সূর্য সেনের নামে স্মৃতি জাদুঘর স্থাপনের দাবি

মাস্টারদার ফাঁসি দিবসকে জাতীয়ভাবে পালনেরও দাবি উঠেছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 Jan 2023, 03:30 PM
Updated : 12 Jan 2023, 03:30 PM

চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনের ফাঁসি দিবসে তার নামে স্মৃতি জাদুঘর স্থাপনের দাবি উঠল; ফাঁসি দিবসকে জাতীয়ভাবে পালনের দাবিও জানানো হলো।

বৃহস্পতিবার বন্দরনগরীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে স্মরণ করেছে বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেছেন, “চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অধিকারসহ বিপ্লবের অগ্রনায়ক ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন। শিক্ষক হিসেবে যেমন সুনাম ছিল, তেমনই দেশের মানুষের প্রতি তার প্রবল ভালোবাসা, চরিত্রের বলিষ্ঠতা ক্রমে আকর্ষণ করেছিল তরুণদের।

“ক্লাসের ছাত্রদের বলতেন দেশের দুরবস্থার কথা, দেশপ্রেমের কথা, স্বাধীনতার কথা। সূর্য সেন গোপনে স্বাধীনতা সংগ্রামের জমি তৈরি করছিলেন। আজও বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে মাস্টারদাকে স্মরণ করে আমরা এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাই। তিনি বাঙালির বিপ্লবের ধ্রুবতারা।”

বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে সূর্য সেনের আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে বাসদ (মার্কসবাদী) চট্টগ্রাম জেলা সদস্য সচিব শফিউদ্দিন কবির আবিদ বলেন, “সূর্য সেন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলে পরাধীন ভারতের এক কোণে এ চট্টগ্রামে স্বাধীনতার স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছিলেন, যা দাবানল হয়ে পুরো ভারতবর্ষে ছড়িয়ে গিয়েছিল।

“দুঃখজনক হলেও সত্যি এই চট্টগ্রামে সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান ও সূর্যসেনসহ বিপ্লবীদের স্মৃতিজড়িত স্থান সংরক্ষণ ও সে গৌরবজনক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার কোন রাষ্ট্রীয় আয়োজন নেই। আমরা দাবি জানাই, অবিলম্বে চট্টগ্রামে সূর্যসেন স্মৃতি জাদুঘর স্থাপন ও প্রীতিলতা, তারকেশ্বর দস্তিদারসহ বিপ্লবীদের স্মৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিতে হবে।”

বাসদ (মার্কসবাদী) চট্টগ্রাম জেলার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা কমিটির সদস্য ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য সোমা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের নেতা রিপা মজুমদার, পুষ্পিতা নাথ, আবদুল্লাহ জাওয়াদ।

দুপুরে জে এম সেন হলে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের পক্ষে মাস্টারদার ভাস্কর্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন নগর আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক জহর লাল হাজারী, নগর মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কাউন্সিলর নিলু নাগ, কাউন্সিলর রুমকি সেনগুপ্ত, আঞ্জুমান আরা ও তছলিমা বেগম রুবি, নারী নেত্রী নন্দিত দাশগুপ্ত।

বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে মাস্টারদা সূর্য সেন ও বিপ্লবী নেতা তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির মঞ্চে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

ফাঁসির মঞ্চে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী সিঞ্চন ভৌমিক বলেন, “দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মদানকারী বীরদের এই ফাঁসির মঞ্চ আমাদের তীর্থ স্থান। বিপ্লবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক।

“এই ফাঁসির মঞ্চে মাস্টারদা সূর্য সেনের সাথে প্রাণদানকারী বিপ্লবী নেতা তারকেশ্বর দস্তিদারের নাম ও ম্যুরাল সংযুক্ত করার আশ্বাস প্রদান করায় জেলা প্রশাসক আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানকে কৃতজ্ঞতা জানাই।”

এ সময় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার এমরান হোসেন মিয়া ও ডেপুটি জেলার মনির হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সকালে পরিষদের পক্ষ থেকে জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে সূর্য সেনের ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এ সময় পরিষদ সভাপতি অঞ্জন কান্তি চৌধুরী বলেন, “বিপ্লবীদের পথ ধরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদেরকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ উপহার দিয়ে যান। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে বিপ্লবীদের কোনো দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় না।”

চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ দিবস, সূর্য সেন ও তারকেশ্বরের ফাঁসি দিবস এবং বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মাহুতি দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের দাবিসহ ৯ দফা দাবি জানান পরিষদ নেতৃবৃন্দ।

এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক প্রধান শিক্ষক বিজয় শংকর চৌধুরী, সুনীল দাশ, পরিষদের অর্থ সম্পাদক তপন ভট্টাচার্য্য, মো. লিপটন, কবি সজল দাশ, টিভি ও বেতার শিল্পী অচিন্ত্য কুমার দাশ, অর্ঘ্য ভৌমিক।

মাস্টারদা সূর্যসেনের ফাঁসি দিবসে বিপ্লবীদের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম যুব ইউনিয়ন।

শ্রদ্ধা নিবদেনর সময় উপস্থিত ছিলেন যুব ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি মো. শাহ আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক রাশিদুল সামির, সহ-সভাপতি প্রীতম চৌধুরী, কোষাধ্যক্ষ অভিজিৎ বড়ুয়া ও সদস্য ইন্তেখাব সুমন।

জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে সূর্য সেনের আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানায় সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ ছাত্রলীগ।

এ সময় ছাত্রলীগ নেতা আনোয়ার পলাশ বলেন, “সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের সাহসী যোদ্ধারা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে পথ দেখিয়েছিলেন, ইতিহাসে তা ছিল একটি বিরল ঘটনা। তা এখনো আমাদের প্রেরণা হয়ে আছে।”

ছাত্রলীগ নেতা মায়মুন উদ্দীন মামুন বলেন, “চট্টগ্রামের সোনালী অতীতের সকল স্মৃতি সংরক্ষণ করতে হবে। তা হলে নতুন প্রজন্ম আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।”

এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মহসিন কলেজ ছাত্রলীগ নেতা শিমলা তন্বী, নাজিম উদ্দীন, আবদুস সোবহান, মুহাম্মদ শাকিল, নাজমুল হাসান বাপ্পু, লায়লা সিকদার লিপি, জনি দাশ, যুবরাজ দাশ, আবির হোসেন, আবু সালেক, তারিবুন চোধুরি, জালাল উদ্দীন জুবায়ের, রুকন উদ্দীন, শেখ আবদুল আজিজ, সাইদুল ইসলাম, আজিজ।

এছাড়া চট্টগ্রাম বিপ্লব ও বিপ্লবী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ ও বিপ্লবী কল্পনা দত্ত স্মৃতি পরিষদ সূর্য সেনের ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেন মাস্টারদা সূর্য সেন। ভারতীয় প্রজাতান্ত্রিক বাহিনী, চট্টগ্রাম শাখা গঠন করে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ হয়।

নগরীর দামপাড়া এলাকায় তৎকালীন পুলিশ ব্যারাকের অস্ত্রাগার দখল করে নেন বিপ্লবীরা। সেখানেই অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

এরপর চারদিন স্বাধীন ছিল চট্টগ্রাম। পরে ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। তিন ঘণ্টার সেই যুদ্ধে ৮২ জন ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হয় এবং ১২ জন বিপ্লবী শহীদ হন।

১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ইংরেজ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন সূর্য সেন। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সূর্য সেন ও বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক