Published : 24 Jun 2026, 12:29 AM
ইরান যুদ্ধের কারণে ১১৫ দিন পারস্য উপসাগরে আটকে থাকার পর অবশেষে হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’; স্বস্তি ফিরেছে নাবিকদের মাঝে।
কীভাবে জাহাজটির এ রুদ্ধশ্বাস যাত্রার অবসান হল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে সেটির বর্ণনা দিয়েছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক।
তিনি বলছেন, ‘আওয়ার অব ডার্কনেস’ বা সন্ধ্যার পর আঁধারকে কাজে লাগিয়ে লাভ-ক্ষতি ও ঝুঁকি সতর্কভাবে বিবেচনা করেই বাংলার জয়যাত্রা হরমুজ পার হয়েছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরেক প্রান্তের ফুজাইরাহ বন্দরের বর্হিনোঙরে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর ৩টায় জাহাজটি হরমুজ অতিক্রম করে। জাহাজটির পরবর্তী বাণিজ্যিক গন্তব্য দক্ষিণ আফ্রিকা।
জাহাজটি যাত্রার আগে হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিএসসি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছিল বলে তথ্য দেন বিএসসির এমডি। তিনি বলেন, সোমবার সেখানে অবস্থানকারী জলযানগুলোতে ৬০ দিনের জন্য তেল নেওয়াসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তখনই বিএসসির মনে হয়েছে, এখানে একটা ‘এক্সিট প্ল্যান’ থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “খুব গভীরভাবে মেরিটাইম মুভমেন্টগুলো নজরদারি করছিলাম। আমরা পেইড অ্যাপ দিয়ে সবসময় মেরিন ট্রাফিক মেনটেইন করে থাকি। তখন আমরা দেখতে পেলাম, কিছু ট্যাঙ্কারের মুভমেন্ট দেখা যাচ্ছে। তখন আমি তাদের (বাংলার জয়যাত্রার নাবিকরা) বললাম, তোমরা যাত্রা শুরু করো। আওয়ার অব ডার্কনেসে যাও।

“আওয়ার অব ডার্কনেসের মধ্যেই জাহাজ হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছায়। তারা সেখানে পৌঁছানোর পর প্রথম এক দেড় ঘণ্টা ভাসমান থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। ইরানের ইসলামী রক্ষী বাহিনী আইআরজিসি বা ইরানি নৌবাহিনী কাদের সঙ্গে কী কথা বলছে তা খেয়াল করা হয়। তাদের (জাহাজের নাবিকদের) বলি, চেষ্টা করবে জাহাজকে নিয়ে অন্য মার্চেন্ট শিপের সঙ্গে সমভিব্যাহারে (সাহচর্যে) থাকতে; যাতে রাডারে কম্পোজিট (এক) ইউনিট হিসেবে দেখা যায়। তখন মেরিন ট্রাফিকে দেখলাম, আমাদের সামনে ‘ঈগল’ নামে একটা জাহাজ আছে। তার সঙ্গে আমাদের জাহাজ মোটামুটি মাস্কিং করে যাচ্ছিল।”
এরমধ্যে ‘ঈগল’ নামে জাহাজটি থেকে কয়েকবার আইআরজিসিকে কল করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলেও তথ্য দেন কমডোর মাহমুদুল মালেক। বলেন, “তখন আমরাও শুধু রেকর্ড রাখার জন্য কল করি দুইবার; যাতে কোনভাবে চিহ্নিত হয়ে না যাই।
“যখন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি, আমরা দেখলাম যে বেশ কিছু ট্যাঙ্কারও বের হচ্ছে। ঈগলও বের হয়ে যাচ্ছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছুটা ক্যালকুলেটেড রিস্ক নিয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে বাংলার জয়যাত্রাকে অগ্র্রসর হতে বলি। তারপর আমাদের পরিকল্পনা অনুসারে, জাহাজ ক্রমাগত অগ্রসর হয়ে হরমুজ প্রণালি থেকে বের হয়ে আসে।”
এই যাত্রায় সোমবার রাতেও একবার থমকে গিয়েছিল বাংলার জয়যাত্রা। সেই ঘটনার বর্ণনা করে কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, “আইআরজিসি রাত ১টার দিকে কঠোর নির্দেশনা দেয় যে, কোনো সামরিক জলযান যাতে নড়াচড়া না করে; করলে হামলা করা হবে। আমার লোকজন শুরুতে বিষয়টা বুঝতে পারেনি। তারা আমাকে বলে, ‘স্যার, মনে হয় বের হতে পারছি না। মনে হয় ওরা বিধিনিষেধ দিচ্ছে।’ তখন বললাম যে, আমাকে ভয়েজ শোনাও।”

“তখন শুনলাম তারা বলছে, ‘এনি মিলিটারি ভেসেল ক্রসিং দ্যাট উইল বি কনসিডার অ্যাজ হোসটাইল মুভমেন্ট’। আমি বললাম যে, এটা তো বাণিজ্যিক জাহাজের বিষয়ে নির্দেশনা নয়, তোমরা অগ্রসর হতে পারো। তখন আরেকটা মার্চেন্ট শিপ ঈগলের সাথে একযোগে তারা বের হয়ে আসে। তখন সামনে কিছু তেলের ট্যাঙ্কার ছিল। আর সঙ্গে ছিল ঈগল ও আরেকটি বাল্ক ক্যারিয়ার; তিনটা জাহাজ আমরা একসাথে বের হয়ে আসি।”
পর্যবেক্ষণের এই পুরো সময় অর্থাৎ সোমবার সন্ধ্যা থেকে বাংলার জয়যাত্রা হরমুজ প্রণালি অতিক্রম পর্যন্ত নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সচিব ‘সার্বক্ষণিকভাবে’ তাদের সঙ্গে ছিলেন বলে তুলে ধরেন বিএসসির এমডি।
তিনি বলেন, “কোথাও কোনো টোল না দিয়ে, জাতীয় স্বার্থে সমন্বিতভাবে সরকার, আমাদের মন্ত্রণালয়, বিএসসি কর্তৃপক্ষ এবং জাহাজ সাহসিকতার সঙ্গে কাজটা করেছে। এটা থেকে শিক্ষা হচ্ছে ভবিষ্যতে যদি এ ধরনের কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং জাতীয় স্বার্থে নির্লোভ থেকে সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করা যায়, সেখানে অবশ্যই ভালো ফল আসবে।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পারস্য উপসাগরে অবস্থান করা বাংলার জয়যাত্রার ৩১ নাবিকের সবাই বাংলাদেশি। আগে তিনবার উদ্যোগ নিয়েও হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি জাহাজটি। চতুর্থবারের চেষ্টায় সফল হল বাংলার জয়যাত্রা।
হরমুজ পাড়ি দিল 'বাংলার জয়যাত্রা', ১১৫ দিনের রুদ্ধশ্বাস যাত্রার অবসান