Published : 15 Dec 2025, 11:10 PM
কথা ছিল স্থায়ী স্মৃতিসৌধ হবে। সাথে হবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এরপর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ দুই বছরেও শুরু হয়নি।
বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস এলে আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় অস্থায়ী স্মৃতিসৌধটি। বছরের বাকি সময় সেটি অনেকটা অবহেলায় পড়ে থাকে।
এবারও ১৬ ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য চট্টগ্রামের অস্থায়ী স্মৃতিসৌধটিকে প্রস্তুত করা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে উত্তর কাট্টলী এলাকায় ওই অস্থায়ী স্মৃতিসৌধে গিয়ে দেখা যায়, ৭-৮জন লোক পরিচ্ছন্নতা ও রঙের কাজ করছেন।
তারা জানালেন, গত বুধবার তারা কাজ শুরু করেছেন। শুরুতে পাশের কাঁটাতার ঘেরা পার্কিং এলাকায় জমে থাকা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করেছেন। তারপর স্তম্ভের সিঁড়ি ও বেদিতে রঙ এর কাজ করছেন। সবশেষে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে প্রবেশের সিঁড়িতে রঙ করা হয়েছে।
পাশেই পার্কিং পথের লাগোয়া একটি ছোট কক্ষ। সেখানে গিয়ে কাউকে পাওয়া গেল না। কক্ষটি তালাবন্ধ।

সাগর তীরে ‘বন্দর-ফৌজদারহাট টোল রোড’ এর পাশেই ঝাউগাছ ঘেরা আরেকটি সড়ক আছে। ওই সড়কের সাথেই লাগোয়া জমিতে এ অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ। সড়ক থেকে কিছুটা নিচু এই জমিতে নামার জন্য একটি প্রশস্ত সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। পুরো প্রাঙ্গণে বিছানো আছে ইট।
তবে সড়ক সংলগ্ন সিঁড়ির মুখে কোনো গেইট বা ঘেরা নেই। পুরো স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ দুই পাশ থেকে তিন ফু্ট উঁচু পিলার আর পিলারের মাঝে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। দুয়েকটি স্থানে কাঁটাতার সরে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল আলম জানান, বছরে দুয়েকবার এখানে লোকজন আসে। বাকি সময় কেউ থাকে না। মাঝে মাঝে গরু-ছাগল চড়ে বেড়ায়।
চট্টগ্রাম নগরীতে একটি শহীদ মিনার থাকলেও কোনো স্মৃতিসৌধ ছিল না। নগরীর কে সি দে রোডে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স প্রকল্পের আওতায় সেই পুরনো শহীদ মিনারটিও ভেঙে নতুন শহীদ মিনার করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫৩ বছর পর টোল রোডের পাশে পাহাড়তলীর উত্তর কাট্টলী মৌজায় স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করা হয় গত বছরের ২৩ মার্চ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে এখানে স্থায়ী স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ করা হবে।
সেসময় ১৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৩০ ফুট প্রস্থের অস্থায়ী স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হয়েছিল জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে।

তারপর আবার গত বছরের ডিসেম্বরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেখানে কিছু সংস্কার কাজও করা হয়।
সেখানে ‘চট্টগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর’ এর জন্য প্রস্তাবিত জমির পরিমাণ ৩০ একর। মূল ফটকের অদূরে একটি বড় সাইনবোর্ডে এই তথ্য লেখা আছে।
জানতে চাইলে বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিক্রম করছি। যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের পুরো অংশে চট্টগ্রামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য এত দীর্ঘ সময়েও মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্মৃতিস্মারক এই চট্টগ্রামে হয়নি। এর প্রেক্ষিতে ৩০ একর জমিতে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সেটিও এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।”
এই মুক্তিযোদ্ধা আক্ষেপ করে বলেন, “বছর আসে, বছর যায়। কিন্তু স্মৃতিসৌধের কাজ আগায় না। শুধু দিবস এলে আমরা নড়চড়ে বসি। আমাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ঐশ্বর্যকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে একটি স্থায়ী স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রত্যাশা নিশ্চয় অতিরিক্ত কিছু নয়।
“আশা করি বর্তমান পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় এই প্রকল্প গতিশীল হবে। অবিলম্বে কাজ শুরু করতে পারলে হয়ত আমরা বেঁচে থাকতে এই স্মৃতির স্মারকটি দেখে যেতে পারব।”

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সেখানে একটি অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ আছে। স্থায়ী স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘরের জন্য প্রস্তাবিত জমি বরাদ্দ চেয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল।
“ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে যে নির্দেশনা আসবে সেই মোতাবেক আমরা কাজ এগিয়ে নেব। এখানে একটি স্থায়ী স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণে আমরা ইতিবাচকভাবে কাজ করছি।”
মঙ্গলবার সূর্যোদয়ের সাথে সাথে উত্তর কাট্টলীর এই অস্থায়ী স্মৃতিসৌধে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে শুরু হবে বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। তারপর সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হবে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের।
পুরনো খবর