঘৃণ্য হামলা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সুফীবাদী সুন্নী মুসলমানদের চরমভাবে আশাহত করেছে।
“এ যাবৎ শতাধিক মাজারে হামলা, লুটপাট, অগ্নি সংযোগের মত জঘন্য ধংসযজ্ঞ পরিচালিত হলেও এক্ষেত্রে দোষীদের চিহ্নিত করে প্রচলিত আইনে তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি।”
এ কারণে প্রতিনিয়িত দেশব্যাপী এই ‘ধংসযজ্ঞ’ আশংকাজনকভাবে বেড়ে চলেছে মন্তব্য করে মঈনুদ্দিন আশরাফি বলেন, “অতি সম্প্রতি রাজশাহীতে দরবার-খানকায় হামলা এবং রাজবাড়ীতে নুরু (নুরাল) পাগলার মৃত্যুর প্রায় ২৫দিন পর কবর থেকে লাশ তুলে দিনে-দুপুরে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় দেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ চরমভাবে আশাহত হয়েছে।
“অথচ ইসলামী শরিয়ত মতে, আগুনের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান নিষিদ্ধ। জীবিত হোক বা মৃত। বোখারি শরিফে স্পষ্ট আছে, আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি প্রদানের অধিকার একমাত্র আগুনের স্রষ্টা মহান আল্লাহর। নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলা শরিয়তবিরোধী।”
ধর্ম উপদেষ্টার পক্ষ হতে এসব ঘটনার বিষয়ে কোনো বক্তব্য এবং কার্যকর পদক্ষেপ না আসা ‘খুবই উদ্বেগের’ মন্তব্য করে মঈনুদ্দিন আশরাফি বলেন, “লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলার বিষয়ে দেশের প্রচলিত আইনে কী আছে সেটা সরকার দেখবে। কিন্তু ধর্ম উপদেষ্টা এ বিষয়ে তো একটা বক্তব্য দিতে পারতেন।
“হামলাকারী কারা তাদের চিহ্নিত করা হোক। আমি রাজনৈতিক পরিচয়ে যাব না। কিন্তু তারা কাদের অনুসরণ করে? কথিত তৌহিদী জনতার অনুসরণীয় আলেমদের পক্ষ থেকেও কোনো বক্তব্য আসেনি।”
এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনের ‘নীরবতা বিশৃঙ্খলাকারীদের বেপরোয়া করে তুলেছে’ অভিযোগ করে আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা’আত এর চেয়ারম্যান কাজী মঈনুদ্দিন আশরাফি বলেন, “প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৌহিদি জনতা, ঈমান সংরক্ষণ কমিটি এবং সাধারণ মুসল্লি সমাজের নাম ব্যবহার করে তারা নারকীয় ও বিভৎস ঘটনাগুলো সংগঠিত করেছে।
“মাজার ভাঙাসহ এ ধরনের প্রতিটি নারকীয় ঘটনায় মূলত উগ্রবাদীরাই জড়িত। মূলত তারা শান্তিপ্রিয় সুফিবাদি শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রে নেমেছে। দেশের এই সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা প্রশাসনের নিরপেক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছি।”
‘মিলাদুন্নবীর বিরোধিতা রাষ্ট্রদ্রোহিতা’
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’ বক্তব্য রেখে পরিস্থিতি ‘আরো ঘোলাটে করেছেন’ বলে অভিযোগ করেন কাজী মঈনুদ্দিন আশরাফি।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় দিবস হিসেবে ঈদে মিলাদুন্নবী সারাদেশে পালিত হচ্ছে। বায়তুল মোকাররমের খতিব নিজেও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সদস্য।
“দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অবস্থায় জাতীয় মসজিদের খতিব কর্তৃক পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী নিয় প্রশ্ন তুলে সারাদেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি ও রাষ্ট্রীয় দিবসের বিরুদ্ধে কথা বলে তিনি প্রকারান্তরে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দোষে অপরাধী। তিনি জাতীয় মসজিদের খতিবের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।”
চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা এলাকায় জশনে জুলুছের দিনের ঘটনা বিষয়ে মঈনুদ্দিন আশরাফি বলেন, “সেদিন উত্তর চট্টগ্রাম থেকে আসা গাড়িগুলোতে জশনে জুলুছে অংশগ্রহণকারীদের উপর হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে গরম পানি নিক্ষেপের মত ঘটনা ঘটে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে জশনে জুলুছে অংশগ্রহণকারী একজন আঙ্গুল প্রদর্শন করে।
“তবে, জুলুসের একদিন আগে উক্ত মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষার্থীদের নাম দিয়ে তৈরি করা প্যাডে জুলুসে অংশ নেওয়া মুসল্লিদের প্রতিরোধ করার ঘোষণা দেয়া হয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী তারা জুলুসের গাড়িগুলোতে হামলা চালায়। এসব উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলায় অনেক মানুষ প্রচণ্ডভাবে আহত হয়।”
সেদিন গরম পানি নিক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আঙ্গুল প্রদর্শনকারীকে দ্রুত সময়ে গ্রেপ্তার করা হলেও বিনা উসকানিতে গরম পানি নিক্ষেপকারীদের বিষয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া ‘পরিস্থিতি অবনতির জন্য অনেকটা দায়ী’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় আইন উপ-কমিটির সদস্য মুখতার আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, “শনিবার রাতের ঘটনার পর রোববার প্রশাসন ও পুলিশের উপস্থিতিতে বৈঠকে গ্রেপ্তার আরিয়ান ইব্রাহিমকে মুক্তি দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। অথচ প্রশাসন কমিটমেন্ট করেও তা রক্ষা করেনি। আমরা তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি।”
এক বছর ধরে সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ইস্যু সৃষ্টি করে মবের মাধ্যমে’ মাজার ও খানকায় হামলা, আহলে সুন্নাত কর্মী রইস উদ্দিন হত্যা, মাজারের খাদেম হত্যা ও বিভিন্ন সুফবাদী ব্যক্তিকে হত্যাসহ সব ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করে মামলা দায়ের, শাস্তি নিশ্চিত, ক্ষতিগ্রস্ত মাজার-খনকা সংস্কার এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জশনে জুলুস ঠেকাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান নেওয়া ‘উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে’ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান আহলে সুন্নাত নেতারা।
অন্যদের মধ্যে অছিয়র রহমান আলকাদেরী, আবুল কাশেম নুরী, আবুল ফারাহ মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, শফিউল আলম নিজামী, নাছেরুল হক চিশতী, হারুনুর রশিদ আশরাফী, রফিক উদ্দিন ছিদ্দিকী, মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, ইসমাইল নোমানী, অধ্যক্ষ হাসান রেজা কাদেরী এবং নুর মোহাম্মদ আলকাদেরী সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।