Published : 18 Apr 2026, 01:34 AM
ক্রুড অয়েল সংকটের কারণে প্রায় বন্ধের পর্যায়ে পৌঁছেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআর পিএলসি)। প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে দুটি।
অচিরেই ক্রুড অয়েলের চালান না এলে সাময়িক সময়ের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনকারী এ প্রতিষ্ঠান। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ক্রুড অয়েলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কতটা বিঘ্ন ঘটবে, সেই শঙ্কা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তরফে বলা হচ্ছে, দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার খুব কম পরিমাণই ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে আসে। চাহিদার বড় অংশ মেটানো হয় আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানি তেল দিয়ে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও ‘নিয়মিত’ পরিশোধিত তেল আমদানি হচ্ছে। এ কারণে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলেও আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি ছাড়া সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো সংকট হবে না বলে তাদের ভাষ্য।
জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর চাপ পড়বে এবং বেশি দামে এসব তেল কিনতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এটা সরকারের জন্য বাড়তি ‘চাপ’ হবে। এছাড়া তেল পরিশোধন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি যে আয় করত, সেটি তারা পাবে না।
এ ধরনের পরিস্থিতি উত্তরণে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত ইস্টার্ন রিফাইনারির নতুন ইউনিট চালুর উদ্যোগ নিতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সাগরপথে জাহাজে করে এনে পরিশোধন করা হয় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে। এ রিফাইনারির বার্ষিক শোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন।
ক্রুড অয়েল শোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন, জেট ফুয়েল, ন্যাপথা, বিটুমিন, এলপিজিসহ ১৩ ধরনের জ্বালানি উৎপাদন করছে ইস্টার্ন রিফাইনারি। তবে ডিজেলই উৎপাদন করে সবচেয়ে বেশি।
বিপিসির হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের বার্ষিক উৎপাদন ছিল ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ১৪০ টন। এর মধ্যে ডিজেল উৎপাদন হয়েছে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১২ টন।
দেশে ডিজেলের চাহিদা বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৪২ লাখ টন। চাহিদার বাকি অংশ মেটানো হয় পরিশোধিত তেল আমদানি করে।

গত অর্থবছরে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পেট্রোল মিলেছে ৫৯ হাজার ১৫০ টন (চাহিদা সাড়ে ৪ লাখ টনের মত), ফার্নেস অয়েল ৩৭ হাজার ১৪৭ টন, ন্যাপথা ১ লাখ ৫৩ হাজার ২০৩ টন। তবে অকটেন উৎপাদন হয়নি।
শোধনের পর বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল বিপিসির তেল বিপণনকারী সংস্থার মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। উপজাত হিসেবে পাওয়া ন্যাপথা দেশের কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কিনে নিয়ে ব্যবহার করে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থ বছরে (২০২৪-২৫) দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের পরিমাণ ছিল ৬৭ দশমিক ৬১ লাখ টন।
ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩ দশমিক ৬৪ শতাংশই ছিল ডিজেল। এছাড়া ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ ফার্নেস অয়েল, ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ পেট্রোল, ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ অকটেন, ৮ দশমিক ০১ শতাংশ জেট ফুয়েল, প্রায় ১ শতাংশ কেরোসিন ও বাকি ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ অন্যান্য জ্বালানি তেল।

বিপিসির হিসাবে, গত অর্থবছরে পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় ৪৬ লাখ ৭ হাজার ৮৮১ টন। এর মধ্যে ডিজেল আনা হয়েছে ৩৩ লাখ ৮ হাজার ৫০৬ টন, অকটেন ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৮২ টন, ফার্নেস অয়েল ৫ লাখ ১৬ হাজার ৩৬ টন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতে ক্রুড অয়েলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধন কার্যক্রম গত সোমবার সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। সেদিন পাঁচটি ইউনিটের দুটি ওইদিন বন্ধ হয়ে যায়। বাকি তিনটি ইউনিটে ‘ডেড স্টক’ দিয়ে শোধন কার্যক্রম চালু রাখার কথা বলা হচ্ছে।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ডেড স্টকে থাকা কিছু ক্রুড অয়েল এবং ন্যাপথা (ক্রুড অয়েল পরিশোধনের সময় উপজাত হিসেবে মেলে) দিয়ে এ কার্যক্রম চলছে। এসব ইউনিট থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২০ টন পেট্রোল ও ১০০ টন ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে থাকা ক্রুড অয়েল দিয়ে উৎপাদন আরও কিছুদিন চলবে বলে ভাষ্য মোরশেদ হোসাইনের।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ এক লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে এসেছিল। তা দিয়ে এতদিন শোধন কাজ চলছিল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। র্মাচ মাসে সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আসার কথা থাকলেও আসতে পারেনি।
সরকার বিকল্প উপায়ে সৌদি আরামকোর কাছ থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল কেনার জন্য চুক্তি করেছে। আগামী মাসে তা দেশে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা।

