Published : 29 May 2026, 09:00 AM
দেখতে সিংহের মত হলেও শরীরে বাঘের ডোরাকাটা দাগ। তবে সে সিংহও নয়, বাঘও নয়। সে পুরুষ সিংহ (লায়ন) ও স্ত্রী বাঘের (টাইগার) সংকায়নে জন্ম নেওয়া প্রাণী ‘লাইগার’।
আকারে বেশ বড় বিড়াল প্রজাতির এই প্রাণী বাঘের মত সাঁতারও কাটতে জানে। বিশ্বের বহু দেশে একাধিক ‘লাইগার’ থাকলেও বাংলাদেশের একমাত্র ‘লাইগারটি’ আছে খুলনার ‘বনবিলাস চিড়িয়াখানায়।’
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘ থাকলেও কোথাও সিংহ নেই। তবে দেশের চিড়িয়াখানাগুলোতে বাঘ ও সিংহ আছে বহু বছর ধরে। কিন্তু জানা মতে, বাঘ-সিংহের সংকরায়নে এর আগে ‘লাইগার’ জন্মের উদ্যোগ দেশে কখনো নেওয়া হয়নি।
বনবিলাস চিড়িয়াখানায় যে ‘লাইগারটি’ বড় হচ্ছে ২০১৮ সালে বিজিবি সেটি সীমান্ত এলাকা থেকে বাচ্চা অবস্থায় পাচার হওয়ার হাত থেকে উদ্ধার করে। যদিও লাইগারটিকে কোথা থেকে বাংলাদেশে আনা হয়েছে বা কারা কোথায় পাচার করছিল সে তথ্য নেই।
উদ্ধারের পর বাচ্চাটির ঠাঁই হয় খুলনা নগরীর গিলাতলা এলাকার এই চিড়িয়াখানায়। আনুমানিক ৮/৯ বছর বয়সি লাইগারটি বনবিলাসে ভালো ও সুস্থ্ আছে।
বিরল দর্শন এই প্রাণীকে দেখতে চিড়িয়াখানায় আসা দর্শনার্থীদেরও বেশ আগ্রহ।

গিলাতলা এলাকায় খুলনা ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন ‘বনবিলাস’ চিড়িয়াখানাটি পরিচালনা করে সেনানিবাস কর্তৃপক্ষ। চিড়িয়াখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ আজিজুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চিড়িয়াখানার পুরনো কর্মীরা বলেছেন, সাত বছর ধরে লাইগারটি এখানে আছে। বিজিবি কোনো এক সীমান্ত থেকে উদ্ধারের পর বাচ্চা অবস্থায় এটিকে এখানে দিয়ে যায়।
“লাইগারটি পুরুষ। এটিকে সপ্তাহে পাঁচ দিন গরুর মাংস ও একদিন মুরগির মাংস খেতে দেওয়া হয়। সপ্তাহে একদিন খাবার দেওয়া হয় না। দিনে ছয় কেজি গরুর মাংস খায় লাইগারটি।”
একজন প্রাণী চিকিৎসক মাসে একবার লাইগারের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন জানিয়ে ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, “দর্শনার্থীদের মধ্যে লাইগার নিয়ে বেশ আগ্রহ আছে। অনেকে দেখতে আসেন।”
সম্প্রতি বনবিলাস চিড়িয়াখানায় গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য প্রাণী থাকলেও দর্শনার্থীদের মূল আগ্রহ লাইগারকে ঘিরে। লাইগারটির খাঁচা দুই স্তরের লোহার শিক দিয়ে ঘেরা। তার ভেতরে দিব্যি হাঁটাচলা করে বেড়াচ্ছে লাইগার। কখনো গরমে হাঁপিয়ে উঠলে একটু বসে জিরিয়ে নেয়। দুয়েকবার মৃদু গর্জনও করতে দেখা যায় প্রাণীটিকে।
চট্টগ্রাম থেকে খুলনায় বেড়াতে আসা সমীর কুমার দে বলেন, “বন্ধুদের নিয়ে খুলনায় বেড়াতে এসেছি। সুন্দরবন গিয়েছি। খানজাহান আলীর মাজার দেখতে গিয়েছি। তারপর এখানকার চিড়িয়াখানায় এরকম একটা প্রাণী আছে শুনে দেখতে এলাম। লাইগার কখনো দেখিনি। নতুন অভিজ্ঞতা হল।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ ছবি ও ভিডিও দেখার পর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশে আর কোনো লাইগার আছে এমন তথ্য নেই। এটি সিংহ ও বাঘের সংকর। এর ছেদন দাঁত দেখে ধারণা করছি, বয়স আনুমানিক ৮-৯ বছর হতে পারে।
“সিংহ ও বাঘিনীর মধ্যে প্রজননে লাইগারের জন্ম হয়। বনবিলাসের লাইগারটি পুরুষ। এর বৈশিষ্ট্য দেখে মনে হচ্ছে, এর মধ্যে মেইল জিন ডমিনেট করছে। যেমন- লাইগারটির কেশর আছে, যা সিংহের থাকে। শরীরের উপরের অংশ এবং হাঁটাচলাও সিংহের মত। তবে লাইগার বাঘের মত ক্ষিপ্র না।”
বাঘিনীর গর্ভে জন্ম হওয়ায় এর মধ্যে বাঘেরও কিছু বৈশিষ্ট্য থাকবে জানিয়ে অধ্যাপক আজিজ বলেন, “লাইগারটির নাক, মুখ, চোখ বাঘের মত। আবার বাঘের মত ডোরাকাটা দাগও শরীরে আছে। যদিও এই দাগগুলো অনেকটাই ঝাপসা। বাঘ ও সিংহ দুটি প্রাণীর জিনগত বৈশিষ্ট্যই এর মধ্যে আছে।”

