Published : 27 Mar 2026, 11:44 PM
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা তৈরি, রোপণ ও বিক্রি করা নিষিদ্ধ।
এই নিষেধাজ্ঞার অংশ হিসেবে গেল ১০ মাসে আর্থিক প্রণোদনা ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলভুক্ত পাঁচ জেলায় ধ্বংস করা হয়েছে এই দুই জাতের সাড়ে ৫৩ লাখ চারা।
কিন্তু প্রণোদনার অর্থ সংকটের কারণে চট্টগ্রামসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে এখনো প্রায় পাঁচ লাখ ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা ধ্বংস করা যায়নি।
এসব চারা বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন নার্সারিতে এখনো পড়ে আছে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলা নিয়ে গঠিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পক্ষ থেকে ধ্বংস না হওয়া এ দুটি জাতের চারার তালিকা ইতোমধ্যে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চারা ধ্বংসের জন্য দ্রুত নতুন বরাদ্দ না এলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছ দুটির বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
হিসাবের বাইরে নার্সারিগুলোতে চারা উৎপাদন ও মজুদ করা হচ্ছে কিনা, তা নজরদারি করা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের ১৫ মে এক প্রজ্ঞাপনে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা তৈরি, রোপণ এবং বিক্রয় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন-১ অধিশাখা থেকে এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
এই প্রজ্ঞাপনের শর্ত মেনে সারাদেশে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় থাকা সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত নার্সারিতে থাকা আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস গাছের চারার সংখ্যা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর গত বছরের জুন মাসে সারাদেশে এসব চারা ধ্বংসের জন্য ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম অঞ্চলেও ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা ধ্বংসের উদ্যোগ নেয়া হয়। অধিদপ্তর প্রণোদনা দিয়ে এবং উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে বেশকিছু চারা ধ্বংস করে।


অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামসহ পাঁচ জেলায় সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানাধীন নার্সারিগুলোতে মোট ৩২ লাখ ২৩ হাজার ৭৩২টি ইউক্যালিপটাস গাছের চারা ছিল। এর মধ্যে গত ১০ মাসে প্রণোদনার অর্থ দিয়ে ১৩ লাখ ৩১ হাজার ২৫৪টি এবং উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে ১৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫৮৫টি ইউক্যালিপটাস গাছের চারা ধ্বংস করা হয়েছে।
অপরদিকে আকাশমনি গাছের চারা ধ্বংস করা হয়েছে ২৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩৬টি। এর মধ্যে প্রণোদনার অর্থ দিয়ে ১১ লাখ ২৭ হাজার ৫৯টি এবং উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে ধ্বংস করা হয় ১২ লাখ ৭ হাজার ৬৭৭টি আকাশমনি গাছ।
অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ জেলার নার্সারিগুলোতে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯৩টি ইউক্যালিপটাস ও ৩ লাখ ১৮ হাজার ১৬২টি আকাশমনির চারা পড়ে আছে। জেলা হিসেবে চট্টগ্রামে ৯৬ হাজার ৫৫৮টি ইউক্যালিপটাস ও ৬৪ হাজার ৫০৭টি আকাশমনি গাছের চারা ধ্বংসের অপেক্ষায় আছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের তালিকা অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় ৪২ হাজার ইউক্যালিপটাস ও ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭১০টি আকাশমনির চারা মজুদ আছে। নোয়াখালীতে ৫৫ হাজার ১৫০টি ইউক্যালিপটাস ও ৫৭ হাজার ২৮০টি আকাশমনি, ফেনী জেলায় ২২৫টি ইউক্যালিপটাস ও ৬২৫টি আকাশমনি এবং লক্ষ্মীপুর জেলায় ৪৯৬০টি ইউক্যালিপটাস ও ২০৪০টি আকাশমনি গাছের চারা বিভিন্ন নার্সারিতে মজুদ রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, গাছের বিষয়টি বন বিভাগের আওতায় হলেও চারা উৎপাদনের বিষয়টি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীন। এ দুই জাতের চারা ধ্বংসের জন্য কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই বরাদ্দ পর্যাপ্ত না থাকায় পাঁচ লাখের মতো চারা ধ্বংস করা যায়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পাঁচ জেলায় বেশকিছু চারা এখনো ধ্বংস করা যায়নি।
“প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দ এখনো না পাওয়ায় তা ব্যাহত হচ্ছে। এ দুই গাছের চারা যেন বিক্রি করা না হয় এবং উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়, সেটি নিয়েও আমরা কাজ করছি। আশা করছি দ্রুতই আমরা অর্থ বরাদ্দ পাব।”
উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি প্রজাতির গাছের পানি শোষণ ক্ষমতা বেশি এবং পরিবেশের জন্য খুব বেশি উপকারী নয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের ক্ষতিকর দিক থাকলেও দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় এবং পরিচর্যা করতে হয় না বলে কাঠ ও জ্বালানির জন্য অনেকে এই গাছ লাগিয়ে থাকেন।
কিন্তু এ দুটি গাছের পাতা ও শিকড় থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেয় এবং আশেপাশের অন্যান্য উদ্ভিদের অঙ্কুরোদগম ও বৃদ্ধিতে বাধা দেয় জানিয়ে তিনি বলেন, “বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে ওই এলাকায় অন্য কোনো ফসল বা গাছপালা সহজে জন্মাতে পারে না, ফলে জমির জৈবিক বৈচিত্র্য নষ্ট হয়।
“পার্বত্য অঞ্চলের অনেক পাহাড়ে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের বাগান রয়েছে। সেখানে এসব গাছের নিচে অন্য কোনো গাছপালা জন্ম নেয় না। যে পাহাড়ে এই গাছ নাই, সেই পাহাড় গাছ-গাছালিতে ভরা ও সবুজ থাকে।”
এসব গাছ মাটির অনেক গভীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি শোষণ করে মন্তব্য করে ওমর ফারুক রাসেল বলেন, “একটি পূর্ণবয়স্ক ইউক্যালিপটাস গাছ দিনে প্রায় ৫০ থেকে ৯০ লিটার পর্যন্ত পানি শোষণ করতে পারে। এরা ২৪ ঘণ্টাই পানি শোষণ করে, যা মাটিকে শুষ্ক ও নিরস করে ফেলে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমিয়ে দেয়।”
কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, “চারা রোপণ, বিক্রয় ও চারা তৈরি নিষিদ্ধ করলেও বড় হওয়া গাছগুলোও কাটা দরকার। গাছ কাটার বিষয়টি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বন বিভাগের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”