ক্রুড সংকটে ইস্টার্ন রিফাইনারি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ধরনের সংকট হবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন বলেন, “এটি দেশে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে। বাকি চাহিদা মেটানো হয় ফিনিশড প্রডাক্ট বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে।
“যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশে জ্বালানি তেল আমদানি প্রক্রিয়া এখনো সচল আছে। মার্চ ও এপ্রিলে বিভিন্ন দেশ থেকে ডিজেল, অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ আসছে। দেশে এখনো জ্বলানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে গেলেও চলমান তেল আমদানি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক মাসে কোনো সংকট দেখছি না।”
বিপিসি কর্মকর্তা মোরশেদ বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে পেট্রোল, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলই বেশি পাওয়া যায়। চলতি মাসে পরিশোধিত তেল আমদানি প্রক্রিয়ায় বেশ কয়েকটি জাহাজ ডিজেল নিয়ে বন্দরে এসেছে এবং আরও কয়েকটি পথে রয়েছে। সব মিলিয়ে সংকটের ‘কোনো সম্ভাবনা নেই’।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বুধবারের হিসাব অনুযায়ী, দেশে তখন ১ লাখ ৩০ হাজার ৩৮৫ টন ডিজেল, ৩১ হাজার ৮২১ টন অকটেন, ১৮ হাজার ২১ টন পেট্রোল, ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন ফার্নেস অয়েল এবং ১৮ হাজার ২২৩ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুদ ছিল।

সংকটে কী হবে
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের জ্বালানি তেল চাহিদার ছোট অংশই পরিশোধন করে থাকে। তবে সেটি পুরোপুরি বন্ধ গেলে ডিজেল, পেট্রোলসহ কয়েকটি তেলের ঘাটতি তৈরি হবে।
‘‘সরকার বা বিপিসি প্রতি বছর যে পরিমাণ পরিশোধিত তেল আমদানি করত, তখন তার চেয়ে বেশি পরিমাণে আনতে হবে। সেজন্য দাম হয়ত কিছুটা বেশি পড়বে। এটি সাময়িক সময়ের জন্য কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে।”
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক কর্মকর্তা মনজারে খোরশেদ বলেন, শোধনাগার কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকলে এর কারিগরি কোনো ক্ষতি হবে না। কোনো ধরনের গোলযোগ ছাড়াই সেটি পুনরায় চালু করা যাবে।
“যে কয়দিন বন্ধ থাকবে, সে কয়দিনের প্রসেসিং ফি থেকে তারা বঞ্চিত হবে।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটি বন্ধ হলে বড় কোনো ইমপ্যাক্ট পড়বে না। যে পরিমাণ তেল তারা সরবরাহ করত, সেটি পরিশোধিত হিসেবে আমদানি করতে হবে। নিজেরা রিফাইন করলে খরচ অনেক কম পড়ে। এখন আমদানি করার জন্য অনেক বেশি দাম পড়বে।”
ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলে ওই সময়ে ‘মেইনটেইনেন্স’র কাজে সারার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

দরকার ‘দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা’
ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলে কেবল ঘাটতি মেটালেই হবে না মন্তব্য করে প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম বলেন, “এ সংকট থেকে উত্তরণের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। রিফাইনারির স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে। আর দ্বিতীয় রিফাইনারি তৈরির কাজ দ্রুত শুরু করা উচিত।”
তিনি বলেন, “ক্রুড অয়েল এনে প্রসেস করলে খরচ অনেক কমে পড়ে। ফিনিশড তেল আনলে খরচ অনেক বেশি পড়ে। দীর্ঘমেয়াদী হলেও ভবিষ্যতের কথা ভেবে দ্বিতীয় রিফাইনারির কাজ দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে।”
অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ক্রুড অয়েলই শোধন করা যায়। রুশ ক্রুড অয়েল ব্যবহার করতে চাইলে আলাদা ইউনিট বসাতে হবে। রুশ তেল আনতে গেলে খরচও অনেক বেশি পড়বে।
“আমাদের জন্য অ্যারাবিয়ান ক্রুড অয়েলই সাশ্রয়ী।”

ইস্টার্ন রিফাইনারিকে ‘আপগ্রেড’ করা জরুরি মন্তব্য করে বুয়েটের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এটির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের ডিজাইন করা আছে; সেটি স্থাপনের কাজ শুরু করতে হবে।
“আমাদের জ্বালানি তেল বেশিরভাগই বাইরে থেকে আসে। সংরক্ষণ ক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বিভিন্ন সময়ে তেলের দামে ওঠানামা করে থাকে। ওই সময়ে মজুদ বেশি থাকলে সংকটজনক পরিস্থিতি বেশি সময় ধরে মোকাবেলা করা সম্ভব। এ জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা দরকার।”