Published : 19 Jul 2026, 09:37 PM
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহে বাংলাদেশে মানুষের কর্মঘণ্টা ও আয় কমার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়বে বলে একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা।
জার্মানিভিত্তিক জলবায়ু, পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডেলফি গ্লোবাল’ রোববার এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বড় পরিসর, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের উচ্চ হার এবং সীমিত সামাজিক সুরক্ষার কারণে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের আর্থিক প্রভাব আরো তীব্র হয়ে উঠছে।
২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা তাপজনিত কারণে বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবস হারাতে পারেন। বর্তমানে এসব খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছতে পারে।
একই সময়ে সব খাত মিলিয়ে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ হতে পারে। এছাড়া অসুস্থতাজনিত ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা কিংবা আয় সুরক্ষার সুযোগ না থাকায় অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলেও প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং এ কল ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি অ্যাডেলফি গ্লোবাল তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
এই প্রতিবেদনের বরাতে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশকে তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে করা গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ কীভাবে একই সঙ্গে মানুষের আয় কমায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায়।
স্বাস্থ্য ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশই জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়েছে, যা গবেষণাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
একই সময়ে মাথাপিছু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় ২০০০ সালের তুলনায় ৮৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতা বাড়লে এই আর্থিক চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল উচ্চ থেকে অতি উচ্চ আর্দ্রতাজনিত তাপঝুঁকির মধ্যে থাকবে। এ সময় বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকতে পারে। চরম তাপপ্রবাহের সময় কিছু খাতে উৎপাদনশীলতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
অ্যাডেলফি গ্লোবাল বলছে, বাংলাদেশে কৃষি খাতে কর্মরত প্রায় সব নারীই অনানুষ্ঠানিকভাবে নিয়োজিত। নির্মাণসহ অন্যান্য তাপঝুঁকিপূর্ণ খাতেও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার বেশি। ফলে অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা কমে গেলে এসব শ্রমিকের আয়ও সরাসরি কমে যায়।
২০২৪ সালে চরম তাপপ্রবাহের কারণে শ্রমঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা কমে বাংলাদেশের সম্ভাব্য আয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪০০ কোটি ডলার; যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
তাপপ্রবাহের সময় বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট কর্মক্ষেত্র, কারখানা ও আবাসিক এলাকায় মানুষের তাপঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তোলে বলেও প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য ও শ্রমনীতিকে সমন্বিতভাবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে অ্যাডেলফি গ্লোবাল।
প্রতিবেদনে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো, তাপপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রম অধিকার সম্প্রসারণ, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় তাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্বাস্থ্য ও শ্রমিক সুরক্ষায় জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।