বিভিন্ন দেশে সৌখিন প্রাণী পালকরা ‘অ্যানিম্যাল ব্রিডারদের’ দিয়ে এ ধরনের প্রাণীর জন্ম দেওয়ান জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রাকৃতিক পরিবেশে লাইগারের জন্ম অসম্ভবই বলা যায়। কারণ বিশ্বে এমন কোনো বনাঞ্চল নেই, যেখানে বাঘ ও সিংহ দুটোই আছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ সিংহের বাস আফ্রিকা মহাদেশে। আর ভারতের গুজরাটে একটি বনে সিংহ আছে। কিন্তু সেখানে কোনো বাঘ নেই।
“এছাড়া তাদের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্যে যেহেতু অনেক ফারাক, তাই বাঘ ও সিংহ কাছাকাছি এলেও প্রকৃতিতে এদের মিলিত হওয়ার সম্ভবনা একদমই নেই বলতে গেলে।”
বনবিলাস চিড়িয়াখানায় পুরুষ লাইগারটির কোনো সঙ্গিনী নেই। তবে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ধরনের সংকর প্রাণীর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা থাকে না।
বনবিলাস চিড়িয়াখানায় লাইগার এর পরিচিতি লেখা একটি বোর্ড আছে। তাতে লাইগার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দেওয়া আছে।

বোর্ডে লেখা- “বিড়াল প্রজাতির মধ্যে লাইগারের আকার সব চাইতে দীর্ঘ। পুরুষ লাইগার ৩ থেকে ৩ দশমিক ৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ লাইগার এর ওজন ৩০০ থেকে ৪৫০ কেজি পর্যন্ত হয়।
“বিজ্ঞানীরা বলেছেন, পুরুষ সিংহের শরীরে এক বিশেষ গ্রোথ প্রোমোটিং জিন থাকে যা বাঘদের থাকে না, ফলে লাইগার বাড়তেই থাকে। সিংহ বা সিংহীর চেয়ে লাইগার অনেক বেশি খেলা প্রিয় এবং সামাজিক প্রাণী। লাইগার মানুষের সান্নিধ্য পেতে ও খেলতে পছন্দ করে।”
সাধারণত একটি বাঘের গড় আয়ু ১২-১৩ বছর এবং একটি সিংহের গড় আয়ু ১৪-১৫ বছর। তবে বন্দি অবস্থায় বাঘের আয়ু আরো বেশি হয় জানিয়ে অধ্যাপক আজিজ বলেন, “চিড়িয়াখানায় বাঘ ২৭ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচারও রেকর্ড আছে। সিংহ ও বাঘের কাছাকাছিই লাইগারের আয়ু হতে পারে। তবে ক্যাপটিভিটিতে লাইগারটি কত বছর আয়ু পেতে পারে সেটা ধারণা করা কঠিন।”
[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন খুলনা প্রতিনিধি শুভ্র শচীন।]